hadith book logo

রাসূলের শানে সমসাময়িক ধৃষ্টতা আকার-প্রকৃতি ও নেপথ্য কাহিনী

লেখকঃ নাসের বিন সুলাইমান আল-উমর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

আদিম ধৃষ্টতার প্রকৃতি :

‘মাদখাল’ নামক গ্রন্থে আছে, আদি যুগে নবিদের সাথে শত্রুতা ও তার গোড়া পত্তন করে মূলত: ইবলিস। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘‘আমি বললাম, হে আদম, এ ইবলিস তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। খবরদার! তোমাদের যেন সে জান্নাত হতে বহিষ্কার না করে। তবে কিন্তু তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত ও হতভাগা হয়ে যাবে।’’ [তহা : ১১৭] তার পর থেকেই ইবলিস প্রথমে আদম এবং পরবর্তীতে তার সন্তান-প্রজন্মের সাথে হিংসা, বিরোধী তা ও শত্রুতার ধারাবাহিকতার সূচনা করে। চলতে থাকে পরস্পরের মাঝে অসিয়ত ও প্রতিশ্রুতির আদান-প্রদান। শুরু হয় আল্লাহর নেককার বান্দাদের সাথে ধৃষ্টতা; নির্যাতনের বিভিন্ন আকার-প্রকৃতি ও স্টীমরোলার। যার শুরু, চোখ ও মুখের কটাক্ষ, বিদ্রূপাত্মক বাক্য, সবশেষে হত্যা। নবিগণ এর প্রত্যেকটির শিকার হয়েছেন। শত্রুদের সব ধরনের কষ্ট-মুসিবতের সম্মুখ হয়েছেন। তাদের হুমকি-ধমকি বরদাস্ত করেছেন। ক্লান্ত ও বিষণ্যতায় অবসন্ন হয়েছেন। আমাদের প্রিয় সর্বশেষ নবি পর্যন্ত এর থেকে রেহাই পাননি। তারা তাকে যাদুকর, গণক, পাগল, স্বধর্ম-ত্যাগী ইত্যাদি অপবাদ দিয়েছে। উটের পচা ভুঁড়ি তার উপর নিক্ষেপ করেছে। তাকে রক্তাক্ত করেছে, তার দান্দান মোবারক শহীদ করেছে। তাকে বিষ প্রয়োগ করেছে। তার উপর যাদু করা হয়েছে। এর মধ্যেই তিনি স্বীয় কর্তব্য পালন করেছেন। অবশেষে মৃত্যুর মাধ্যমে অন্তরঙ্গ বন্ধু আল্লাহর সাথে মিলিত হন। শাহাদাতের শুধা পান করে কষ্ট-মুসিবত ও পরীক্ষাগার স্থান এ-পার্থিব জগৎ থেকে চির মুক্তি লাভ করেন। আয়েশা রা. বলেন : রাসূল সা. তার মৃত্যু শয্যায় বলতেন, ‘‘হে আয়েশা! বিষ মিশ্রিত যে খানা আমি খায়বরে খেয়েছি, তার প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, তার কারণে আমার রক্তের প্রধান রগ চিরে যাচ্ছে।’’ [বোখারি : ৪১৬৫]

