hadith book logo

হিল্লা বিয়ে

লেখকঃ সানাউল্লাহ নজির আহমদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

আয়াত দু’টির তাফসির: তাফসির ইব্‌ন কাসির :

তাফসিরে ইব্‌ন কাসিরে এর ব্যাখ্যায় বলা হয় : ইসলামের পূর্ব যুগে প্রথা ছিল, স্বামী যত ইচ্ছা স্ত্রীকে তালাক দিত আর ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিত, ফলে স্ত্রীগণ সংকটপূর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছিল। স্বামী তাদেরকে তালাক দিত এবং ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার নিকটবর্তী হতেই ফিরিয়ে নিত, পুনরায় তালাক দিত। কাজেই স্ত্রীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, ফলে ইসলাম তালাকের সীমা নির্ধারণ করে দেয় যে, এভাবে মাত্র দু’টি তালাক দিতে পারবে, তৃতীয় তালাকের পর ফিরিয়ে নেয়ার আর কোন অধিকার থাকবে না স্বামীর। ‘সুনানে আবু দাউদে’ এ অধ্যায়ে রয়েছে যে, তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান রহিত হয়ে গেছে।

‘মুসনাদে ইব্‌ন আবি হাতিম’ গ্রন্থে রয়েছে : এক ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে বলে : আমি তোমাকে রাখবও না আবার ছেড়েও দেব না। স্ত্রী বলে : কিভাবে ? সে বলে : তোমাকে তালাক দেব এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় হলেই ফিরিয়ে নেব, আবার তালাক দেব এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই ফিরিয়ে নেব, এরূপ করতেই থাকব। লোকটির স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দারবারে গিয়ে এ দুঃখের কথা বর্ণনা করে, তখন এ আয়াত নাযিল হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ঐ লোকেরা তালাকের প্রতি লক্ষ্য রাখতে আরম্ভ করে এবং শুধরে যায়। তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার স্বামীর কোন অধিকার থাকল না এবং তাদেরকে বলা হল দুই তালাক পর্যন্ত তোমাদের অধিকার রয়েছে, এর মধ্যে সংশোধনের উদ্দেশ্যে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে ফিরিযে নিতে পারবে, যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে থাকে। তোমাদের এও অধিকার রয়েছে যে, তোমরা তাদের ইদ্দত অতিক্রান্ত হতে দেবে, তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে না, যেন তারা নতুনভাবে বিয়ের যোগ্য হয়। আর যদি তৃতীয় তালাক দেবার ইচ্ছে কর তবে সৎভাবে তালাক দেবে, তাদেরকে কোন হক নষ্ট করবে না, তাদের উপর অত্যাচার করবে না এবং তাদের কোন ক্ষতি করবে না।

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করে, হে আল্লাহর রাসূল, এ আয়াতে দুই তালাকের কথা তো বিদ্যমান, কিন্তু তৃতীয় তালাক কোথায় ? তখন তিনি বলেন : أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ অর্থাৎ ‘সৎভাবে পরিত্যাগ করা’। এটাই তিন তালাক। আর যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য বেড়ে যায় এবং স্ত্রী স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে ও তার হক আদায় না করে, এরূপ অবস্থায় যদি সে তার স্বামীকে কিছু (ফিদিয়া) প্রদান করত তালাক গ্রহণ করে, তবে তার দেয়া এবং স্বামীর ফিদিয়া নেয়ায় কোন পাপ নেই। এটাও মনে রাখার বিষয় যে, যদি স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বীমার নিকট ‘খোলা’ তালাক প্রার্থনা করে তবে সে অত্যন্ত পাপী হবে। ‘জামেউত তিরমিজি’ ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে রয়েছে, যে স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট তালাক প্রার্থনা করে তার উপর বেহেশতের সুগন্ধিও হারাম। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, অথচ বেহেশতের সুগন্ধি চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতেও এসে থাকে। পূর্বাপর আলেমদের একটি বড় জামাত বলেছেন : ‘খোলা শুধু ঐ অবস্থায় বৈধ যখন অবাধ্যতা ও নাফরমানি স্ত্রীর পক্ষ থেকে হয়, সে সময় স্বামী মুক্তিপণ নিয়ে ঐ স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে পারে, যেমন কুরআনের এ আয়াতে রয়েছে, এ ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় ‘খোলা’ বৈধ নয়। এমনকি ইমাম মালেক রহ. বলেছেন : ‘যদি স্ত্রীকে কষ্ট দিয়ে এবং তার কিছু হক নষ্ট করে স্ত্রীকে বাধ্য করত স্বামী তার থেকে কিছু গ্রহণ করে, তবে তা ফিরিয়ে দেয়া ওয়াজিব’। ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন : মত বিরোধের সময় যখন কিছু গ্রহণ করে তালাক দেয়া বৈধ, তখন ঐক্যমতের সময় কিছু গ্রহণ করে তালাক দেয়াতে দোষের কোন কারণ নেই।

ইমাম আবু হানিফা রহ. ও তার সাথীদের উক্তি এই যে, যদি অন্যায় ও ত্রুটি স্ত্রীর পক্ষ হতে হয় তবে স্বামী তাকে যা দিয়েছে তা (ফিদিয়া হিসেবে) ফিরিয়ে নেয়া তার জন্যে বৈধ, কিন্তু তার চেয়ে বেশী নেয়া জায়েজ নয়। আর বাড়াবাড়ি যদি পুরুষের পক্ষ থেকে হয়, তবে তার জন্য কোন কিছু গ্রহণ করা বৈধ নয়। ইমাম আহমদ রহ., উবাইদ, ইসহাক ও রাহওয়েহ রহ. বলেন যে, স্বামীর জন্যে তার প্রদত্ত বস্তু হতে অতিরিক্ত নেয়া কোন ক্রমেই বৈধ নয়। “তাফসির ইব্‌ন কাসির” : সূরা বাকারা আয়াত : (২৯-৩০), সংক্ষিপ্ত অনুবাদ।