hadith book logo

সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যা এর পরিপন্থী

লেখকঃ শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, দুরূদ ও সালাম সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের ওপর। কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত শরী‘আতি প্রমাণাদির দ্বারা একথা সুস্পষ্টরূপে পরিজ্ঞাত রয়েছে যে, যাবতীয় কথা-বার্তা ও কার্যাবলি কেবল তখনই আল্লাহ তা‘আলার নিকট স্বীকৃত ও গৃহীত হয়, যখন তা ‘বিশুদ্ধ আকীদা’ অর্থাৎ সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়ে থাকে। আর যদি আকীদা বিশুদ্ধ না হয় তাহলে তার ভিত্তিতে সম্পাদিত যাবতীয় কথা ও কাজ আল্লাহর নিকট বাতিল বলে গণ্য হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلۡإِيمَٰنِ فَقَدۡ حَبِطَ عَمَلُهُۥ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾ [ المائدة :5]

“যে কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে তার সমস্ত কাজ অবশ্যই বিফলে যাবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾ [ الزمر :65]

“অবশ্যই তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্বে অতীত সমস্ত নবী রাসূলগণের প্রতি এ বার্তা পাঠানো হয়েছে যে, তুমি যদি আল্লাহর সাথে শির্ক কর, তাহলে তোমার সমস্ত কাজ অবশ্যই বৃথা হয়ে যাবে, আর তুমি নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]

এই অর্থের সপক্ষে কুরআনে কারীমে বর্ণিত আয়াতের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ তা‘আলার অবতীর্ণ সুস্পষ্ট কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে প্রমাণিত আছে যে, বিশুদ্ধ আকীদার সারকথা হলো: আল্লাহর ওপর, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের ওপর, আখেরাতের দিন এবং ভাগ্যের মঙ্গল-অমঙ্গলের ওপর বিশ্বাস স্থপন করা। এ ছয়টি বিষয়ই হলো সেই সঠিক ধর্মবিশ্বাসের মৌলিক বিষয়বস্তু বা নীতিমালা, যা নিয়ে নাযিল হলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এবং প্রেরিত হলেন আল্লাহর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই মৌলিক নীতিমালারই শাখা-প্রশাখা হলো গায়েবী বিষয়াদি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কৃর্তক প্রদত্ত যাবতীয় খবরাখবর, যেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য। উক্ত ছয় নীতিমালার সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ’তে অসংখ্য প্রমাণাদি রয়েছে। তন্মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীগুলো সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ليۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ﴾ [ البقرة :177]

“তোমরা পূর্বদিকে মুখ করলে কি পশ্চিম দিকে, তা প্রকৃত কোনো পূণ্যের ব্যাপার নয়; বরং প্রকৃত পূণ্যের কাজ হলো যে, আল্লাহ তা‘আলা, শেষ দিন ও ফিরিশতাকুল, অবতীর্ণ কিতাবসমূহ এবং প্রেরিত নবীগণের ওপর নিষ্ঠার সাথে ঈমান আনয়ন করা”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৭৭]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ﴾ [ البقرة :285]

“রাসূল সেই হিদায়াতে (পথ নির্দেশেই) ঈমান এনেছেন যা স্বীয় রবের নিকট থেকে তাঁর প্রতি নাযিল হয়েছে, আর মুমিনগণও (সেটার ওপর ঈমান এনেছে)। তারা সকলেই আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ এবং রাসূলগণের ওপর ঈমান আনয়ন করেছে। তারা বলে: আমরা আল্লাহর রাসূলগণের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করি না”। [সূরা আল-আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا﴾ [ النساء :136]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর এবং সে কিতাবের ওপর ঈমান আনয়ন কর, যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর নাযিল করেছেন। আর সেসব কিতাবের ওপরও ঈমান আনয়ন কর, যা তিনি এর পূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণ এবং শেষ দিবসের সাথে কুফরী (অস্বীকার) করবে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ﴾ [ الحج :70]

“তোমার কি জানা নেই যে, আসমান-জমীনের সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত, সবকিছুই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এতো আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ”। [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭০]

উপরোক্ত নীতিমালার প্রমাণে সহীহ হাদীসের সংখ্যাও অনেক। তন্মধ্যে সেই সুপ্রসিদ্ধ হাদীসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহ হাদীস গ্র্রন্থে আমীরুল মুমিনীন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদীসে এসেছে যে, জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তিনি উত্তরে বলেন, “ঈমান হচ্ছে তুমি আল্লাহ তা‘আলার ওপর, তাঁর ফিরিশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনয়ন করবে, আর তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপরও ঈমান রাখবে”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

এ ছয়টি মূলনীতি থেকেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও পুনরুত্থান সংক্রান্ত যাবতীয় গায়েবী বিষয়ে মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাসের সবকিছু নির্ধারিত হয়েছে।