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন : ‘‘অন্যান্য নবীগণ এর চেয়ে আরো কঠিন কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন। কাউকে হত্যা করা হয়েছে, কাউকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে আবার কাউকে করাত দিয়ে দ্বিখন্ডিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ নিরাপত্তা দিয়েছেন, হেফাজত করেছেন। যেমন তিনি হেফাজত করেছেন, সর্ব শেষ প্রেরিত আমাদের নবী মুহাম্মদ সা.-কে। যদি তিনি উঁহুদের ময়দানে ইবনে কামিআ লাইসির হাত প্রতিহত না করতেন; যদি তিনি তায়েফের দাওয়াতি মিশনে কাফেরদের দৃষ্টি থেকে আড়াল না করতেন; যদি তিনি হিজরতের সফরে কাফেরদের দৃষ্টিভ্রম না ঘটাতেন; গাউরিসের তলোয়ার, আবু জাহেলের পাথর এবং সুরাকা ইবনে মালেকের গোড়ার গতি রুদ্ধ না করতেন; তবে, কেমন করে লেখা হত মোহাম্মদ ও ইসলামের ইতিহাস!? এমনি ভাবে সকল রাসূল সা.-কে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কখন নাজাত পেয়েছেন, কখন মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছেন। এখানেই আল্লাহর কুদরতের কারিশমা, প্রজ্ঞা ও হেকমতের পরিপূর্ণ অনুশীলন। এ সকল পরীক্ষার কঠিন মুহূর্তে তিনি তাদের মর্যাদার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ণয় ও চিহ্নিত করার প্রয়াস চান। এর মাধ্যমে তিনি তাদের লক্ষ্য ও আদর্শের বিকাশ ঘটান। নিজ ওয়াদা পরিপূর্ণ করেন। তাদের মানুষত্বের অনন্য নিদর্শন সমূহের উন্মেষ ঘটান। দুর্বল চিত্ত মানুষের হৃদয় থেকে সন্দেহ দূরীভূত করেন। যাতে তারা ঈসা ইবনে মারইয়ামের উপর কটূক্তিকারী পথভ্রষ্ট খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শক্তি সামর্থ্য দেখে গুমরাহ না হয়; এবং যাতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নবিগণ নিজ উম্মতের জন্য সান্ত্বনার মূর্ত প্রতীক, প্রভুর নিকট অধিক সওয়াব লাভের বেশি হকদার বিবেচ্য হন। এটাই তাদের অনুগত অনুসারীদের উপর করুণার সর্ব শেষ রেখা।’’ [শিফা : ২/১৫৮]

মূল্যায়নের এ চিত্রটি আমাদের নিকট পুরোনো শত্রুতা এবং তার নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা প্রদান করে। স্পষ্ট করে দেয় ক্ষণজন্মা মহামানবদের উপর কতিপয় নরপিচাশের ধৃষ্টতার নগ্ন চিত্র ও তার কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘‘তাদের থেকে এ প্রতিশোধ নেয়ার কারণ, তারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে। যিনি পরাক্রমশালী, প্রশংসিত।’’ [আল-বুরুজ : ৮] মূলত আমাদের এ বক্তব্য সুরায়ে মায়েদায় উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর। ইরশাদ হচ্ছে : ‘‘আপনি বলে দিন, হে আহলে কিতাব সম্প্রদায়, তোমরা কি জন্য আমাদের সাথে শত্রুতা পোষণ কর? আমাদের থেকে প্রতিশোধ নাও? আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, আমাদের উপর নাজিলকৃত কিতাবের উপর ঈমান এনেছে এবং ইতিপূর্বে যে সকল কিতাব নাজিল হয়েছে তার উপরও ঈমান এনেছি- এ ছাড়া আর কি অপরাধ আমাদের? তবে জেনে রাখ, তোমাদের ভেতর অধিকাংশ লোক-ই অবাধ্য ও ফাসেক।’’ [আল-মায়েদা : ৫৯] এরও ভূতপূর্বে ফেরআউনের গণকরা ফেরআউনকে বলেছিল, ‘‘তুমি আমাদেরকে কেন শাস্তি দাও? আমাদের আর কি অপরাধ?- আমাদের নিকট প্রভুর নিদর্শন-বার্তা এসেছে, আমরা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের উপর ধৈর্যের বারি বর্ষণ কর। পরিপূর্ণ মুসলমান করে মৃত্যু দাও।’’ [আল-আরাফ : ১২৬] অতএব সমকালীন ধৃষ্ট ও অশিষ্টদের অনুসৃত পথ নতুন কিছু নয়, খুব পুরাতন।