hadith book logo

সমরবিদ হিসাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

লেখকঃ মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

যুদ্ধ কেন এবং কোন ধরনের?

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরবের কাফির মুশরিকদের দীনের পথে আহবান জানালেন তখন তারা বিরোধিতা করতে লাগল। তার দ্বীন প্রচারেও তারা ভীত ও আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাদের আশংকা হলো যে, দীর্ঘদিন যাবত তারা যেভাবে মানুষের উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে তার অবসান হয়ে নতুন ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে নিভিয়ে দিতে সকল কূটকৌশল গ্রহণ করে। এসবের মোকাবিলায় নির্দোষ নিরপরাধ ও নির্যাতিত মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য মহান আল্লাহ জিহাদের অনুমতি দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَٰتَلُونَ بِأَنَّهُمۡ ظُلِمُواْۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ نَصۡرِهِمۡ لَقَدِيرٌ ٣٩ ﴾ [ الحج : ٣٩ ]

‘‘(কাফিরগন) যাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে। যেহেতু তারা মাজলুম, আর আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে সাহায্য দানে সক্ষম।’’(সূরা হজ্জ:৩৯)

﴿ وَقَٰتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱلَّذِينَ يُقَٰتِلُونَكُمۡ وَلَا تَعۡتَدُوٓاْۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِينَ ١٩٠ ﴾ [ البقرة : ١٩٠ ]

‘‘যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত হয়। আল্লাহর পথে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করে। কিন্তু তাদেরকে অগ্রে আক্রমণ করে সীমালঙ্ঘন করিও না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।”(সরা আল বাকারাহ:১৯) কুরআনের অন্যত্রে এসেছে

﴿ ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِم بِغَيۡرِ حَقٍّ إِلَّآ أَن يَقُولُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُۗ وَلَوۡلَا دَفۡعُ ٱللَّهِ ٱلنَّاسَ بَعۡضَهُم بِبَعۡضٖ لَّهُدِّمَتۡ صَوَٰمِعُ وَبِيَعٞ وَصَلَوَٰتٞ وَمَسَٰجِدُ يُذۡكَرُ فِيهَا ٱسۡمُ ٱللَّهِ كَثِيرٗاۗ وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٤٠ ﴾ [ الحج : ٤٠ ]

“যারা অন্যায়ভাবে নিজ দেশ হতে বহিষ্কৃত হয়েছে, অন্য কোনও অপরাধে নয়। বরং এতটুকু বলার জন্য যে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। আল্লাহ যদি কিছু মানুষকে অপর কিছু মানুষদ্বারা পরাভূত না করতেন তবে সন্ন্যাসীদের তপস্যা-কুটির, ইসায়ীদের ভজনালয়, ইয়াহুদীদের পূজা-গৃহ এবং মুসলিমদের মসজিদ ইত্যাদি যেখানে অসংখ্যবার আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে, নিশ্চয় ধ্বংস হয়ে যেতো। আর যে ব্যক্তি তার (দ্বীনের) সাহায্য করবে অবশ্য আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী।” (সূরা হজ্জ:৪০)

উপরোক্ত আয়াতে কারীমাগুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে, নির্যাতিত নিপীড়িত দেশ থেকে বিনা অপরাধে বহিষ্কৃত মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কোনও অবস্থাতেই কোনও প্রকার সীমালঙ্ঘন করা বৈধ নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তার বেশিরভাগই ছিল প্রতিরক্ষামূলক। আবার কোথাও কোথাও তিনি আল্লাহর পথে দাওয়াতদানে বাধা হওয়ার কারণে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তন্মধ্যে ওহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধ ছিল সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক। আর বদর, তাবুক ও মক্কা বিজয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেও একথাই প্রতিভাত হয় যে, এসব যুদ্ধের মূলে ছিল কাফেরদের চরম বাড়াবাড়ি, অগ্রে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমণ, দাওয়াতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি প্রভৃতি। অতএব যেসব প্রাচ্যবিদ এসব যুদ্ধকে শুধু আক্রমনাত্মক বলেন তা অপপ্রচার বৈ কিছুই নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স যখন ৫৩ বছর তখন তিনি মদিনায় হিজরত করেন, তারপর থেকে যুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু নবুয়ত লাভ করেছিলেন ৪০ বছর বয়সে। অবশিষ্ট তের বছর অনেক অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন, হাবশায় হিজরত করেছেন। তার প্রিয় সাহাবীগণের উপর অনেক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তথাপিও দীনের স্বার্থে ধৈর্য ধারণ করেছেন। যদি যুদ্ধের উদ্দেশ্য শুধুই আক্রমনাত্মক হতো তাহলে ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল কেন?

মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোনটিতে স্বয়ং নিজে উপস্থিত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, যাকে ঐতিহাসিকগণ গাযওয়া বলে। আবার কোন কোন অভিযানে নিজে অংশ গ্রহণ না করে, বিশেষ সাহাবার সেনাপতিত্বে বাহিনী প্রেরণ করেছেন, এগুলোকে সারিয়া বলা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনে মোট ২৯ টি গাযওয়াহ এবং ৬৩ টি সারিয়্যাহ সংঘটিত হয়েছিল। তাঁর সশরীরে অংশগ্রহণকৃত গাযওয়ার সংখ্যা নয়টি যথা: বদর, ওহুদ, আল মারায়সী, খন্দক, কুরায়জা, খায়বর, ফাতহ্ মাক্কাহ্, হুনাইন, আত-তায়েফ।