hadith book logo

সমরবিদ হিসাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

লেখকঃ মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৮

রক্তপাতহীন বিজয়:

অতঃপর রাসূল এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন যার গুরুত্ব ও তাৎপর্য কেবলমাত্র একজন সমরবিশারদের পক্ষেই বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করা সম্ভব।

মৈত্রী গোত্রগুলোকে বললেন এবার অভিযানে যাবার সময় তাদের মদীনায় আসা অনাবশ্যক। বরং তারা প্রস্তুত থাকবে। যখন মুসলিম বাহিনী তাদের এলাকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হবে তখনই তারা মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিবে। কিন্তু কোথায় তারা অভিযানে যাবেন সে বিষয়টি তাদের কাছে অজানা রয়ে গেল।

হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর সূত্রে বোখারী শরীফে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দক্ষিণে মক্কার দিকে না গিয়ে উত্তরের পথ ধরলেন। ফলে সকলের মধ্যে এ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, যুদ্ধ হবে রোমানদের সঙ্গে। কিছুদূর যাওয়ার পর গতিপথ পরিবর্তন করে উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হলেন। এবার তিনি রওয়ানা হলেন দক্ষিণ পূর্ব দিকে। অর্থাৎ গোটা পথ তিনি অতিক্রম করলেন আকা বাঁকা পথে ফলে তার মূল পরিকল্পনা সম্পর্কে কেউ কিছু আঁচ করতে পারল না। হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, মুসলিম বাহিনী মক্কার শেষ প্রান্তে পর্বতমালার কাছে ছাউনি ফেলার পূর্বে সে আমলের বিবেচনায় দশ হাজার সৈন্য বাহিনীটি ছিল বেশ বড়। এত বড় বাহিনীকে সহজে লোক চক্ষুর অন্তরালে রাখা সম্ভব ছিল না। অথচ মক্কাবাসীরা মুসলিম বাহিনীদের আক্রমণের কথা জানতে পারে হঠাৎ করে আকস্মিকভাবে [অধ্যাপক মাওলানা আশরাফ আলী আবাদী,কুরআন হাদীসের আলোকে সৈনিকের কর্তব্য, ১ম প্রকাশ, ঢাকা: ই, ফা,বা,১৯৮৭।]।

সামরিক অভিযানের সময় সৈন্য বাহিনীতে সম্মিলিতভাবে পাক করার রীতি আছে। এবার সে রীতি পরিহার করা হল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে তাদের রান্নার ব্যবস্থা করতে বললেন। ফলে দশ হাজার প্রজ্বলিত চুল্লী দূর থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠল। মক্কার শাসক আবু সুফিয়ান একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে বাস্তব অবস্থা জরীপ করে এবং এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী মক্কা আক্রমণ করার জন্য তৈরি হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সে পাহাড়ের চুড়া থেকে নেমে আসে। ঠিক সে সময় মুসলিম বাহিনীর একটা পেট্রোল দল সেখানে পৌঁছে এবং আবু সুফিয়ান তাদের হাতে ধরা পড়ে।

সে ছিল মক্কার সামরিক প্রধান। অথচ তার গ্রেফতার সম্পর্কে মক্কাবাসীরা কিছুই জানতে পারল না। তাকে নবীজির সামনে হাজির করা হলে তিনি তার নিরাপদ অবস্থান এবং তার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন। পরের দিন সকালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি অপ্রতিরোধ্য বাহিনীর প্রধান হিসেবে মক্কানগরীতে প্রবেশ করেন। অথচ মক্কার লোকেরা মুসলিম বাহিনীর গতি-বিধি সম্পর্কে বিন্দু বিসর্গও জানত না। এমনকি তাদের নেতাও ছিল শহরের বাইরে মুসলিমদের হাতে। নবীজীর নির্দেশে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবু সুফিয়ানকে এমন একটি জায়গায় দাঁড় করালেন যেখান থেকে তিনি মুসলিম বাহিনীকে অনায়াসে দেখতে পায়। দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনী তার পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। সৈন্যবাহিনী এক একটি দলের নেতৃত্ব দিলেন এক একজন গোত্র প্রধান। আবু সুফিয়ানের পাশ দিয়ে কোন একদল অতিক্রম-কালে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু দলের গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা করছিলেন। সবশেষে আসলেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবীজীর প্রতি ইঙ্গিত করে সুফিয়ানকে বলল- তোমার ভাইয়ের স্থান প্রকৃতপক্ষেই রাজা-ধিরাজে পৌঁছে গেছে। তার শক্তি ও প্রভাব এত বেশী যে, এখন রোম সম্রাটও তার ব্যাপারে ভীষণ আতংকিত। যাহোক আবু সুফিয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে তিনি তাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। আবু সুফিয়ানও নবীজীর সদিচ্ছার প্রতি অনুকূল সাড়া দিলেন। এভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রখর সমর কৌশল দিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন।