১
সাহাবায়ে কেরামের প্রতি আমাদের কর্তব্য
লেখকঃ আব্দুর রাযযাক ইব্ন আব্দুল মুহসিন আল-বাদ্র • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৭
সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর ন্যায়পরায়ণতাঃ
যাঁদেরকে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে ন্যায়পরায়ণ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন; বরং স্বয়ং আল্লাহ যাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, সেসকল সাহাবীকে কিভাবে নিন্দা করা যেতে পারে! মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ﴾ [ التوبة : ١٠٠ ]
‘মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে অগ্রবর্তী সাহাবীগণ এবং কল্যাণকর্মের মাধ্যমে তাঁদের অনুসারীগণের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন’ (আত-তাওবাহ ১০০)।
উক্ত আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা‘আলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন, তিনি তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট। দ্বীনের ধারক-বাহক হিসাবে বিশ্বস্ত নন এমন কারো প্রতি আল্লাহ কি কখনও সন্তুষ্ট হতে পারেন?! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অমিয় বাণী প্রচারে খেয়ানতকারী কারো প্রতি কি তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন?! অসম্ভব! এমনটি কখনই হতে পারে না। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। কারণ তাঁরা বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ, তাঁরা সর্বোত্তম আদর্শ এবং আল্লাহ্র দ্বীনের একনিষ্ঠ প্রচারক। আল্লাহ বলেন,
﴿رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُۚ ﴾ [ البينة : ٨ ]
‘আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন’।
তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿لَّقَدۡ رَضِيَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ﴾ [ الفتح : ١٨ ]
‘আল্লাহ মুমিনগণের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তাঁরা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে শপথ করেছেন’ (আল-ফাত্হ ১৮)।
বায়‘আতকারী এসকল সাহাবীর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও বেশী এবং তাঁদের সকলের প্রতিই আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ সম্পর্কে বলেন,
«وَمَا يُدْرِيكَ؟ لَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يَكُونَ قَدْ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ»
‘[হে ওমর!] তুমি কিভাবে জানলে [যে, হাত্বেব মুনাফিক্ব হয়ে গেছে]? [মনে রেখ], আল্লাহ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ সম্পর্কে জানেন। সেজন্যই তিনি বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা, তাই কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি’। [. সহীহ বুখারী, হা/৩০০৭; সহীহ মুসলিম, হা/২৪৯৪। হাদীসটি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন।] এগুলি পবিত্র কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত তাঁদের প্রশংসার কয়েকটি নমুনা মাত্র। সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসায় বর্ণিত আয়াত ও হাদীস হিসাব করাই কষ্টকর। সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর গুণ-গান শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনেই আসে নি; বরং তাঁদের সৃষ্টির আগেই তাওরাত ও ইঞ্জীলে তাঁদের প্রশংসার কথা বিঘোষিত হয়েছে। সূরা আল-ফাত্হের শেষ আয়াতে মহান আল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সম্পর্কে বলেন,
﴿مُّحَمَّدٞ رَّسُولُ ٱللَّهِۚ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ أَشِدَّآءُ عَلَى ٱلۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيۡنَهُمۡۖ تَرَىٰهُمۡ رُكَّعٗا سُجَّدٗا يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗاۖ سِيمَاهُمۡ فِي وُجُوهِهِم مِّنۡ أَثَرِ ٱلسُّجُودِۚ﴾ [ الفتح : ٢٩ ]
‘মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন’ (আয়াত ২৯)। তাহলে দেখা গেল, স্বয়ং প্রতিপালক সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসা করলেন। কিন্তু তাঁদের এই প্রশংসা বাণী কোথায় এবং কোন্ কিতাবে ঘোষিত হয়েছে? আল্লাহ বলেন,
﴿ذَٰلِكَ مَثَلُهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِۚ وَمَثَلُهُمۡ فِي ٱلۡإِنجِيلِ كَزَرۡعٍ أَخۡرَجَ شَطَۡٔهُۥ فََٔازَرَهُۥ فَٱسۡتَغۡلَظَ فَٱسۡتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِۦ يُعۡجِبُ ٱلزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ ٱلۡكُفَّارَۗ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِنۡهُم مَّغۡفِرَةٗ وَأَجۡرًا عَظِيمَۢا ٢٩ ﴾ [ الفتح : ٢٩ ]
‘তাওরাতে তাঁদের উদাহরণ এরূপ। আর ইঞ্জিলে তাঁদের উদাহরণ হচ্ছে একটি শস্যবীজের মত, যা থেকে উদ্গত হয় অঙ্কুর, অতঃপর তা শক্ত ও মজবূত হয় এবং কাণ্ডের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়; ইহা চাষীদেরকে আনন্দে অভিভূত করে কিন্তু আল্লাহ তাঁদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। তাঁদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন’ (আল-ফাত্হ ২৯)।
সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রতি সুবাসিত এই প্রশংসা ও গুণগান উল্লেখিত হয়েছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে।
প্রিয় মুসলিম ভাই! উক্ত আয়াতে কারীমা আপনাকে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, মহামহিম প্রতিপালক তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদেরকে ন্যায়পরায়ণ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি তাঁদের প্রশংসা করেছেন তাঁদের সৃষ্টির পূর্বে মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণের সময় এবং ঈসা (আঃ)-এর উপর ইঞ্জীল অবতীর্ণের সময়। অতঃপর তাঁদের জীবদ্দশায় তিনি আবার তাঁদের প্রশংসা করলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে।
মহান আল্লাহ কর্তৃক সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসা সম্বলিত সূরা আল-হাশরের আরো কিছু আয়াত আমরা তেলাওয়াত করব। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿لِلۡفُقَرَآءِ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِمۡ وَأَمۡوَٰلِهِمۡ يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ ٨ ﴾ [ الحشر : ٨ ]
‘এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্য, যাঁরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। বস্তুতঃ তাঁরাই সত্যবাদী’ (আল-হাশর ৮)।
এখানে আল্লাহ তাঁদেরকে সত্যবাদী হিসাবে বিশেষিত করলেন। তিনি বললেন, ﴿أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ﴾ ‘তাঁরাই হচ্ছেন সত্যবাদী’।
অতঃপর মহান আল্লাহ আনছার সাহাবীগণ সম্পর্কে বললেন,
﴿وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلۡإِيمَٰنَ مِن قَبۡلِهِمۡ يُحِبُّونَ مَنۡ هَاجَرَ إِلَيۡهِمۡ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمۡ حَاجَةٗ مِّمَّآ أُوتُواْ وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٩﴾ [ الحشر : ٩ ]
‘যাঁরা মুহাজিরগণের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন এবং ধর্মবিশ্বাস সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁরা মুহাজিরগণকে ভালবাসেন। আর মুহাজিরগণকে যা দেয়া হয়েছে, সে কারণে তাঁরা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করেন না; বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করেন। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম (আল-হাশর ৯)।
উক্ত আয়াতদ্বয়ে মুহাজির ও আনছার সাহাবীগণের প্রশংসা করা হল। আর একথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, সকল সাহাবী এই দুই প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুজাজিরগণ হলেন মক্কার অধিবাসী সাহাবীবর্গ, যাঁরা তাঁদের ধন-সম্পদ এবং ভিটে-বাড়ী ত্যাগ করে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। আল্লাহ বলেন,
﴿يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ﴾ [ الحشر : 8]
‘তাঁরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে’ (আল-হাশর ৮)। তাঁরা জীবনের সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সহযোগিতা করার জন্য মদীনায় আগমন করেন। তাই তো আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেন, ‘তাঁরাই হচ্ছেন সত্যবাদী’। অর্থাৎ ঈমান, সাহচর্য, আনুগত্য এবং আল্লাহ্র দ্বীনের অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁরা সত্যবাদী। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ رِجَالٞ صَدَقُواْ مَا عَٰهَدُواْ ٱللَّهَ عَلَيۡهِۖ فَمِنۡهُم مَّن قَضَىٰ نَحۡبَهُۥ وَمِنۡهُم مَّن يَنتَظِرُۖ وَمَا بَدَّلُواْ تَبۡدِيلٗا ٢٣﴾ [ الاحزاب : ٢٣ ]
‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি’ (আল-আহযাব ২৩)। তাঁরাই হলেন সাহাবী, প্রতিপালক যাঁদের এমন সুবাসিত প্রশংসা করলেন।
তিনি মুহাজিরগণের যেমন প্রশংসা করলেন, তেমনি প্রশংসা করলেন আনছার সাহাবীগণেরও। তিনি বললেন, ﴿وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ﴾ ‘যাঁরা মদীনায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন’। এখানে الدَّارَ অর্থঃ মদীনা। সুতরাং আনছার সাহাবীগণ মুহাজির সাহাবীগণের আগমনের পূর্বেই মদীনাকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, মুহাজিরগণের খেদমতে আনছার সাহাবীগণ কি এমন করেছিলেন? জবাবে বলব, আনছার সাহাবীগণ নিজেদের সম্পদে মুহাজিরগণকে সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আনছার সাহাবী মুহাজির সাহাবীকে তাঁর বাড়ী ও সম্পদের অর্ধেক দিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের উপরে অন্য মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই মহৎ গুণের কারণে মহান আল্লাহ তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, ﴿وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ﴾ ‘তাঁরা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদেরকে (মুহাজিরগণ) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেন’। আনছার এবং মুহাজিরগণ আল্লাহ্র দ্বীনের সাহায্যার্থে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা করেছিলেন। তাই তো তাঁরা সবাই আল্লাহ্র দ্বীনের সাহায্যকারী। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَمَا بَدَّلُواْ تَبۡدِيلٗا ٢٣﴾
‘তাঁরা তাঁদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেন নি’।
﴿ وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ﴾ [ التوبة : ١٠٠ ]
‘মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে অগ্রবর্তী সাহাবীগণ এবং কল্যাণকর্মের মাধ্যমে তাঁদের অনুসারীগণের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন’ (আত-তাওবাহ ১০০)।
উক্ত আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা‘আলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন, তিনি তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট। দ্বীনের ধারক-বাহক হিসাবে বিশ্বস্ত নন এমন কারো প্রতি আল্লাহ কি কখনও সন্তুষ্ট হতে পারেন?! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অমিয় বাণী প্রচারে খেয়ানতকারী কারো প্রতি কি তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন?! অসম্ভব! এমনটি কখনই হতে পারে না। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। কারণ তাঁরা বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ, তাঁরা সর্বোত্তম আদর্শ এবং আল্লাহ্র দ্বীনের একনিষ্ঠ প্রচারক। আল্লাহ বলেন,
﴿رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُۚ ﴾ [ البينة : ٨ ]
‘আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন’।
তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿لَّقَدۡ رَضِيَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ﴾ [ الفتح : ١٨ ]
‘আল্লাহ মুমিনগণের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তাঁরা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে শপথ করেছেন’ (আল-ফাত্হ ১৮)।
বায়‘আতকারী এসকল সাহাবীর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও বেশী এবং তাঁদের সকলের প্রতিই আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ সম্পর্কে বলেন,
«وَمَا يُدْرِيكَ؟ لَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يَكُونَ قَدْ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ»
‘[হে ওমর!] তুমি কিভাবে জানলে [যে, হাত্বেব মুনাফিক্ব হয়ে গেছে]? [মনে রেখ], আল্লাহ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ সম্পর্কে জানেন। সেজন্যই তিনি বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা, তাই কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি’। [. সহীহ বুখারী, হা/৩০০৭; সহীহ মুসলিম, হা/২৪৯৪। হাদীসটি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন।] এগুলি পবিত্র কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত তাঁদের প্রশংসার কয়েকটি নমুনা মাত্র। সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসায় বর্ণিত আয়াত ও হাদীস হিসাব করাই কষ্টকর। সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর গুণ-গান শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনেই আসে নি; বরং তাঁদের সৃষ্টির আগেই তাওরাত ও ইঞ্জীলে তাঁদের প্রশংসার কথা বিঘোষিত হয়েছে। সূরা আল-ফাত্হের শেষ আয়াতে মহান আল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সম্পর্কে বলেন,
﴿مُّحَمَّدٞ رَّسُولُ ٱللَّهِۚ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ أَشِدَّآءُ عَلَى ٱلۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيۡنَهُمۡۖ تَرَىٰهُمۡ رُكَّعٗا سُجَّدٗا يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗاۖ سِيمَاهُمۡ فِي وُجُوهِهِم مِّنۡ أَثَرِ ٱلسُّجُودِۚ﴾ [ الفتح : ٢٩ ]
‘মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন’ (আয়াত ২৯)। তাহলে দেখা গেল, স্বয়ং প্রতিপালক সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসা করলেন। কিন্তু তাঁদের এই প্রশংসা বাণী কোথায় এবং কোন্ কিতাবে ঘোষিত হয়েছে? আল্লাহ বলেন,
﴿ذَٰلِكَ مَثَلُهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِۚ وَمَثَلُهُمۡ فِي ٱلۡإِنجِيلِ كَزَرۡعٍ أَخۡرَجَ شَطَۡٔهُۥ فََٔازَرَهُۥ فَٱسۡتَغۡلَظَ فَٱسۡتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِۦ يُعۡجِبُ ٱلزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ ٱلۡكُفَّارَۗ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِنۡهُم مَّغۡفِرَةٗ وَأَجۡرًا عَظِيمَۢا ٢٩ ﴾ [ الفتح : ٢٩ ]
‘তাওরাতে তাঁদের উদাহরণ এরূপ। আর ইঞ্জিলে তাঁদের উদাহরণ হচ্ছে একটি শস্যবীজের মত, যা থেকে উদ্গত হয় অঙ্কুর, অতঃপর তা শক্ত ও মজবূত হয় এবং কাণ্ডের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়; ইহা চাষীদেরকে আনন্দে অভিভূত করে কিন্তু আল্লাহ তাঁদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। তাঁদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন’ (আল-ফাত্হ ২৯)।
সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রতি সুবাসিত এই প্রশংসা ও গুণগান উল্লেখিত হয়েছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে।
