hadith book logo

ইখলাস

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

ইসলামে ইখলাসের স্থান:

ইখলাস হলো দীনের মূলভিত্তি। এটা সব রাসূলের দাওয়াতের বিষয়বস্তু ছিল। আল্লাহ বলেন,

﴿ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٰلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ ٥ ﴾ [ البينة : ٥ ]

“আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ‘ইবাদাত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়; আর এটিই হল সঠিক দীন”। [সূরা আল্-বায়্যিনা: ৫]

আল্লাহ আরো বলেন,

﴿ قُلۡ إِنِّيٓ أُمِرۡتُ أَنۡ أَعۡبُدَ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ١١ وَأُمِرۡتُ لِأَنۡ أَكُونَ أَوَّلَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ١٢ ﴾ [ الزمر : ١١، ١٢ ]

“বল, ‘নিশ্চয় আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমি যেন আল্লাহর ইবাদাত করি তাঁর-ই জন্য আনুগত্যকে একনিষ্ঠ করে’। আমাকে আরো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমি প্রথম মুসলিম হই”। [সূরা: আয্-যুমার: ১১-১২]

আল্লাহ আরো বলেন,

﴿أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ ٣ ﴾ [ الزمر : ٣ ]

“জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না”। [সূরা আয্-যুমার: ৩]

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

﴿ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡمَوۡتَ وَٱلۡحَيَوٰةَ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفُورُ ٢ ﴾ [ الملك : ٢ ]

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল”। [সূরা আল্-মুলক: ২]

মুখলিসদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেছেন,

﴿ وَٱذۡكُرۡ فِي ٱلۡكِتَٰبِ مُوسَىٰٓۚ إِنَّهُۥ كَانَ مُخۡلَصٗا وَكَانَ رَسُولٗا نَّبِيّٗا ٥١ ﴾ [ مريم : ٥١ ]

“আর স্মরণ কর এই কিতাবে মূসাকে। অবশ্যই সে ছিল মনোনীত এবং সে ছিল রাসূল, নবী”। [সূরা মারইয়াম: ৫১]

ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,

﴿ وَلَقَدۡ هَمَّتۡ بِهِۦۖ وَهَمَّ بِهَا لَوۡلَآ أَن رَّءَا بُرۡهَٰنَ رَبِّهِۦۚ كَذَٰلِكَ لِنَصۡرِفَ عَنۡهُ ٱلسُّوٓءَ وَٱلۡفَحۡشَآءَۚ إِنَّهُۥ مِنۡ عِبَادِنَا ٱلۡمُخۡلَصِينَ ٢٤ ﴾ [ يوسف : ٢٤ ]

“আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হল, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হত, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা: ইউসুফ: ২৪]

এমনিভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,

﴿ قُلۡ أَتُحَآجُّونَنَا فِي ٱللَّهِ وَهُوَ رَبُّنَا وَرَبُّكُمۡ وَلَنَآ أَعۡمَٰلُنَا وَلَكُمۡ أَعۡمَٰلُكُمۡ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُخۡلِصُونَ ١٣٩ ﴾ [ البقرة : ١٣٩ ]

“বল, ‘তোমরা কি আমাদের সাথে আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করছ অথচ তিনি আমাদের রব ও তোমাদের রব? আর আমাদের জন্য রয়েছে আমাদের আমলসমূহ এবং তোমাদের জন্য রয়েছে তোমাদের আমলসমূহ এবং আমরা তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ”। [সূরা আল-বাকারা: ১৩৯]

তাছাড়া ইখলাস ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। হাদীসে এসেছে,

حَدَّثَنِي ابْنُ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : «مَنْ طَلَبَ العِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ العُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ»

কা‘ব ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি এই উদ্দেশ্যে ইলম তালাশ করে যে, সে তা দিয়ে আলিমদের সঙ্গে বিতর্ক করবে বা অজ্ঞ-মুর্খদের সামনে বিদ্যা ফলাবে এবং নিজের দিকে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জাহান্নামে দাখিল করবেন”। [তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৫৪। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, হাদীসটি গরীব। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» يَعْنِي رِيحَهَا

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ইলমকে দুনিয়া লাভের আশায় অর্জন করলো, সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না”। [আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩৬৬৪। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫২।]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ "

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বরকতময় মহান আল্লাহ বলেন, আমি শরীকদের শির্ক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে যাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করে আমি তাকে ও তার শির্ককে প্রত্যাখ্যান করি”। [মুসলিম, হাদীস নং ২৯৮৫।]

ফুদাইল ইবন ‘ইয়াদ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তোমার আমল একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং সহীহভাবে করো। তাঁকে বলা হলো, হে আবু আলী, " أخلصه وأصوبه ". এর অর্থ কি? তিনি বলেন, কোনো আমল যদি একমাত্র আল্লাহর জন্য করা হয় কিন্তু তা যদি সহীহভাবে না করা হয় তবে তা কবুল করা হবে না। আবার কাজটি যদি সঠিকভাবে করা হয় তবে তাতে যদি ইখলাস না থাকে তবে তাও কবুল করা হবে না। আমলটি একমাত্র আল্লাহর জন্য ও সহীহভাবে করতে হবে। খালিস হলো আল্লাহর জন্য হওয়া আর সাওয়াব মানে সুন্নত অনুযায়ী সম্পাদন করা। [মিনহাজুস সুন্নাহ, ৬/২১৭।]

আল্লাহ বলেছেন,

﴿إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ ﴾ [ المائ‍دة : ٢٧ ]

“আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন”। [আল-মায়েদা: ২৭]

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, এ আয়াতে মানুষ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। দু’দল বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িতে আছে আর অন্য দল মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। খারেজীরা মনে করেন, কবিরা গুনাহ থেকে বিরত না থাকলে তাদের থেকে আল্লাহ কোনো আমল কবুল করবেন না। তাদের মতে কবিরা গুনাহকারীর কাছ থেকে কোনো ভালো আমল কখনও কবুল করা হয় না।

অন্যদিকে মুরজিয়া সম্প্রদায় মনে করেন, যারা শির্ক থেকে বেঁচে থাকে তাদের থেকে সৎ আমল কবুল করা হয়।

আর সালাফে সালেহীন ও আলেমগণ মনে করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় একমাত্র তাঁর জন্যই কাজটি করে তার থেকেই উক্ত কাজটি কবুল করা হয়। [পূর্বসূত্র, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৬/২১৭।]