hadith book logo

ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদ

লেখকঃ শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দিল্লাহ্ ইব্‌ন বায -রাহেমাহুল্লাহ্- • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

কুরআনী আইনের বিরোধিতা

আরব জাতীয়তাবাদ প্রচার নিষিদ্ধ হবার চতুর্থ কারণ এই যে, এই প্রচারের ফলে কুরআনের আইন প্রত্যাখ্যান করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কারণ, অমুসলিম জাতীয়তাবাদীরা স্বভাবতই কুরআনের আইন মানতে রাজি হবে না। যে কারণে জাতীয়তাবাদের নেতারা কুরআন বিরোধী এমন কতিপয় বানানো আইন প্রবর্তন করতে বাধ্য হবে যা জাতীয়তাবাদী সমাজের সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে। ঐ নেতাদের অনেকে কথাটি প্রকাশ্যেই বলেছে। নি:সন্দেহে এটা পরিষ্কার কুফ্‌র ও দ্বীনকে পরিত্যাগ করার নামান্তর। আল্লাহ বলেছেন:

﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [ النساء : ٦٥ ]

“তোমার প্রতিপালকের শপথ, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিরোধ মীমাংসার জন্য সম্পূর্ণ কুন্ঠাহীন চিত্তে তোমাকে বিচারক মেনে পুরোপুরিভাবে তোমার রায় মেনে না নেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার বলে বিবেচিত হবেনা।” [. আন-নিসা , ৬৫]

﴿ أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ ٥٠ ﴾ [ المائ‍دة : ٥٠ ]

“তারা কি তাহলে জাহেলিয়াতের আইন চায়? বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ট আইনদাতা কে আছে? ” [. আল-মায়েদাহ, ৫০]

﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [ المائ‍دة : ٤٤ ]

“যারা আল্লাহর দেয়া আইন অনুযায়ী শাসন করেনা, তারা কাফির।” [আল-মায়েদাহ: ৪৪।]

﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [ المائ‍دة : ٤٥ ]

“যারা আল্লাহর দেয়া আইন অনুযায়ী শাসন করেনা, তারা জালিম।” [. আল-মায়েদাহ , ৪৫]

﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧ ﴾ [ المائ‍دة : ٤٧ ] “যারা আল্লাহর দেয়া আইন অনুযায়ী শাসন করেনা, তারা ফাসিক।” [. আল-মায়েদাহ ৪৭]

যে রাষ্ট্র আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা চালায় না এবং আল্লাহর আইন মানে না, সে রাষ্ট্র জাহেলী রাষ্ট্র, এসব স্পষ্ট আয়াত অনুযায়ী সে রাষ্ট্র কাফির, জালিম ও ফাসিক রাষ্ট্র। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রশ্নে সেদেশের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা ইসলামের অনুসারীদের জন্য অপরিহার্য। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে তাঁর বিধান অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা না চালানো পর্যন্ত ঐ দেশের সাথে বন্ধুত্ব করা মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আল্লাহ বলেন:

﴿ قَدۡ كَانَتۡ لَكُمۡ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ فِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذۡ قَالُواْ لِقَوۡمِهِمۡ إِنَّا بُرَءَٰٓؤُاْ مِنكُمۡ وَمِمَّا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ كَفَرۡنَا بِكُمۡ وَبَدَا بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةُ وَٱلۡبَغۡضَآءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ وَحۡدَهُۥٓ ﴾ [ الممتحنة : ٤ ]

“ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মাঝে তোমাদের জন্য এক সুন্দর আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের কওমকে বলে দিয়েছিল: তোমাদের সাথে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছ তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের নীতি ও আদর্শের সাথে বিরোধ ঘোষণা করলাম এবং আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সূচিত হল, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” [. আল-মুম্‌তাহানা , ৪]

