hadith book logo

ছহীহ্‌ সুন্নাহ্‌র আলোকে বিতর নামায

লেখকঃ মুহা: আবদুল্লাহ্‌ আল কাফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

মাগরিবের মত তিন রাকাত বিতর পড়াঃ

তিন রাকাত বিতরের ক্ষেত্রে উল্লেখিত দুহটি পদ্ধতি ছাড়া আরো একটি পদ্ধতি আছে তা হলো বিতর নামাযকে মাগরিবের নামাযের মত করে পড়া। অর্থাৎ- দুহরাকাত পড়ে তাশাহুদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া ও এক রাকাত পড়া। যেমন আমাদের সমাজে সচরাচর হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটির পক্ষে দলীল হলো-

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

وتر الليل ثلاث ركعات كوتر النهار

রাতের বিতর তিন রাকাত, উহা হল দিনের বিতর মাগরিবের মত। [. দারাকুতনী, ২/২৭,২৮। ও বায়হাকী হা/৪৮১২।]

এ হাদীছটি ইমাম দারাকুতনী বর্ণনা করে বলেন, হাদীছটি ছহীহ নয়; উহা যঈফ।

ইমাম বাইহাক্বী বলেন, হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হলেও তা মূলতঃ ইবনে মাসউদের নিজস্ব কথা হিসেবে প্রমাণিত। [. নাসবুর রায়া ২/১১৬।]

বিতর নামায মাগরিবের মত আদায় করার ব্যাপারে আরেকটি যুক্তি পেশ করা হয়। তা হচ্ছেঃ ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

المغرب وتر النهار فأوتروا صلاة الليل

মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতর নামায। অতএব তোমরা রাতের নামাযকে বিতর কর। [. হাদীছটি ইবনু ওমরের বরাতে ত্ববরানী বর্ণনা করেন। (দ্রঃ ছহীহুল জামে- আলবানী অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায, হা/১৪৫৬।]

ব্যাখ্যাঃ এ হাদীছ থেকে বুঝা যায়, রাতের বিতর মাগরিবের মত করেই আদায় করতে হবে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এখানে রাকাতের সংখ্যার দিক থেকে যেমন মাগরিব নামায বিতর তথা বেজোড় করা হয়, অনুরূপ রাতেও বিতর তথা বেজোড় নামায আদায় করবে- উক্ত নামায আদায় করার জন্য মাগরিবের মত দুহই তাশাহুদে পড়তে হবে একথা বলা হয়নি। এখানে রাকাতের সংখ্যার দিক থেকে বিতরকে মাগরিবের মত বলা হয়েছে- পদ্ধতির দিক থেকে নয়। এই কারণেই অন্য হাদীছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামাযকে মাগরিবের সাথে সাদৃশ্য করে পড়তে নিষেধ করেছেন।

আবু হুরায়রাহ্‌ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

لاَ تُوترُوا بِِثَلاَثٍ تَشَبَّهُوا بِصَلاَةِ المَغْرِبِ، ولكِنْ أوْتِرُوا بِخَمْسٍ أو بسبعٍ أو بِتِسْعٍ أوْ بِِاحدَى عَشَرَة

তোমরা মাগরিবের নামাযের সাথে সাদৃশ্য করে তিন রাকাত বিতর পড়না; বরং পাঁচ রাকাত দ্বারা বা সাত রাকাত দ্বারা বা নয় রাকাত দ্বারা কিংবা এগার রাকাত দ্বারা বিতর পড়। [. তাহাভী, দারাকুতনী, ইবনু হিববান ও হাকিম হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। হাকিম হাদীছটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী ছহীহ আখ্যা দিয়েছেন এবং ইমাম যাহাবী সমর্থন করেছেন। ইবনু হাজার ও শাওকানীও ছহীহ্ বলেছেন। (দ্রঃ ফাতহুল বারী, ২/৫৫৮, নায়লুল আউতার ৩/৪২-৪৩। শায়খ আলবানীও ছহীহ আখ্যা দিয়েছেন (দ্রঃ ছালাতু তারাবীহ্- ৮৪ ও ৯৭ পৃঃ)]

শায়খ আলবানী বলেন, ওতিন রাকাত বিতর দুহতাশাহুদে পড়লেই তা মাগরিবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়। আর হাদীছে এটাকেই নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যদি একেবারে শেষ রাকাতে বসে তবে কোন সাদৃশ্য হবে না। হাফেয ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে [. ফাতহুলবারী, ৪/৩০১।] একথাই উল্লেখ করেছেন এবং ছানআনী সুবুলস্‌ সালামে [. সুবুলুস্ সালাম, ১/১২২।] এই পদ্ধতিকে উত্তম বলেছেন।হ [. ছালাতুত্ তারাবীহ্- আলবানী, পৃঃ ৯৭।]

সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, বিতর নামাযকে মাগরিবের মত করে আদায় করা তথা দুহতাশাহুদে অর্থাৎ- দুহরাকাতের পর তাশাহুদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে এক রাকাত পড়া সুন্নাতের পরিপন্থী যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

অনেকে বলতে পারেন, আমরা ক্বনূত, ক্বিরাত ও বর্ধিত তাকবীরের মাধ্যমে মাগরিব থেকে পার্থক্য করে নেই। কিন্তু একথা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বিতর নামাযে ক্বনূত পাঠ করা ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব বিষয়। [. এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে। ইনশাআল্লাহ\] তাছাড়া নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাগরিবের নামাযেও ক্বনূত পড়েছেন। [. ছহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ মসজিদ ও সিজদার স্থান, হা/১০৯৩, ১০৯৪।] আর ছহীহ্‌ হাদীছের ভিত্তিতে ফরয ছালাতের সমস্ত রাকাতে সূরা মিলানো যায়। [. দেখুন মুসলিম শরীফ নবভীর ভাষ্যসহ। ৪/১৭২, ১৭৪।] বিতর নামাযে বর্ধিত তাকবীরের তো কোন ভিত্তিই নেই। [. এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে। ইনশাআল্লাহ\] সুতরাং প্রচলিত নিয়মে বিতর পড়লে তথা দুহরাকাত পড়ে তাশাহুদে বসে সালাম না ফিরিয়েই আরেক রাকাত পড়লে তা মাগরিবের সাথে মিলে যায় এবং হাদীছের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হয়। অতএব এই নিয়মে বিতর পড়া উচিত নয়।

শায়খ আলবানী বলেন, মাগরিবের মত করে দুহতাশাহুদে বিতর নামায সুস্পষ্ট ছহীহ্‌ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। এই কারণে আমরা বলব, তিন রাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে মধ্যখানে তাশাহুদের জন্য বসবে না। আর বসলে সালাম ফিরিয়ে দিবে। তারপর এক রাকাত পড়বে। আর তিন রাকাতের ক্ষেত্রে এটাই উত্তম পদ্ধতি। [. ছালাতুত্ তারাবীহ্- শায়খ আলবানী, পৃঃ ৯৮।]