hadith book logo

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা

লেখকঃ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল কাফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

চতুর্থ বিষয়: শরীয়তের আইন ছাড়া অন্য আইন দ্বারা বিচার-ফায়সালা করা:

পবিত্র কুরআন এরূপ করাকে সুস্পষ্ট কুফরী ও আল্লাহর সাথে শিরক হিসেবে গণ্য করেছে।

একদা শয়তান মক্কার কাফেরদেকে পরামর্শ দেয় যে, তারা যেন আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট প্রশ্ন রাখে, কোন ছাগল যদি মারা যায়, কে তাকে মেরেছে? তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে মেরেছেন। তখন সে পরামর্শ দিল যে, তারা তাঁকে প্রশ্ন করবে, তাহলে তোমরা নিজ হাতে যেটা জবেহ করছো, তা হালাল মনে করছো, আর আল্লাহ যেটা জবেহ করেছেন তোমরা তা হারাম মনে করছো? তবে তো আল্লাহর চেয়ে তোমরাই উত্তম? তখন আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন,

وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ

"আর যে পশুকে আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়নি তার গোশত খেয়ো না। এটা অবশ্যি মহাপাপ। শয়তানরা তাদের সাথীদের অন্তরে সন্দেহ ও আপত্তির উদ্ভব ঘটায়, যাতে তারা তোমাদের সাথে ঝগড়া করতে পারে। কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।" (আনআম: ১২১) [. (হাদীছটি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, আবু দাউদ, অধ্যায়: কুরবানী, অনুচ্ছেদ: আহলে কিতাবের জবেহ খাওয়া যাবে কি না, হা/২৮১৮। তিরমিযী, অধ্যায়: তাফসীর, অনুচ্ছেদ: সূরা আনআমের তাফসীর, হা/৩০৬৯। নাসাঈ, অধ্যায়: কুরবানী, হা/৪৪৩৭। ইবনে মাজাহ, অধ্যায়: পশু জবেহ, অনুচ্ছেদ: জবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ.. বলা, হা/৩১৭৩)]

এই আয়াতে ( إنكم لمشركون ) এর মধ্যে لام অক্ষরটি কসমের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এই জন্যে যে ( إنكم لمشركون ) বাক্যে فاء ব্যবহার হয়নি। যা শর্তের জবাব হতে পারত। অতএব এ আয়াতে আল্লাহ কসম করে বলছেন, মৃত প্রাণীকে হালাল বলার ক্ষেত্রে যারা শয়তানের অনুসরণ করবে তারা মুশরিক। এই শিরক তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দিবে। এ ব্যাপারে মুসলিম জাতি ঐক্যমত। এ ধরণের শিরককারীদের আল্লাহ কিয়ামত দিবসে যে ভয়ানক শাস্তির ধমকী দিয়েছেন, সে সম্পর্কে তিনি বলেন,

أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ

"হে আদম সন্তানেরা! আমি কি তোমাদের এ মর্মে অঙ্গিকার নেইনি যে, শয়তানের বন্দেগী করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। এবং আমারই বন্দেগী করো, এটিই সরল-সঠিক পথ?" (ইয়াসীন: ৬০-৬১)

ইবরাহীম খলীল (আ:) স্বীয় পিতাকে যা বলেছেন আল্লাহ তায়ালা তা উল্লেখ করে বলেন,

يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ

"হে আমার পিতা! আপনি শয়তানের অনুসরণ করিয়েন না।" (মারইয়াম: ৪৪) অর্থা‌ৎ শয়তানের কুফরী ও অবাধ্যতা পূর্ণ আইনের অনুসরণ করার মাধ্যমে তার ইবাদত করবেন না।

তিনি আরো বলেন,

إِنْ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَرِيدًا

"তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধু নারীর আরাধনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে।" (নিসা: ১১৭) অর্থা‌ৎ শয়তান ছাড়া কারো গোলামী করে না। আর এটাই হল তার আইনের অনুসরণ করা।

আল্লাহ আরো বলেন,

وَكَذَلِكَ زَيَّنَ لِكَثِيرٍ مِنَ الْمُشْرِكِينَ قَتْلَ أَوْلَادِهِمْ شُرَكَاؤُهُمْ

"এমনিভাবে অনেক মুশরেকের দৃষ্টিতে তাদের উপাস্যরা সন্তান হত্যাকে সুশোভিত করে দিয়েছে, যেন তারা তাদেরকে বিনষ্ট করে দেয় এবং তাদের ধর্মমতকে তাদের কাছে বিভ্রান্ত করে দেয়।" (আনআম: ১৩৭) আল্লাহর নাফরমানী করে সন্তান হত্যার ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্যকে শিরক বলা হয়েছে।

যখন আদী বিন হাতিম (রা.) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন:

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

"তারা তাদের পাদ্রী ও সাধু-সন্যাসীদেরকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে।" (তাওবা: ৩১) তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জবাবে বলেছেন যে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে পাদ্রী হালাল ঘোষণা এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা তাদের হারাম ঘোষণায় তাদের অনুসরণই হচ্ছে তাদেরকে রব্ব বা প্রভু হিসেবে গ্রহণ করা। (তিরমিযী, অধ্যায়: কুরআনের তাফসীর, অনুচ্ছেদ: সূরা তাওবার তাফসীর হা/৩০৯৫)

নীচের আয়াতটি সম্পর্কে তো কোন বিতর্ক নেই। দেখুন আল্লাহ কি বলেছেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا

"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর তারা ঈমান এনেছে। তারাই আবার বিরোধপূর্ণ বিষয়ের সমাধানের জন্য শয়তানের কাছে যেতে চায়, অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা শয়তানকে অমান্য করবে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।" (নিসা: ৬০)

আল্লাহ আরো বলেন,

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

"যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।" (মায়েদা: ৪৪)

তিনি আরো বলেন,

أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا وَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْلَمُونَ أَنَّهُ مُنَزَّلٌ مِنْ رَبِّكَ بِالْحَقِّ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ

"এমতাবস্থায় আমি কি আল্লাহ‌ ছাড়া অন্য কোন মীমাংসাকারী (বিচারক) সন্ধান করবো? অথচ তিনি পূর্ণ বিস্তারিত বিবরণসহ তোমাদের নিকট কিতাব নাযিল করেছেন। আর যাদেরকে আমি (তোমার আগে) কিতাব দিয়েছিলাম তারা জানে এ কিতাবটি তোমার রবেরই পক্ষ থেকে সত্য সহকারে নাযিল হয়েছে। কাজেই তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।" (আনআম: ১১৪)

আল্লাহ আরো বলেন,

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

"সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে তোমার রবের কথা পূর্ণাংগ, তাঁর ফরমানসমূহ পরিবর্তন করার কেউ নেই এবং তিনি সবকিছু শুনেন ও জানেন।" (আনআম: ১১৫) "সত্যতা" বলতে উদ্দেশ্য যাবতীয় সংবাদ (অতিত-ভবিষ্যত) সবই সত্য। আর "ইনসাফ" বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুনগুলো ইনসাফপূর্ণ।

আল্লাহ আরো বলেন,

أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ

(যদি এরা আল্লাহর আইন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়) তাহলে কি এরা আবার সেই জাহেলিয়াত যামানার বিচার-ফায়সালা চায়? অথচ যারা আল্লাহর প্রতি ইয়াক্বীন তথা দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারী, তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর চাইতে ভাল বিচারক ও ফায়সালাকারী আর কেউ নেই।" (মায়েদা: ৫০)