hadith book logo

ইলমে দীন অর্জনের পথ ও পদ্ধতি

লেখকঃ সালেহ ইবন আবদুল আযীয আলে শাইখ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

তিন: হাদীস

তালিবে ইলম হাদীসের ইলম হাসিলের শুরুতেই ইমাম নাওয়াওয়ীর ‘আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ মুখস্থ করবে। যদি আপনি এখানে সমবেত উপস্থিতিকে জিজ্ঞেস করেন আপনারা কি আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ মুখস্থ করেছেন? জবাব আসবে: না। আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ মুখস্থ না করেই তারা বড় বড় কিতাব যেমন- নাইলুল আওতার, সুবুলুস্ সালাম, ফাতহুল বারী ইত্যাদি পড়া শুরু করে দেয়। অথচ আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ হচ্ছে মূলভিত্তি।

আপনারা আলেমগণের জীবনচরিত সম্পর্কিত কিতাবগুলো পড়ে দেখুন। দেখতে পাবেন কোনো একজন আলেমের জীবনীতে উল্লেখ করা হয় নি যে, তিনি বড় কোনো কিতাব পড়েছেন। যেমন ধরুন, গ্রন্থকার এ কথা লিখবেন না যে, তিনি ফাত্‌হুল বারী পড়েছেন; তিনি আল-মাজমু‘ ইত্যাদি পড়েছেন। বরং আপনি সেখানে পাবেন, তিনি আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ মুখস্থ করেছেন, তিনি আল-মুলাহা ফিন্নাহু মুখস্থ করেছেন, তিনি আল-উমদা ফিল ফিকহ মুখস্থ করেছেন, তিনি উমদাতুল আহকাম মুখস্থ করেছেন এবং এ ধরনের অন্যান্য পুস্তিকা মুখস্থ করার কথা আপনি পাবেন। এর কারণ কি? এর কারণ দুটো:

এক. আপনাকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া যে, এটাই হচ্ছে ইলম অর্জনের সঠিক পদ্ধতি; অন্য কোনো পদ্ধতি নয়।

দুই. এই আলেমের মর্যাদা তুলে ধরা যে, তার ইলম ছিল মৌলিক ও সুদৃঢ় ভিত্তি নির্ভর। কারণ, তিনি এ ছোট্ট ছোট্ট পুস্তিকা দিয়ে তার ইলমী জীবন শুরু করেছেন, এ গ্রন্থগুলো আত্মস্থ করেছেন এবং শাইখদের নিকট পড়েছেন।

আপনি এমন কোন কথা পাবেন না যে, অমুক আলেম ফাতহুল বারী পড়েছেন অথবা নাইলুল আওতার পড়েছেন এবং এ গ্রন্থগুলো পড়ার কারণে আলেমের প্রশংসাও করা হয় না। কারণ ছোট্ট ছোট্ট কিতাবগুলো আত্মস্থ করতে পারলে আপনি এ গ্রন্থগুলোর বিস্তারিত বিচার বিশ্লেষণ বুঝতে পারবেন।

মোদ্দাকথা হলো, হাদীসের ক্ষেত্রে আপনি আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ মুখস্থ করার মাধ্যমে ইলম অর্জন শুরু করবেন। আপনি এ হাদীসগুলো মুখস্থ করে নিবেন এবং সবসময় আওড়াবেন। এ হাদীসগুলো সূরা ফাতিহার মতো মজবুতভাবে মুখস্থ করে নিবেন। প্রতি সপ্তাহে একবার খতম দিবেন। প্রতিবার সমাপ্ত করণের মাধ্যমে আপনার মুখস্থকৃত হাদীসগুলো আরো পরিস্কার হবে। এরপর আপনি আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ পুস্তিকার কোনো একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ পড়বেন। যদি কোনো একজন শিক্ষকের নিকট পড়তে পারেন তাহলে আরো ভালো। যদি কোনো শাইখের নিকট পড়ার সুযোগ আপনার না থাকে তাহলে কোনো একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ নিয়ে পড়বেন এবং ব্যাখ্যা নিজে আত্মস্থ করবেন। যদি কোনো প্রশ্ন জাগে তাহলে কোনো আলেমকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিবেন।

আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ মুখস্থ করার পর আপনি এর প্রত্যেকটি হাদীসের ব্যাখ্যা পড়বেন। ইমাম নাওয়াওয়ীর নিজের লেখা ব্যাখ্যাগ্রন্থটি পড়তে পারেন। কারণ, এটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এরচেয়ে একটু বড় হচ্ছে ইবন দাকীকিল ‘ঈদ এর লিখিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। পরবর্তী পর্যায়ে অন্যান্য ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো পড়বেন। সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাগ্রন্থ হচ্ছে- হাফেয ইবন রজব হাম্বলীর গ্রন্থ।

আপনি নাওয়াওয়ীর ব্যাখ্যাগ্রন্থটি পড়বেন। প্রথম হাদীস তথা নিয়্যতের হাদীসটির ব্যাখ্যা পড়ার পর আপনি কিতাবটি বন্ধ করে ব্যাখ্যা করা শুরু করবেন। এভাবে আপনি অল্পসময়ে ব্যাপক উপকৃত হবেন। যদি আপনি কোনো মসজিদে ওয়াজ করতে চান আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহর কোনো একটি হাদীসের ব্যাখ্যা দিয়ে ওয়াজ করতে পারবেন। এভাবে আপনি হাদীসের ব্যাখ্যাকে আত্মস্থ করবেন। এটিই আপনার সম্বল।

কোনো মসজিদে যদি খুতবা দেওয়ার প্রয়োজন হয় এবং সেখানে কিছু তালিবে ইলম থাকার পরও প্রত্যেকে একজন অপরজনকে বলে- তুমি খুতবা দাও। অপরজন বলে: আমি খুতবা দিতে জানি না। তালিবে ইলমের সম্বল তো সার্বক্ষণিক তার সাথে থাকবে। তালিবে ইলমের ন্যূনতম সম্বল হচ্ছে- কিছু আয়াতে কারীমা তাফসীরসহ জানা থাকা। যেমন ধরুন- সূরাতুল আস্‌র তাফসীরসহ জানা থাকা, সূরাতুল ইখলাস তাফসীরসহ জানা থাকা ইত্যাদি অথবা হাদীসের পুস্তিকা আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ ব্যাখ্যাসহ জানা থাকা।

মোটকথা তালিবে ইলমের এমন কিছু মৌলিক ইলম থাকতে হবে, যে ইলমের ওপর ভিত্তি করে সে সামনে এগোতে পারবে। তাই বলছি: আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ ব্যাখ্যাসহ মুখস্থ করার মাধ্যমে তালিবে ইলম ব্যাপক কল্যাণ দেখতে পাবে। কারণ, এ পুস্তিকার হাদীসগুলো প্রচুর মাসআলাকে অর্ন্তভুক্ত করেছে। ‘আল-আরবা‘ঈন আন-নাওয়াওয়িয়্যাহ’ এর পর তালিবে ইলম হাদীসের পুস্তিকা ‘উমদাতুল আহকাম’ পড়া শুরু করবেন। পরবর্তী পর্যায়ে এসে তিনি ‘বুলুগুল মারাম’ পড়বেন। যদি কোনো তালিবে ইলম নিজের মধ্যে ব্যাপক স্পৃহা অনুভব করেন তাহলে তিনি বুলুগুল মারাম মুখস্থ করে নিতে পারেন। আর যদি ‘বুলুগুল মারাম’ মুখস্থ করার হিম্মত না থাকে তাহলে তিনি ‘উমদাতুল আহকাম’ মুখস্থ করতে পারেন। বুলুগুল মারামের পর এই পর্ব শেষ। এবার তিনি হাদীসের বড় বড় গ্রন্থগুলো পড়তে কোনো আপত্তি নেই। যেমন, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ইত্যাদি। কিন্তু ইতোপূর্বে উল্লিখিত মৌলিক ভিত্তি অর্জনের পূর্বে আপনি এ কিতাবগুলো পড়া শুরু করবেন না। কারণ এতে করে আপনি এমন কিছু হাদীসের মুখোমুখি হবেন যেগুলোর অর্থ আপনি বুঝতে পারবেন না। কিছু হাদীস আপনার সামনে আসতে পারে বাহ্যত আপনার কাছে এগুলোকে স্ববিরোধী মনে হবে। হতে পারে এ সকল হাদীস হতে নির্ণীত মাসআলাগুলো আপনার নিকট কঠিন মনে হতে পারে।