hadith book logo

ইসলামে নারী বনাম ইয়াহূদী-খৃষ্টান ধর্মে নারী

লেখকঃ ড. শরীফ আব্দুল আযীম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫

উত্তরাধীকার সম্পদে নারী

নিকটাত্মীয়দের মৃত্যুর পর তাদের সম্পদে নারীদের পাপ্য সম্পর্কে কুরআন ও বাইবেলে মতবিরোধ রয়েছে। ইয়াহূদী পণ্ডিত এপস্টাইন নারীদের উত্তরাধিকার বিষয়ে বলেন, “বাইবেল নাযিল হওয়ার পর থেকেই নিকটাত্মীয়দের সম্পদে মহিলা তথা স্ত্রী ও কন্যার কোনো অধিকার ছিল না। মহিলা নিজেও উত্তরাধিকারী সম্পদের অংশ বলে বিবেচিত হত, তবে তার কোনো অধিকার ছিল না ঐ সম্পদে। অপরদিকে মূছা আলাইহিস সালাম এর শরী‘আতে অন্য কোনো সন্তান না থাকলে কন্যাদেরকে ওয়ারিস গণ্য করা হত। কিন্তু স্ত্রী এ সম্পদ থেকে কিছুই পেত না’’। [Armstrong, op. cit., p. 8.]

কেন মহিলা উত্তরাধিকারী সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে? এর জবাবে এপস্টাইন বলেন, সে উত্তরাধিকার সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা সে বিবাহের পূর্বে পিতার ও বিবাহের পরে স্বামীর মালিকানাধীন সম্পদ (পণ্য) হিসেবে গণ্য হয়”। [Epstein, op. cit., p. 175.]

বাইবেলে উত্তরাধিকারের আইন লিপিবদ্ধ আছে। (নং ২৭/১-১১) স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর কোনো অধিকার দেওয়া হয় নি। অথচ স্ত্রী মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার সম্পদে সর্বাগ্রে অধিকার রয়েছে স্বামীর। এমনকি পুত্রদের আগেই স্বামীর অধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো সন্তান না থাকলে কন্যাগণ ওয়ারিস হবে। মায়েরও কোনো অধিকার দেওয়া হয় নি উত্তরাধিকারী সম্পদে। মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান থাকে তাহলে বিধবা ও তার কন্যাগণ তাদের দয়ার মুখাপেক্ষী থাকবে। এজন্য ইয়াহূদী সমাজে দেখা যায়- কন্যা সন্তান ও বিধবাগণ হয় সমাজের দরিদ্র শ্রেণী। খৃষ্টান সমাজ বহুকাল যাবত উপরের বিধানই পালন করে এসেছে। রাষ্ট্রীয় আইন ও গীর্জার ধর্মীয় আইন নারীদেরকে তাদের পিতার সম্পদে ওয়ারিস হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছিল। স্ত্রীর ও কোনো অধিকার ছিল না স্বামীর সম্পদে । বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত এ ধরণের কঠোর আইন প্রচলিত ছিল। [Ibid., p. 121.]

প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা নারীদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত করত। ইসলাম এ ধরণের সমস্ত অত্যাচারী আইন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নারীদেরকে তাদের নিকটাত্মীয়ের পরিত্যক্ত সম্পদে অংশ নিশ্চিত করেছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لِّلرِّجَالِ نَصِيبٞ مِّمَّا تَرَكَ ٱلۡوَٰلِدَانِ وَٱلۡأَقۡرَبُونَ وَلِلنِّسَآءِ نَصِيبٞ مِّمَّا تَرَكَ ٱلۡوَٰلِدَانِ وَٱلۡأَقۡرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنۡهُ أَوۡ كَثُرَۚ نَصِيبٗا مَّفۡرُوضٗا ٧﴾ [ النساء : ٧ ]

“পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক বা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭]

ইউরোপীয়রা এগুলো শেখার কয়েকশত বছর আগে থেকেই মুসলিম মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা তাদের আত্মীয় স্বজনের সম্পত্তিতে অধিকার ভোগ করে আসছে। [Gage, op. cit., p. 142.]

আল-কুরআনে ওয়ারিসদের অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বিস্তারিত ভাবে। (দেখুন: সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭, ১১, ১২ ও ১৭৬) কয়েকটা অবস্থা ব্যতিত নারীর সে অংশ হচ্ছে পুরুষের অর্ধেক। ব্যতিক্রম অবস্থার মধ্যে একটি হচ্ছে পিতা। সে মাতার সমান অংশ পাবে। আমরা এ কথাটি বললে মনে হবে যেন ইসলাম এটা যুলুম করেছে। অথচ, আমরা যদি তার কারণ খুজতে যাই তাহলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে পুরুষের অর্থনৈতিক দায়িত্ব সম্বন্ধে। (দেখুন: স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব অধ্যায়)

স্বামী তার স্ত্রীকে যে উপহার দিবে তালাক দিলেও সে উপহারের একচ্ছত্র অধিকার থাকবে স্ত্রীর। স্ত্রীর জন্য স্বামীকে উপহার দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইসলামে সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীর খরচ বহন করা স্বামীর জন্য অবশ্য কর্তব্য। স্ত্রীর ওপর এ সমস্ত খরচের কোনো দায়-দায়িত্ব নেয়, তবে নিজে করতে চাইলে আলাদা কথা। তার মালিকানাধীন সমস্ত সম্পদে রয়েছে তার একচ্ছত্র মালিকানা। ইসলাম বিবাহকে পবিত্র বন্ধন হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুবকদেরকে বিবাহের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে এবং তালাকের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে দিয়েছে। বৈরাগ্যকে ইসলামে উৎসাহ প্রদান করা হয় নি। ফলে মুসলিম সমাজে বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে এবং সে সমাজে বৈরাগী খুব কমই দেখা যায়। নারীদের চেয়ে পুরুষের অর্থনৈতিক দায়িত্ব অনেক বেশি। তাই সমস্ত মতবিরোধ থেকে বেরিয়ে এসে উত্তরাধিকারী সম্পদের বিধানে সমতা স্থাপন করা হয়েছে। এক ইংরেজ মুসলিম মহিলা বলেছিলেন: ইসলাম শুধু নারীর প্রতি ইনসাফ করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং তাকে সন্মানের আসনে বসিয়েছে। [B. Aisha Lemu and Fatima Heeren, Woman in Islam (London: Islamic Foundation, 1978) p. 23.]