প্রিয় মুসলিম ভাই! উক্ত আয়াতে কারীমা আপনাকে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, মহামহিম প্রতিপালক তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদেরকে ন্যায়পরায়ণ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি তাঁদের প্রশংসা করেছেন তাঁদের সৃষ্টির পূর্বে মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণের সময় এবং ঈসা (আঃ)-এর উপর ইঞ্জীল অবতীর্ণের সময়। অতঃপর তাঁদের জীবদ্দশায় তিনি আবার তাঁদের প্রশংসা করলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে।
মহান আল্লাহ কর্তৃক সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রশংসা সম্বলিত সূরা আল-হাশরের আরো কিছু আয়াত আমরা তেলাওয়াত করব। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿لِلۡفُقَرَآءِ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِمۡ وَأَمۡوَٰلِهِمۡ يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ ٨ ﴾ [ الحشر : ٨ ]
‘এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্য, যাঁরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। বস্তুতঃ তাঁরাই সত্যবাদী’ (আল-হাশর ৮)।
এখানে আল্লাহ তাঁদেরকে সত্যবাদী হিসাবে বিশেষিত করলেন। তিনি বললেন, ﴿أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ﴾ ‘তাঁরাই হচ্ছেন সত্যবাদী’।
অতঃপর মহান আল্লাহ আনছার সাহাবীগণ সম্পর্কে বললেন,
﴿وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلۡإِيمَٰنَ مِن قَبۡلِهِمۡ يُحِبُّونَ مَنۡ هَاجَرَ إِلَيۡهِمۡ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمۡ حَاجَةٗ مِّمَّآ أُوتُواْ وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٩﴾ [ الحشر : ٩ ]
‘যাঁরা মুহাজিরগণের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন এবং ধর্মবিশ্বাস সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁরা মুহাজিরগণকে ভালবাসেন। আর মুহাজিরগণকে যা দেয়া হয়েছে, সে কারণে তাঁরা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করেন না; বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করেন। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম (আল-হাশর ৯)।
উক্ত আয়াতদ্বয়ে মুহাজির ও আনছার সাহাবীগণের প্রশংসা করা হল। আর একথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, সকল সাহাবী এই দুই প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুজাজিরগণ হলেন মক্কার অধিবাসী সাহাবীবর্গ, যাঁরা তাঁদের ধন-সম্পদ এবং ভিটে-বাড়ী ত্যাগ করে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। আল্লাহ বলেন,
﴿يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ﴾ [ الحشر : 8]
‘তাঁরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে’ (আল-হাশর ৮)। তাঁরা জীবনের সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সহযোগিতা করার জন্য মদীনায় আগমন করেন। তাই তো আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেন, ‘তাঁরাই হচ্ছেন সত্যবাদী’। অর্থাৎ ঈমান, সাহচর্য, আনুগত্য এবং আল্লাহ্র দ্বীনের অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁরা সত্যবাদী। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ رِجَالٞ صَدَقُواْ مَا عَٰهَدُواْ ٱللَّهَ عَلَيۡهِۖ فَمِنۡهُم مَّن قَضَىٰ نَحۡبَهُۥ وَمِنۡهُم مَّن يَنتَظِرُۖ وَمَا بَدَّلُواْ تَبۡدِيلٗا ٢٣﴾ [ الاحزاب : ٢٣ ]
‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি’ (আল-আহযাব ২৩)। তাঁরাই হলেন সাহাবী, প্রতিপালক যাঁদের এমন সুবাসিত প্রশংসা করলেন।
তিনি মুহাজিরগণের যেমন প্রশংসা করলেন, তেমনি প্রশংসা করলেন আনছার সাহাবীগণেরও। তিনি বললেন, ﴿وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ﴾ ‘যাঁরা মদীনায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন’। এখানে الدَّارَ অর্থঃ মদীনা। সুতরাং আনছার সাহাবীগণ মুহাজির সাহাবীগণের আগমনের পূর্বেই মদীনাকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, মুহাজিরগণের খেদমতে আনছার সাহাবীগণ কি এমন করেছিলেন? জবাবে বলব, আনছার সাহাবীগণ নিজেদের সম্পদে মুহাজিরগণকে সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আনছার সাহাবী মুহাজির সাহাবীকে তাঁর বাড়ী ও সম্পদের অর্ধেক দিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের উপরে অন্য মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই মহৎ গুণের কারণে মহান আল্লাহ তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, ﴿وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ﴾ ‘তাঁরা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদেরকে (মুহাজিরগণ) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেন’। আনছার এবং মুহাজিরগণ আল্লাহ্র দ্বীনের সাহায্যার্থে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা করেছিলেন। তাই তো তাঁরা সবাই আল্লাহ্র দ্বীনের সাহায্যকারী। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَمَا بَدَّلُواْ تَبۡدِيلٗا ٢٣﴾
‘তাঁরা তাঁদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেন নি’।