অতএব জাতীয়তাবাদের নেতা ও প্রচারকদের উচিত আত্মসচেতন হওয়া এবং তাদের এই প্রচারের অশুভ ও মারাত্মক পরিণতির কথা চিন্তা করা। তাদের উচিত জাতীয়তা কিংবা স্বদেশিকতা প্রচারের পরিবর্তে সর্বশক্তি নিয়োগ করে ইসলাম প্রচার করা ও লোকদের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্যসমূহ ছড়িয়ে দেয়া এবং ইসলামের বিধানসমুহ শক্তহাতে ধরে তার শাসনব্যবস্থার প্রতি লোকদের আকৃষ্ট করে তোলা। তাদের জানা উচিত যে, দ্বীনের পথে ফিরে না এলে কিংবা নিজেদের বিরোধ মীমাংসায় দ্বীনের সিদ্ধান্ত না মানলে আল্লাহ তাদের ওপর প্রতিশোধ নেবেন, তাদের ঐক্য বিচ্ছিন্ন করে দেবেন এবং তাঁর নিয়ামত থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করবেন। অতঃপর তাদের জায়গায় আর একদল লোক পাঠাবেন যারা তাঁর দ্বীনকে শক্তহাতে ধরবে ও দ্বীনের বিরোধী শক্তির সাথে লড়াই করবে। আল্লাহ যেমন বলেছেন:

﴿ وَإِن تَتَوَلَّوۡاْ يَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَيۡرَكُمۡ ثُمَّ لَا يَكُونُوٓاْ أَمۡثَٰلَكُم ٣٨ ﴾ [ محمد : ٣٨ ]

“আর তোমরা যদি বিপথে যাও তাহলে তিনি তোমাদের জায়গায় অন্য একদল লোক পাঠাবেন। তারা তোমাদের মত হবে না।” [.মুহাম্মদ , ৩৮]

﴿ فَلَمَّا نَسُواْ مَا ذُكِّرُواْ بِهِۦ فَتَحۡنَا عَلَيۡهِمۡ أَبۡوَٰبَ كُلِّ شَيۡءٍ حَتَّىٰٓ إِذَا فَرِحُواْ بِمَآ أُوتُوٓاْ أَخَذۡنَٰهُم بَغۡتَةٗ فَإِذَا هُم مُّبۡلِسُونَ ٤٤ فَقُطِعَ دَابِرُ ٱلۡقَوۡمِ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْۚ وَٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٤٥ ﴾ [ الانعام : ٤٤، ٤٥ ]

“তাদের যা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলেই গেল তখন আমরা তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে অনেককিছু পেয়ে তারা যখন বেশ খুশী, তখন আমরা হঠাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। অমনি তারা দিশেহারা হয়ে পড়ল। এভাবে জালিম লোকদের শিকড় কেটে ফেলে হল। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক।” [. আল-আন্‌ আম, ৪৪-৪৫]

সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إن الله ليملي للظالم حتى إذا أخذه لم يفلته»

“জালিমকে আল্লাহ্‌ কিছুটা ঢিল দেন। তারপর যখন ধরেন, তখন আর ছাড়েন না।”

এই কথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত পাঠ করেন:

﴿ وَكَذَٰلِكَ أَخۡذُ رَبِّكَ إِذَآ أَخَذَ ٱلۡقُرَىٰ وَهِيَ ظَٰلِمَةٌۚ إِنَّ أَخۡذَهُۥٓ أَلِيمٞ شَدِيدٌ ١٠٢ ﴾ [ هود : ١٠٢ ]

আর আল্লাহর ধরা এমনই হয়ে থাকে, যখন তিনি জালিম জনবসতিগুলোকে ধরেন। তাঁর ধরা বড় যন্ত্রনাদায়ক, বড় কঠোর।” [.হূদ, ১০২]

অতএব জাতীয়তাবাদীদের উচিত আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর নিকট তাওবা করা এবং আল্লাহর নিয়ামতের জন্য তাঁর শোকর আদায় করা। সাথে সাথে তাদের উচিত আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদনুযায়ী নিজেরা চলা ও অন্যদের চলতে বলা এবং এর বিপরীত পথ থেকে লোকদের সাবধান করে দেয়া। বস্তুত: এ পথেই রয়েছে সামাজিক কল্যাণ এবং মানসিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি। এ পথেই ইহ-পরকালের সম্মান ও সুখ রয়েছে, রয়েছে আল্লাহর আযাব থেকে নিষ্কৃতির গ্যারান্টি। এর বিপরীত যেসব প্রচার, তার পরিণতি জাহান্নাম, মানসিক অশান্তি আর সামাজিক অস্থিরতা। তাতে শত্রুর প্রতিপত্তি বেড়ে যায় এবং সুখ ও ইহকাল-পরকালের নিরাপত্তা হারাতে হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:

