hadith book logo

সুন্নাহের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫

আল কুরআনের আলোকে:

মহান আল্লাহ তা’আলার বাণী ইসলামের প্রথম মূলনীতি আল কুরআনের অসংখ্য আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একনিষ্ঠ আনুগত্য ছাড়া ঈমান ও ইসলাম মানা সম্ভব নয়, এ প্রসঙ্গে নিম্নে কয়েকটি দিক তুলে ধরা হল:

[ক] সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য ছাড়া ঈমানদার হওয়া সম্ভব নয়:

আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ ١ ﴾ [ الانفال : ١ ] “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর”। [সূরা আনফাল, আয়াত: ১]

এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের আনুগত্য করার কথাই বলা হয়েছে। সুতরাং, কোন ঈমানদারের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতকে এড়িয়ে চলার কোন সুযোগ নেই।

[খ] সুন্নাতে রাসূল বর্জন করা কুফরী কাজ:

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡكَٰفِرِينَ ٣٢﴾ [ ال عمران : ٣٢ ]

“বলুন আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, আর যদি তারা পলায়ন করে, তাহলে আল্লাহ কাফিরদেরকে ভালবাসেন না”। [আল ইমরান: ৩৩]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য হতে পলায়ন করা অর্থাৎ তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ বর্জন করা, ইহা প্রকাশ্য কুফরী।

[গ] করণীয় ও বর্জনীয় ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই একমাত্র মাপকাঠি:

আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٧ ﴾ [ الحشر : ٧ ] “রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক, আর আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তি দাতা”। [সূরা আল হাশর: ৭]

এ আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেয়া অর্থ হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের যে সব বিধি-বিধান দিয়েছেন, অর্থাৎ কুরআন এবং হাদিস, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إنِّىْ أُوْتِيْتُ الكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَه ” “আমাকে কিতাব [কুরআন] এবং উহার অনুরূপ [সুন্নাহ্] দেয়া হয়েছে।” আর এটাই তিনি তাঁর উম্মতকে দিয়েছেন। [আহমদ, হাদিস: ১৭১৭৪, আবুদ দাউদ হাদিস: ৪৬০৪]

[ঘ] কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমেই কেবল মাত্র দ্বন্দ্বের সমাধান হতে হবে:

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا ٥٩ ﴾ [ النساء : ٥٩ ]

“যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণ কর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম”। [সূরা নিসা, আয়াত: ৫৯]

ইমাম তাবারী [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন: আয়াতের অর্থ হল যখন তোমাদের মাঝে কোন ধর্মীয় বিষয়ে বিবাদ পরিলক্ষিত হবে, তখন তার সমাধান ও ফয়সালা হল একমাত্র আল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব কুরআন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থাৎ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর সুন্নাতের মাধ্যমে।

এ আয়াতের শিক্ষা হল আমরা যদি সত্যিকার আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমানদার হই তাহলে আমাদের মাঝে ধর্মীয় বিবাদের সমাধান কোন ইমাম, পীর, দরবেশ, মত ও পথের মাধ্যমে না হয়ে হতে হবে একমাত্র আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ সুন্নাহর মাধ্যমে।

[ঙ] আল্লাহকে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হল সুন্নাহর অনুসরণ:

আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١﴾ [ ال عمران : ٣١ ] “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দিবেন, আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু”। [সূরা আলু ঈমরান: ৩১]

এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত যা বিদ্বানদের নিকট آية الإمتحان বা পরীক্ষার আয়াত বলে পরিচিত। ইমাম আব্দুর রহমান মুবারকপরী [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, এ আয়াত হতে সাব্যস্ত হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস অনুসরণ করে না এবং সে অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব মনে করে না, সে আল্লাহকে ভালবাসার মিথ্যুক দাবীদার। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালবাসায় মিথ্যুক প্রমাণিত হয়, সে মূলত: আল্লাহর প্রতি ঈমানের মিথ্যুক দাবীদার। অতএব সত্যিকার ঈমানদার ও আল্লাহর প্রিয় হতে হলে সকল গাউছ-কুতুব, পীর-দরবেশ ও ওলী-আওলীয়াকে বাদ দিয়ে একমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসারী হতে হবে।

[চ] সুন্নাহর বিরোধিতা হলে ফিতনা ও যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সম্মুখীন হতে হবে:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٦٣ ﴾ [ النور : ٦٣ ]

“সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক হয় যে, তাদেরকে ফিতনা পেয়ে যাবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে”। [সূরা নূর: ৬৩] অতএব ইহকাল ও পরকালে ফিতনা ও শাস্তি হতে রক্ষা পেতে হলে সুন্নাহ অনুসরণের বিকল্প কোন পথ নেই।

[ছ] মুসলিম উম্মার উত্তম আদর্শের প্রতীক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম:

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا ٢١﴾ [ الاحزاب : ٢١ ]

“তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মাঝেই রয়েছে উত্তম আদর্শ, এটা তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে”। [সূরা আহযাব: ২১]

ইমাম ইবনে কাছীর [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণের বিষয়ে এ আয়াতটি একটি অকাট্য ও বড় ধরণের প্রমাণ ----।”

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ইসলামী নীতিমালার এক অবিচ্ছেদ অংশ, যা ছাড়া ইসলাম কখনও পূর্ণতা লাভ করতে পারে না, সুন্নাহ ইসলামের এক অকাট্য দলীল এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে অসংখ্য আয়াত রয়েছে, নমুনা স্বরূপ সামান্য কিছু উপস্থাপন করা হল, এখন আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসের আলোকে বিষয়টি জানার চেষ্টা করি।