hadith book logo

ইসলাম ভঙ্গের ১০টি কারণ

লেখকঃ মোহাম্মদ ইমাম হুসাইন কামরুল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

ইসলাম ভঙ্গের পঞ্চম কারণ যাদু বা মন্ত্র করা

অর্থাৎ যাদু বা মন্ত্রের মাধ্যমে কারো কল্যাণ অথবা অকল্যাণ করার চেষ্টা করা। এটি দুইভাবে হাতে পারে : (১) এমন কিছু আমলের মাধ্যমে, যা মানুষের দেহ অথবা মনের ভেতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যাতে মানুষ অসুস্থ হয়, মরে যায় অথবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় অথবা কোন কাজ করে ভুলে যায়। এরূপ যাদুকে হাক্বীক্বী যাদু বলা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এ প্রকারের যাদু করা হয়েছিল। (২) এমন কিছু আমলের মধ্যেম, যে যাদু চোখ এবং দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলে। যার কারণে কোন বস্তুকে বাস্তবতার বিপরীত দেখা যায়। এরূপ যাদুকে তাখঈলী যাদু বলা হয়। ফিরাউনের যাদুকররা মূসা (আঃ) এর সাথে এ প্রকারের যাদু করেছিল। কুরআনে এসেছে,

﴿فَاِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ اِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ اَنَّهَا تَسْعٰى﴾

অতঃপর তাদের যাদুর প্রভাবে মূসার কাছে মনে হলো, যেন তাদের রশি ও লাঠিগুলো ছোটাছুটি করছে। (সূরা ত্বা-হা- ৬৬)

﴿فَلَمَّاۤ اَلْقَوْا سَحَرُوْاۤ اَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوْهُمْ وَجَآءُوْا بِسِحْرٍ عَظِيْمٍ﴾

যখন তারা নিজেদের যাদু ছাড়ল, তখন তা দ্বারা লোকদের চোখে যাদু করল এবং তাদের আতঙ্কিত করে তুলল। (সূরা আ‘রাফ- ১১৬)

তবে যেভাবেই হোক না কেন যে ব্যক্তি এই কাজে লিপ্ত হবে, তার ইসলাম ভঙ্গ হয়ে যাবে। কেননা এটি স্পষ্ট কুফর। এতে অনেক বড় ধরনের শিরক ও কুফর মিশ্রিত রয়েছে। আল্লাহর কালাম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নায় এ কাজটিকে কুফর হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَاتَّبَعُوْا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِيْنُ عَلٰى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلٰكِنَّ الشَّيَاطِيْنَ كَفَرُوْا يُعَلِّمُوْنَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَاۤ اُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوْتَ وَمَارُوْتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ اَحَدٍ حَتّٰى يَقُوْلَاۤ اِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُوْنَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُوْنَ بِهٖ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهٖ وَمَا هُمْ بِضَآرِّيْنَ بِهٖ مِنْ اَحَدٍ اِلَّا بِاِذْنِ اللهِ وَيَتَعَلَّمُوْنَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوْا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهٗ فِى الْاٰخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ وَّلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهٖۤ اَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ ‐ وَلَوْ اَنَّهُمْ اٰمَنُوْا وَاتَّقَوْا لَمَثُوْبَةٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ خَيْرٌ لَّوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ﴾

সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা আবৃত্তি করত, তারা তারই অনুসরণ করছে। সুলায়মান কুফরী করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা লোকদেরকে যাদুবিদ্যা এবং যা বাবেল শহরে হারূত-মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল তা শিক্ষা দিত। তবে তারা উভয়ে কাউকে তা ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষা দিত না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এ কথা না বলত যে, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ। অতএব, তুমি কুফরী করো না; অথচ তারা উভয়ের নিকট তা শিক্ষা করত যা দ্বারা স্বামী ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়। তবে তারা আল্লাহর হুকুম ব্যতীত তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারত না। আর তারা শিক্ষা করত এমন বিষয়, যা তাদের ক্ষতি করে এবং কোন উপকার করে না। আর নিশ্চয় তারা জ্ঞাত আছে যে, অবশ্য যে কেউ ওটা ক্রয় করেছে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। আর যার বিনিময়ে তারা নিজেদেরকে বিক্রয় করেছে তা নিকৃষ্ট যদি তারা তা জানত। আর যদি তারা ঈমান আনত এবং ভয় করত, তবে আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণ লাভ করত, যদি তারা এটা বুঝত! (সূরা বাকারা- ১০২, ১০৩)

অনুরূপভাবে হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাক। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সাথে শিরক করা, (২) যাদু করা, (৩) অন্যায়ভাবে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছে, (৪) সূদ খাওয়া, (৫) ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, (৬) যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং (৭) সতী-সাধ্বী মুমিন মহিলাকে অপবাদ দেয়া। [সহীহ বুখারী, হা/২৭৬৬; সহীহ মুসলিম, হা/৮৯।]

অপর হাদীসে যাদুকরদেরকে হত্যা করা নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। যেমন-

عَنْ جُنْدُبٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- : حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبُهٗ بِالسَّيْفِ

জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারি দিয়ে তার গর্দান কেটে ফেলা। [বায়হাকী, হা/১৬৯৪২; তিরমিযী, হা/১৪৬০; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮০৭৩; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৬৬৫; মিশকাত, হা/৩৫৫১; শাইখ আলবানী হাদীসটির সনদকে যঈফ বলেছেন।]

এসব আয়াত ও হাদীসের প্রতি দৃষ্টি রেখেই আলেমগণ যাদুকরদেরকে মুরতাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদেরকে হত্যা করার হুকুম প্রদান করেছেন।

উল্লেখ্য যে, যাদুর কারণে কোন ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণ লক্ষ্য করা যায়। যেমন-

১. যাদুকররা যাদুমন্ত্র পাঠ করার সময় এমন কিছু বাক্য উচ্চারণ করে, যা স্পষ্ট শিরক ও কুফরের অন্তর্ভুক্ত। সেসব বাক্য উচ্চারণ করার পর কোন ব্যক্তি মুসলিম থাকতে পারে না।

২. যাদুকররা যাদু করার সময় এমন কিছু কাজ করে, যা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্ট শিরক ও কুফর হিসেবে পরিগণিত। আর সেগুলো এমন পর্যায়ের গোনাহ, যা তাদেরকে সরাসরি ইসলাম থেকে বের করে দেয়। যেমন- কুরআনের আয়াত উল্টো করে লিখা, কুরআনের অপমান করা, শয়তানের আনুগত্য করা, শয়তানের নামে পশু জবাই করা ইত্যাদি।

৩. অনেক যাদুকর গায়েবী খবর জানে বলে দাবি করে থাকে। আবার অনেকে যাদুকরদের ব্যাপারেও অনুরূপ বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। অথচ এরূপ বৈশিষ্ট্যের একমাত্র মালিক হলেন আল্লাহ তা‘আলা। তাঁকে ছাড়া অন্য কেউ এ ব্যাপারে অবগত নয়। সুতরাং এ ধরনের দাবি করা এবং কারো এ ব্যাপারে অনুরূপ বিশ্বাস স্থাপন করাটা স্পষ্ট শিরক। এরূপ শিরকের ফলে যে কোন ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।



اَلنَّاقِضُ السَّادِسُ مِنْ نَّوَاقِضِ الْإِسْلَامِ