hadith book logo

প্রতিপক্ষের মতামত খন্ডনে ইসলামি শিষ্টাচার

লেখকঃ আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

(ঙ) কোনো অবস্থায় আলেমদের অবমাননা করা যাবে না

বিতর্কের প্রতিপক্ষ যদি আলেমে দীন হয়ে থাকেন তাহলে তার সাথে বিতর্কে আরো বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিতর্ক করতে যেয়ে তাকে যেন অবমাননা বা অসম্মানকর কিছু করা না হয়। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী বিষয়। এ বিষয়টিতে আমি দীর্ঘ আলোচনা না করে শুধু আল-কুরআন থেকে একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরব। বিষয়টির গুরুত্ব উপলদ্ধি করার জন্য এতটুকু যথেষ্ট বলে আমার কাছে মনে হয়।

তাবুক যুদ্ধের সময় কিছু সংখ্যক মানুষ আলেম ও কারী সাহাবিদের সমালোচনা করে বলল, ‘আমাদের আলেম ও কারীগণ খাওয়া-দাওয়ার বেলায় পেটুক আর লড়াইয়ে কাপুরুষ।’

এ সমালোচনার বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- জানতে পারলে যারা সমালোচনা করেছে তিনি তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন। তারা বলল, ‘আমরা হাসি-তামাশাচ্ছলে কথাগুলো বলেছি মাত্র।’

সাথে সাথে আল্লাহ এ সম্পর্কে আয়াত নাজিল হল-

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ﴿৬৫﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ ﴿৬৬﴾

‘আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, ‘আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা অজুহাত পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরি করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী।’ (তাওবা : ৬৫-৬৬)

আল্লাহর এ বাণীতে আমরা দেখি যে, তিনি আলেমদের অবমাননাকর সমালোচনা, তাদের বিদ্রুপ করাকে আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও রাসূলের বিদ্রুপ বলে অভিহিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি এ কাজটিকে ঈমান আনার পর কুফরি বলে ঘোষণা করেছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকে বহু আলেম অন্য আলেমদের সমালোচনা করতে যেয়ে এ বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখেন না।

আর আলেম ব্যতীত অনেক মানুষ এমনকি বহু ইসলামি চিন্তাবিদ (প্রতিষ্ঠানিক আলেম নন) অহরহ আলেমদের সম্পর্কে কটুক্তি করে থাকেন। কথায় কথায় তাদের অবমাননা করে থাকেন। এটা একটি মারাত্মক ব্যধি। এমনি মারাত্মক যাকে আল্লাহ কুফরি বলে অভিহিত করেছেন।

আমাদের সমাজের আলেমগণ মানুষ। তারা ফেরেশ্তা নন। এ প্রত্যাশা করা ঠিক নয় যে, আলেমগণ হবেন ফেরেশ্তা। কাফের ও পৌত্তলিকরা দাবি করত যে, নবী-রাসূলগণ মানুষ হবেন কেন? তারা হবেন ফেরেশতা। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনের বহু স্থানে তাদের এ দাবিকে খন্ডন করেছেন।

আমাদের সমাজে আধুনিক শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত অনেক মানুষ আছেন যারা ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর পড়াশুনা ও গবেষণা করে ইসলামি চিন্তাবিদ হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছেন। সমাজে ইসলামের প্রসারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। তাদের নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু দেখা যায়, তারা অনেক সময় আলেমদের সম্পর্কে কটুক্তি করেন। ঢালাওভাবে সমালোচনা করেন। কিন্তু এটা যে একটা ঈমানি সমস্যা, এ বিষয়টি তাদের চিন্তা ও গবেষণায় ধরা পড়ে না।

তারাও ইসলামের বাহক আর আলেমগণও ইসলামের বাহক। কিন্তু এ দু’দলের মধ্যে পার্থক্য হল আকাশ-পাতাল। আলেমগণ সর্বদা ‘আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন’ এ রকম বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন সারা জীবন। নিন্দুকের নিন্দার প্রতি কোনো কর্ণপাত নেই তাদের। ইসলামের জন্য যে কোনো ঝুঁকি নিতে সর্বদা প্রস্ত্তত। নিজেদের জীবনের সকল সুখ-শান্তি, অর্থ-বিত্ত, সমাজে প্রতিষ্ঠা সবকিছুই ত্যাগ করেছেন ইসলামের জন্য। আল্লাহর এ দীনের জন্যই তারা দারিদ্রতা, হীনতা, অপমান, লাঞ্ছনা, অভাব-অনটন, সমাজ ও রাষ্ট্রের অবমূল্যায়ন, সাম্রাজ্যবাদীদের চোখ রাঙ্গানি বেছে নিয়েছেন। এতে সন্তুষ্ট থেকেছেন। ইসলামের ধারক-বাহক হিসাবে আর কে তাদের সম-মর্যাদার অধিকারী হতে পারে? আল্লাহ রাববুল আলামিনের কাছে তারা প্রিয় হবে না কেন? এ কারণে আল্লাহ তাদের অবমাননা ও অসম্মানকে কুফরি বলে অভিহিত করেছেন। যা ঈমানকে বিনষ্ট করে দেয়। তাদের বিদ্রুপ করাকে নিজের সাথে বিদ্রুপ বলে অভিহিত করেছেন।

আপনি একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। সমাজে আপনার অবদান আছে অনেক। সাথে সাথে আপনি ইসলাম নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। সব কিছু ঠিক আছে। কিন্তু আপনি কি আলেমদের মত ইসলামের জন্য ঝুঁকি নিতে পেরেছেন? ভবিষ্যতে কি পারবেন? ইসলামের যা কিছু বিজ্ঞানের সাথে মানানসই তা আপনি প্রচার করেন বুক ফুলিয়ে। ইসলামকে কিভাবে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত তরিকায় প্রচার করা যায় সে পরিকল্পনা আপনার মানসিকতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু ইসলামের যা কিছু আপাতত বিজ্ঞানের সাথে খাপ খায় না, তা বলতে আপনার মুখ শুকিয়ে যায়। বুকটা ধরফর করে। লোকে কী বলবে ভাবনা জাগে। ইসলামের সব কিছু প্রচার করলে আবার কেহ আমাকে মৌলবাদী তালিকায় নাম লিখে দেয় এ দুঃচিন্তা আপনাকে তাড়া করে।

অতএব এ সত্যটুকু উপলদ্ধি করুন আপনি কখনো সে সকল আলেমদের সমকক্ষ হতে পারবেন না কোনো দিন, যারা ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাদের দেখতে যত খারাপ লাগুক, তাদের কথা যতই অগোছালো হোক, ভাষা তাদের যতই গ্রাম্য হোক, দুনিয়াদারী সম্পর্কে যত বে-খবর হোক। ইসলামের প্রচারক হিসাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে তারাই গ্রহণযোগ্য ও পছন্দনীয়। তাদের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা ইসলামকে টিকিয়ে রেখেছেন দেড় হাজার বছর ধরে। কেয়ামত পর্যন্ত ইসলাম টিকে থাকবে তাদের মাধ্যমেই।