hadith book logo

কুরআনের আলোকে নূহ আলাইহিস সালামের দা‘ওয়াহ কার্যক্রম

লেখকঃ ড. মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

তিন: সমকালীন পরিবেশ:

নূহ আলাইহিস সালাম-এর আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ আল্লাহর একত্ব ও ইবাদতের সঠিক রূপরেখা সম্পর্কে সম্পুর্ণ অজ্ঞ হয়ে পড়েছিল। তারা প্রকৃত রবের স্থলে স্বহস্তে নির্মিত মূর্তিসমূহের পূজা করত। [হিফজুর রহমান সিওহারবী, কাছাছুল কুরআন, অনুবাদ: মাও: নুরুর রহমান, এমদাদীয়া লাইব্রেরী, ঢাকা, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪।] তারা ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক এবং নাসর নামক পাঁচটি মূর্তির পূজা করত: ঘোরতর কুফর ও শিরকে নিমজ্জিত ছিল। একে অপরকে এই বলে সম্বোধন করত যে, তারা যেন নূহের প্রচারে প্রভাবিত হয়ে প্রতিমা পূজা পরিত্যাগ না করে। পবিত্র কুরআনে এসেছে:

﴿وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا ٢٣ ﴾ [ نوح : ٢٣ ]

‘‘তোমরা তোমাদের দেবদেবীকে পরিত্যাগ করোনা এবং ওয়াদ,সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরকে পরিত্যাগ করবে না।’’ [আল কুরআন, সূরা নূহ: ২৩।]

ইবন আব্বাস বলেন, ‘ওয়াদ’ ছিল কালব গোত্রের দেবমূর্তি, দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে এর মন্দির ছিল। ‘সুওয়া’ ছিল মক্কার নিকটবর্তী হুযাইল গোত্রের দেবমূর্তি। ‘ইয়াগুছ’ প্রথমে মুরাদ গোত্রের এবং পরে বনী গাতিফের দেবতা, এর আস্তানা ছিল সাবার নিকটবর্তী ‘‘জাওফ’’ নামক স্থানে। ‘ইয়াউক’ হামদান গোত্রের দেবমূর্তি। আর ‘নাসর’ ছিল ‘যুলকালা’গোত্রের হিম-ইয়ার শাখার দেবমূর্তি। এগুলো নূহের সম্প্রদায়ের কতিপয় সৎলোকের নাম ছিল। এদের মৃত্যুর পর তারা যেখানে বসে মজলিস করত, শয়তান সেখানে কিছু মুর্তি তৈরী করে স্থাপন করতে তাদের কওমের লোকের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। তাই তারা সেখানে কিছু মূর্তি তৈরী করে এবং তাদের নামে নামকরণ করে। কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। পরবর্তীতে তাদের মৃত্যুর পর এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকার জ্ঞান বিলূপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে। [মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল আল বুখারী, সহীহ আল বুখারী, মাকতাবা রশীদীয়া, দিল্লী, তা.বি. কিতাবুত্ তাফসীর, ২য় খন্ড, পৃ. ৭৩২।]

নূহ আলাইহিস সালামের জাতি এসব প্রতিমাকে তাদের ‘ইলাহ’এর নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে পূজা করত। [আফীফ আব্দুল ফাত্তাহ, মা‘আল আম্বিয়া ফিল কুরআন,দারুল ইলম,কায়রো-১৯৮৪, ৩য় সংস্করণ, পৃ. ৬১।] সর্বপ্রথম তারা ‘ওয়াদ’ নামক প্রতিমার পূজা করে, আর এটি ছিল সবচেয়ে বড়। [ইবন কাছীর, কাসাসূল আম্বিয়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬।] এসব মূর্তি পরবর্তীতে আরবদের মাঝেও প্রচলন হয়। এ ছাড়াও তাদের মাঝে নানা প্রকার পাপাচার সংগঠিত হত এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নানা অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কাওমের মধ্যে শ্রেণী বৈষম্য রোগও বিস্তার লাভ করেছিল। [আল কুরআন, সূরা, হুদ: ২৭।] এতদ্ব্যতীত কুরআনুল কারীম তাদেরকে ফাসিক এবং আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশাবলীর প্রতি বিদ্রোহী ও জালিম বলে অভিহিত করেছে। আল্লাহ বলেন

﴿ وَقَوۡمَ نُوحٖ مِّن قَبۡلُۖ إِنَّهُمۡ كَانُواْ هُمۡ أَظۡلَمَ وَأَطۡغَىٰ ٥٢ ﴾ [ النجم : ٥٢ ]

‘‘এবং নূহের সম্প্রদায়কে (ধ্বংস করা হয়েছে) আদ ও ছামুদ জাতির পূর্বে। আর তারা ছিল অত্যাধিক জালিম ও অবাধ্য।’’ [আল কুরআন, সূরা আন্ নাজম: ৫২।]

অত্যাধিক অহংকার প্রদর্শন করত: তাদের মাঝে আল্লাহ ভীতি ছিল না, ফলে তারা আল্লাহর একত্ববাদ,নবুওয়ত-রিসালাতসহ পরকাল দিবসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করত। পবিত্র কুরআন তাদেরকে قوم سوء বা মন্দ সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। [আল কুরআন, সূরা আল আম্বিয়া: ৭৭।] অতএব, ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের দিক দিয়ে নূহ আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় গোমরাহীর চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।