﴿ فَإِمَّا يَأۡتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدٗى فَمَنِ ٱتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشۡقَىٰ ١٢٣ وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِكۡرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحۡشُرُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ أَعۡمَىٰ ١٢٤ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِيٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرٗا ١٢٥ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ ١٢٦ وَكَذَٰلِكَ نَجۡزِي مَنۡ أَسۡرَفَ وَلَمۡ يُؤۡمِنۢ بِ‍َٔايَٰتِ رَبِّهِۦۚ وَلَعَذَابُ ٱلۡأٓخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبۡقَىٰٓ ١٢٧﴾ [ سورة طه : 123-127]

“তোমাদের কাছে আমার হেদায়েত আসবে। যে আমার হেদায়েত অনুযায়ী চলবে সে বিভ্রান্ত কিংবা অসুখী হবে না। আর যে আমার বিধান সম্পর্কে অমনোযোগী থাকবে, তার জন্য রয়েছে এক কষ্টসাধ্য জীবন। আর আমরা তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠাব। সে বলবে, হে প্রভু! আমিতো দৃষ্টিমান ছিলাম, আমাকে অন্ধ করে উঠিয়েছ কেন? তিনি বলবেন, তোমার কাছে আমাদের নিদর্শনসমূহ এসেছিল, তুমি তা ভূলে গিয়েছিলে। ঠিক তেমনি তোমাকেও আজ ভুলে যাওয়া হচ্ছে। যে সীমা লংঘন করে এবং তার প্রভূর নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করে না, আমরা তার এরকমই প্রতিদান দিয়ে থাকি। পরকালের আযাব অত্যন্ত কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী।” [. তাহা, ১২৩-১২৭]

এসব আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন যে, যে তার পথ অনুসরণ করবে, সে বিভ্রান্ত কিংবা অসুখী হবে না বরং তার ভাগ্যে সুপথ ও ইহকালের সুখ রয়েছে। আর যে তাঁর বিধান সম্পর্কে অমনোযোগী হবে তার জন্য রয়েছে পৃথিবীতে এক কষ্টসাধ্য জীবন, আর পরকালে অন্ধত্ব ও শাস্তি। পৃথিবীতে জীবনের কষ্ট বলতে, মনের আঁধার ও অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও সংশয়, পার্থিব সম্পদ অন্বেষণ ও সংরক্ষণে নানান কষ্টক্লেশ, তার ঘাটতি ও হারানোর আশঙ্কা এবং এ ছাড়া নানারকম তাৎক্ষণিক শাস্তি যা ইসলামের শত্রুরা পৃথিবীতে ভোগ করছে। আল্লাহ বলেছেন:

﴿ فَلَا تُعۡجِبۡكَ أَمۡوَٰلُهُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُهُمۡۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَتَزۡهَقَ أَنفُسُهُمۡ وَهُمۡ كَٰفِرُونَ ٥٥﴾ [ سورة التوبة : 55]

“তাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি যেন তোমাকে মুগ্ধ না করে। আল্লাহর ইচ্ছা, ঐসব দিয়ে পার্থিব জীবনে তাদের শাস্তি দিবেন, আর কাফির অবস্থায় তাদের প্রাণ চলে যাবে।” [. আত-তাওবা, ৫৫]

﴿ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ ٱلۡأَدۡنَىٰ دُونَ ٱلۡعَذَابِ ٱلۡأَكۡبَرِ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٢١﴾ [ سورة السجدة : 21]

“বৃহত্তর শাস্তির পূর্বে আমরা তাদের ক্ষুদ্রতর শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।” [. আস-সিজদা, ২১]

এ প্রসঙ্গে বহু আয়াত রয়েছে। আল্লাহর কাছে আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের অন্তর সংশোধন করে দেন, আমাদের পাপগুলো চিনিয়ে দেন, পাপ থেকে তওবা করার সুযোগ দিয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আমাদেরকে ও আমাদের সকল ভাইদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। আসুন আমরা প্রখ্যাত মিসরীয় লেখক মুহাম্মাদ আল-গাযালীর জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত চমৎকার কিছু কথা উদ্ধৃত করে আলোচনা এখানেই শেষ করি। তিনি তাঁর مع الله (আল্লাহর সাথে) নামক গ্রন্থের ২৫৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন: