১
সুন্নাহের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২
ভূমিকা
إِنَّ الْحَمْدُ للهِ ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ ، وَنَعُـوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا ، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا ، مَنْ يَّهْدِهِ اللهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ ، وَمَنْ يُّضْلِلِ اللهُ فَلاَ هَادِيَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আমরা তারই প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য চাই, তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর নিকট আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্টতা ও আমাদের কর্মসমূহের খারাবী থেকে আশ্রয় কামনা করি। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নাই। আর যাকে গোমরাহ করেন তাকে হেদায়েত দেয়ার কেউ নাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্যিকার ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোন শরিক নাই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার উপর, তার পরিবার-পরিজন ও তার সাহাবীদের উপর এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত সঠিকভাবে তাদের অনুসরণ করেন তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় বান্দাদের প্রতি অধিক দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি তার বান্দাদের যে কোন উপায়ে ক্ষমা করতে ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন।
এক- সূন্নাহের অনুসরণ করার কোন বিকল্প নাই। কিন্তু সূন্নাহের অনুসরণ করতে হলে, সূন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান থাকাও জরুরী। কোনটি সূন্নাহ আর কোনটি বিদআত তা জানা না থাকলে, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করা যেমন কঠিন হবে তেমনি বিদআতকে সূন্নাহ আর সুন্নাহকে বিদআত বলে চালিয়ে দেয়া হবে। তখন সূন্নাহ যেমন কলুষিত হবে, অনুরূপভাবে ইসলামী শরীয়তে বিদআতের অনুপ্রবেশের ফলে শরীয়তের মূল ভীত দুর্বল হয়ে পড়বে, দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটবে। আসল দ্বীন আর অবশিষ্ট থাকবে না। যেমনি ভাবে পূর্বেকার নবীদের দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছিল। এ বাস্তবতা আমরা যুগ যুগ ধরেই প্রত্যক্ষ করছি। কারণ, আমরা দেখি কিছু আমল এমন আছে যেগুলোকে মানুষ ইবাদাত হিসেবে করে আসছে এবং সূন্নাহ বলে জ্ঞান করছে, অথচ তা কখনোই সূন্নাহের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর মুল কারণ হল, সূন্নাহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান না থাকা এবং সূন্নাহ ও বিদআতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে অক্ষম হওয়া।
দুই- সূন্নাহ ও বিদআত কি তা জানা না থাকার পরিণতি যে কত ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি কোন অশিক্ষিত বা সাধারণ শিক্ষিত মানুষ এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকে তা যদিও আশ্চর্যের বিষয় নয়। কিন্তু যখন দেখতে পাই সুপরিচিত মুফতি, মুহাদ্দিস, শাইখুল হাদিসরাই ইসলামের এ মৌলিক বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞ তখন আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। যারা ইসলামের ধারক হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত যাদের অনুসরণ করে মানুষ দ্বীন শিখবে তাদের মধ্যে দ্বীনের জ্ঞান না থাকা, ইসলামের সঠিক আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে তাদের মধ্যে ভ্রান্তি থাকা শুধু দু:খ জনকই নয়, বরং এটি দ্বীন ও ইসলামের জন্য মারাত্মক হুমকি। আমাদের এ উপমহাদেশে এ সমস্যাটি খুবই প্রকট। এখানে যারা ইসলাম সম্পর্কে পড়া লেখা করে তারা নির্ধারিত সিলেবাসের বাইরে পড়া লেখা করার সুযোগ খুব একটা পায়না এবং তাদের শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষা পদ্ধতিও সনাতন। তাদের সিলেবাসে যে সব কিতাবাদি পড়ানো হয়ে থাকে, তা যদি কেউ ভালোভাবে পড়ে তাহলে সে তা থেকে কোন প্রকার আরবি গ্রামার, মানতিক, বালাগাত ইত্যাদি শেখার সুযোগ পাবে বটে; কিন্তু মূল দ্বীনি শিক্ষা কুরআন ও হাদিসের ইলম এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণী-হাদিস সম্পর্কে শিক্ষা লাভের সুযোগ এ শিক্ষা ব্যবস্থায় যথেষ্ট সীমিত। ফলে দেখা যায়, ‘দাওরায়ে’ হাদিস বা ‘কামিল’ পড়ার পর একজন ছাত্রকে আলেম বা মাওলানা বলা হয়ে থাকে এবং সেও মনে করে আমি একজন আলেম বা মাওলানা। অথচ দেখা যায় সে যে শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়া লেখা করেছে, তার মধ্যে অনেক ছাত্রই এমন আছে, যারা তাদের ক্লাসের নির্ধারিত কিতাবগুলোই ভালোভাবে বোঝেনি। এ ধরনের ওলামা ও মাওলানারা দীর্ঘ সময় বিভিন্ন শিক্ষকদের সংশ্রবে থেকে তাদের মুখ থেকে যে সব কথা শুনেছে, তাদের থেকে যে সব ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ গ্রহণ করেছে, সেটাই তাদের ইলম এবং সেটিই তাদের আদর্শ ও দ্বীন। এর বাইরে তারা কোন কিছু শোনতে বা শিখতে রাজি না। চাই সেটা কুরআন হাদিস হোক বা না হোক। তারা মনে করে, এর বাইরে কিছু শিখতে গেলে, জানতে গেলে আমরা গোমরাহ হয়ে যাব এবং তাদের ওস্তাদরাও তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত এ ধারণাই দিয়ে আসছে- খবরদার! তোমরা আমাদের কথার বাইরে যাবে না। ফলে এদের পরিণতি হয় এমন; এদের কাছে যদি আপনি কোন সঠিক কথাও তুলে ধরেন বা হাদিসের কোন সু-স্পষ্ট বাণীও তুলে ধরেন, তারা কখনোই তা গ্রহণ করবে না। তারা মনে করে, এ কথা আমার ওস্তাদ-তো বলেননি বা আমার ওস্তাদ কি কম জানতেন?। ফলে দেখা যাবে, নিজেকে একজন আলেম দাবি করা সত্ত্বেও সে কথাটি কুরআন ও হাদিসের কষ্টি পাথরে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। আর এ ধরনের আলেমরাই যখন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করেন, তাদের থেকে সমাজ কি পায় বা তারা সমাজকে কি দিতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ধরনের তথাকথিত আলেমদের অধিকাংশই কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা রাখে না এবং কুরআন হাদিস থেকে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার যোগ্যতা তাদের না থাকার কারণে তারা ইসলামের আলো থেকে অন্ধকারেই অবস্থান করে। যারা তাদের অন্ধ ভক্ত ও অনুসারী তারাও ইসলামের মূল জ্ঞান ও ধ্যান-ধারণা থেকে অনেক দূরেই থেকে যায়। বর্তমান সমাজে সূন্নাহ পরিপন্থী কার্যকলাপ-বিদআত ও কু-সংস্কারসমূহ চেপে বসার এটি একটি অন্যতম কারণ।
তিন- ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত সবাই যে কুরআন ও হাদিস বুঝতে সক্ষম নয় সে দাবি আমি করছি না। বরং তাদের মধ্যে কতক এমনও আছেন যারা নির্ধারিত সিলেবাস পড়ার পর ইসলামী জ্ঞান-কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেন এবং কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে গবেষণা করে থাকেন। তবে এদের সংখ্যাও খুব নগণ্য। কিন্তু তাদের সমস্যা হল, তাদের চিন্তা চেতনা ও গবেষণা সব কিছুই হয়ে থাকে অন্ধ অনুকরণ, সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির উপর ভিত্তি করে। তাদের কাছেও তাদের মুরব্বী ও মাজহাবী মতাদর্শের ব্যতিক্রম কোন কিছুই গ্রহণ যোগ্য নয়। তারা তাদের লালিত আদর্শ ও ওস্তাদদের থেকে গৃহীত ধ্যান-ধারণার বাহিরে কোন কিছু মানতে রাজি না। তাদের মাজহাবিয়্যতের সামনে বিশুদ্ধ হাদিস ও সূন্নাহ একেবারে গুরুত্বহীন। তারা মনে করে মাজহাবিয়্যাত ধ্বংস মানে হচ্ছে, ইসলাম ধ্বংস। ফলে এ শ্রেণির লোকের মধ্যেও ইসলামের মূল দলীল - কুরআন ও সূন্নাহ-আড়ালেই থেকে গেল। কুরআন সূন্নাহ হতে ইসলামকে গ্রহণ করার স্বাদ হতে এরাও দূরেই সরে রইল। আবার অনেক এমন আছেন তারা নির্ধারিত সিলেবাস পড়ানোর পর শিক্ষকতায় নিয়োজিত হয়ে একই কিতাব পড়াতে থাকেন এবং তার চিন্তা চেতনা এরই মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি যদি সিলেবাসের কিতাবগুলো ভালোভাবে পড়াতে পারেন, তাহলেই তিনি বিজ্ঞ আলেম হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। কুরআন হাদিস সম্পর্কে তার প্রকৃত জ্ঞান না থাকা তার জন্য বিজ্ঞ আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিস হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই প্রতিবন্ধক নয়। অথচ কুরআন হাদিসের সঠিক জ্ঞান ছাড়া সত্যিকার আলেম, মুফতি ও মুহাদ্দিস হওয়া সম্ভব নয়।
চার- সূন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা এটি শুধু কোন কিছু না জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এর অর্থ হল, ইসলাম সম্পর্কেই না জানা বা অজ্ঞ থাকা। কারণ, সূন্নাহ ছাড়া ইসলামের কথা চিন্তাই করা যায় না। কুরআন যেমন ইসলামী শরীয়তের মূল ভিত্তি অনুরূপভাবে সূন্নাহও ইসলামী শরীয়তের মুল ভিত্তি। সূন্নাহকে বাদ দিয়ে শুধু কুরআন থেকে অথবা কুরআনকে বাদ দিয়ে শুধু সূন্নাহ থেকে ইসলাম জানা আকাশ কুসুম সমতুল্য। কুরআন ও সূন্নাহ থেকেই ইসলাম জানতে হবে এবং এ দুটিকে ইসলামের মানদণ্ড বলে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, কুরআন যেমনি ভাবে অকাট্য দলীল হিসেবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে, হাদিস কিন্তু আমাদের কাছে অকাট্য দলীল হিসেবে পৌঁছেনি। কুরআনে যেমন কোন প্রকার অবকাশ নাই হাদিস কিন্তু সে পর্যায়ের না। অনুরূপভাবে কুরআনের ক্ষেত্রে সহীহ, হাসান, দুর্বল ও বানোয়াট বলার কোন অবকাশ নাই কিন্তু হাদিস তা নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এ বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছেন, তিনি বলেন, শেষ যুগে কতক মিথ্যুক দজ্জালের আগমন ঘটবে, তারা তোমাদের কাছে এমন সব হাদিস পেশ করবে, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্ব পুরুষরাও কখনও শোনেনি, অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যাও, তারা যেন তোমাদেরকে ভ্রষ্টতা ও ফিতনা-ফ্যাসাদে নিপতিত করতে না পারে। হাদিসের ক্ষেত্রে সহীহ, হাসান, দুর্বল ও বানোয়াট যেহেতু আছে, তাই ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য হাদিসের এ বিষয়গুলো জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি এ বিষয়গুলো জানা না থাকে তাহলে ইসলাম সম্পর্কে নিরেট জ্ঞান লাভ আদৌ সম্ভব নয়। জ্ঞানহীন আমল বা অন্ধানুকরণ ইসলামী আদর্শের বিপরীত মেরু ও প্রতিপক্ষ। আমল করার জন্য কোন হাদিসটি সহীহ আর কোন হাদিসটি দুর্বল আর কোনটি মাওজু বা বানোয়াট তা জানা থাকা খুবই জরুরি। এ সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেই একজন মানুষ তার আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারবে এবং ইসলামী শরিয়তের বিধান মেনে চলতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে মানুষের মধ্যে সূন্নাহ সম্পর্কে বিষয়টি না জানা থাকাতে আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। কোন আমলটি কোন পর্যায়ের তা তারা অনুধাবন করতে পারে না। বিষয়টি যদি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হত, তাহলে তা খুব একটি দুশ্চিন্তার কারণ ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হল, তথা কথিত আলেম, ওলামা, পীর মাশায়েখরাও যখন এ সম্পর্কে জ্ঞানহীন হয়, তাহলে মুসলিম জাতির গতিবিধি কি হতে পারে তা চিন্তাই করা যায় না। অজ্ঞতার ফলে বর্তমানে সমাজে আমরা দেখতে পাই সহীহ আমলের বিপরীতে অসংখ্য ভিত্তিহীন আমল স্থান পেয়েছে। সঠিক ও নির্ভুল কথার বিপরীতে কাল্পনিক, শোনা কথা, বানানো কথাগুলো স্থান পেয়েছে। নকল ভেজালটাই বাজারজাত হয়ে আছে। তার বিপরীতে খাঁটি কথা, খাঁটি আমল মূল্যহীন। তার কোন স্থানই নাই। অবস্থা এতই অবনতির দিকে গিয়েছে, আপনি যদি বলেন, তুমি এ কথাটা কোথা থেকে বললে, অথবা তুমি যে এ আমল করছ তার প্রমাণ কি? তাহলে আপনাকে বলবে, তুমি প্রমাণের কি বুঝ? আমাদের বাপ-দাদা, পীর-মাশায়েখ, মুহাদ্দিস ও মুফতিরা কি কম বোঝেন? তারাওতো আলেম বা তারাও দাওরা/কামিল পাশ। এখানেই শেষ নয়, বরং আপনাকে উল্টো গোমরাহ বলে চুপে করিয়ে দেবে। আপনাকে বিভিন্ন ধরনের ভৎসনা করবে। আপনার বিরুদ্ধে তারা ফতোয়া গ্রহণ করবে। কিন্তু দু:খের বিষয় হল, যারা ফতোয়া দেবেন, তারা তথাকথিত জ্ঞানী নামধারীরাই, যাদের কাছে মূলত: কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান বলতে কিছুই নাই।
মুসলিম উম্মাহর এ দূরাবস্থার কারণে তাদের সূন্নাহ সম্পর্কে সচেতন করা এবং সূন্নাহের গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের অবগত করা খুবই জরুরি। এ বইটিতে সূন্নাহের গুরুত্ব এবং সূন্নাহ বিষয়ে কুরআন হাদিস ও উম্মতের ইজমা কি তা আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা এই যে আল্লাহ যেন আমাদের কুরআন সূন্নাহর উপর চলা ও তদুনুযায়ী জীবন যাপন করার তাওফীক দেন। আমীন।
সংকলক
জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।
নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আমরা তারই প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য চাই, তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর নিকট আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্টতা ও আমাদের কর্মসমূহের খারাবী থেকে আশ্রয় কামনা করি। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নাই। আর যাকে গোমরাহ করেন তাকে হেদায়েত দেয়ার কেউ নাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্যিকার ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোন শরিক নাই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার উপর, তার পরিবার-পরিজন ও তার সাহাবীদের উপর এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত সঠিকভাবে তাদের অনুসরণ করেন তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় বান্দাদের প্রতি অধিক দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি তার বান্দাদের যে কোন উপায়ে ক্ষমা করতে ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন।
এক- সূন্নাহের অনুসরণ করার কোন বিকল্প নাই। কিন্তু সূন্নাহের অনুসরণ করতে হলে, সূন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান থাকাও জরুরী। কোনটি সূন্নাহ আর কোনটি বিদআত তা জানা না থাকলে, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করা যেমন কঠিন হবে তেমনি বিদআতকে সূন্নাহ আর সুন্নাহকে বিদআত বলে চালিয়ে দেয়া হবে। তখন সূন্নাহ যেমন কলুষিত হবে, অনুরূপভাবে ইসলামী শরীয়তে বিদআতের অনুপ্রবেশের ফলে শরীয়তের মূল ভীত দুর্বল হয়ে পড়বে, দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটবে। আসল দ্বীন আর অবশিষ্ট থাকবে না। যেমনি ভাবে পূর্বেকার নবীদের দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছিল। এ বাস্তবতা আমরা যুগ যুগ ধরেই প্রত্যক্ষ করছি। কারণ, আমরা দেখি কিছু আমল এমন আছে যেগুলোকে মানুষ ইবাদাত হিসেবে করে আসছে এবং সূন্নাহ বলে জ্ঞান করছে, অথচ তা কখনোই সূন্নাহের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর মুল কারণ হল, সূন্নাহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান না থাকা এবং সূন্নাহ ও বিদআতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে অক্ষম হওয়া।
দুই- সূন্নাহ ও বিদআত কি তা জানা না থাকার পরিণতি যে কত ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি কোন অশিক্ষিত বা সাধারণ শিক্ষিত মানুষ এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকে তা যদিও আশ্চর্যের বিষয় নয়। কিন্তু যখন দেখতে পাই সুপরিচিত মুফতি, মুহাদ্দিস, শাইখুল হাদিসরাই ইসলামের এ মৌলিক বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞ তখন আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। যারা ইসলামের ধারক হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত যাদের অনুসরণ করে মানুষ দ্বীন শিখবে তাদের মধ্যে দ্বীনের জ্ঞান না থাকা, ইসলামের সঠিক আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে তাদের মধ্যে ভ্রান্তি থাকা শুধু দু:খ জনকই নয়, বরং এটি দ্বীন ও ইসলামের জন্য মারাত্মক হুমকি। আমাদের এ উপমহাদেশে এ সমস্যাটি খুবই প্রকট। এখানে যারা ইসলাম সম্পর্কে পড়া লেখা করে তারা নির্ধারিত সিলেবাসের বাইরে পড়া লেখা করার সুযোগ খুব একটা পায়না এবং তাদের শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষা পদ্ধতিও সনাতন। তাদের সিলেবাসে যে সব কিতাবাদি পড়ানো হয়ে থাকে, তা যদি কেউ ভালোভাবে পড়ে তাহলে সে তা থেকে কোন প্রকার আরবি গ্রামার, মানতিক, বালাগাত ইত্যাদি শেখার সুযোগ পাবে বটে; কিন্তু মূল দ্বীনি শিক্ষা কুরআন ও হাদিসের ইলম এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণী-হাদিস সম্পর্কে শিক্ষা লাভের সুযোগ এ শিক্ষা ব্যবস্থায় যথেষ্ট সীমিত। ফলে দেখা যায়, ‘দাওরায়ে’ হাদিস বা ‘কামিল’ পড়ার পর একজন ছাত্রকে আলেম বা মাওলানা বলা হয়ে থাকে এবং সেও মনে করে আমি একজন আলেম বা মাওলানা। অথচ দেখা যায় সে যে শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়া লেখা করেছে, তার মধ্যে অনেক ছাত্রই এমন আছে, যারা তাদের ক্লাসের নির্ধারিত কিতাবগুলোই ভালোভাবে বোঝেনি। এ ধরনের ওলামা ও মাওলানারা দীর্ঘ সময় বিভিন্ন শিক্ষকদের সংশ্রবে থেকে তাদের মুখ থেকে যে সব কথা শুনেছে, তাদের থেকে যে সব ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ গ্রহণ করেছে, সেটাই তাদের ইলম এবং সেটিই তাদের আদর্শ ও দ্বীন। এর বাইরে তারা কোন কিছু শোনতে বা শিখতে রাজি না। চাই সেটা কুরআন হাদিস হোক বা না হোক। তারা মনে করে, এর বাইরে কিছু শিখতে গেলে, জানতে গেলে আমরা গোমরাহ হয়ে যাব এবং তাদের ওস্তাদরাও তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত এ ধারণাই দিয়ে আসছে- খবরদার! তোমরা আমাদের কথার বাইরে যাবে না। ফলে এদের পরিণতি হয় এমন; এদের কাছে যদি আপনি কোন সঠিক কথাও তুলে ধরেন বা হাদিসের কোন সু-স্পষ্ট বাণীও তুলে ধরেন, তারা কখনোই তা গ্রহণ করবে না। তারা মনে করে, এ কথা আমার ওস্তাদ-তো বলেননি বা আমার ওস্তাদ কি কম জানতেন?। ফলে দেখা যাবে, নিজেকে একজন আলেম দাবি করা সত্ত্বেও সে কথাটি কুরআন ও হাদিসের কষ্টি পাথরে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। আর এ ধরনের আলেমরাই যখন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করেন, তাদের থেকে সমাজ কি পায় বা তারা সমাজকে কি দিতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ধরনের তথাকথিত আলেমদের অধিকাংশই কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা রাখে না এবং কুরআন হাদিস থেকে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার যোগ্যতা তাদের না থাকার কারণে তারা ইসলামের আলো থেকে অন্ধকারেই অবস্থান করে। যারা তাদের অন্ধ ভক্ত ও অনুসারী তারাও ইসলামের মূল জ্ঞান ও ধ্যান-ধারণা থেকে অনেক দূরেই থেকে যায়। বর্তমান সমাজে সূন্নাহ পরিপন্থী কার্যকলাপ-বিদআত ও কু-সংস্কারসমূহ চেপে বসার এটি একটি অন্যতম কারণ।
তিন- ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত সবাই যে কুরআন ও হাদিস বুঝতে সক্ষম নয় সে দাবি আমি করছি না। বরং তাদের মধ্যে কতক এমনও আছেন যারা নির্ধারিত সিলেবাস পড়ার পর ইসলামী জ্ঞান-কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেন এবং কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে গবেষণা করে থাকেন। তবে এদের সংখ্যাও খুব নগণ্য। কিন্তু তাদের সমস্যা হল, তাদের চিন্তা চেতনা ও গবেষণা সব কিছুই হয়ে থাকে অন্ধ অনুকরণ, সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির উপর ভিত্তি করে। তাদের কাছেও তাদের মুরব্বী ও মাজহাবী মতাদর্শের ব্যতিক্রম কোন কিছুই গ্রহণ যোগ্য নয়। তারা তাদের লালিত আদর্শ ও ওস্তাদদের থেকে গৃহীত ধ্যান-ধারণার বাহিরে কোন কিছু মানতে রাজি না। তাদের মাজহাবিয়্যতের সামনে বিশুদ্ধ হাদিস ও সূন্নাহ একেবারে গুরুত্বহীন। তারা মনে করে মাজহাবিয়্যাত ধ্বংস মানে হচ্ছে, ইসলাম ধ্বংস। ফলে এ শ্রেণির লোকের মধ্যেও ইসলামের মূল দলীল - কুরআন ও সূন্নাহ-আড়ালেই থেকে গেল। কুরআন সূন্নাহ হতে ইসলামকে গ্রহণ করার স্বাদ হতে এরাও দূরেই সরে রইল। আবার অনেক এমন আছেন তারা নির্ধারিত সিলেবাস পড়ানোর পর শিক্ষকতায় নিয়োজিত হয়ে একই কিতাব পড়াতে থাকেন এবং তার চিন্তা চেতনা এরই মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি যদি সিলেবাসের কিতাবগুলো ভালোভাবে পড়াতে পারেন, তাহলেই তিনি বিজ্ঞ আলেম হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। কুরআন হাদিস সম্পর্কে তার প্রকৃত জ্ঞান না থাকা তার জন্য বিজ্ঞ আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিস হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই প্রতিবন্ধক নয়। অথচ কুরআন হাদিসের সঠিক জ্ঞান ছাড়া সত্যিকার আলেম, মুফতি ও মুহাদ্দিস হওয়া সম্ভব নয়।
চার- সূন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা এটি শুধু কোন কিছু না জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এর অর্থ হল, ইসলাম সম্পর্কেই না জানা বা অজ্ঞ থাকা। কারণ, সূন্নাহ ছাড়া ইসলামের কথা চিন্তাই করা যায় না। কুরআন যেমন ইসলামী শরীয়তের মূল ভিত্তি অনুরূপভাবে সূন্নাহও ইসলামী শরীয়তের মুল ভিত্তি। সূন্নাহকে বাদ দিয়ে শুধু কুরআন থেকে অথবা কুরআনকে বাদ দিয়ে শুধু সূন্নাহ থেকে ইসলাম জানা আকাশ কুসুম সমতুল্য। কুরআন ও সূন্নাহ থেকেই ইসলাম জানতে হবে এবং এ দুটিকে ইসলামের মানদণ্ড বলে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, কুরআন যেমনি ভাবে অকাট্য দলীল হিসেবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে, হাদিস কিন্তু আমাদের কাছে অকাট্য দলীল হিসেবে পৌঁছেনি। কুরআনে যেমন কোন প্রকার অবকাশ নাই হাদিস কিন্তু সে পর্যায়ের না। অনুরূপভাবে কুরআনের ক্ষেত্রে সহীহ, হাসান, দুর্বল ও বানোয়াট বলার কোন অবকাশ নাই কিন্তু হাদিস তা নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এ বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছেন, তিনি বলেন, শেষ যুগে কতক মিথ্যুক দজ্জালের আগমন ঘটবে, তারা তোমাদের কাছে এমন সব হাদিস পেশ করবে, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্ব পুরুষরাও কখনও শোনেনি, অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যাও, তারা যেন তোমাদেরকে ভ্রষ্টতা ও ফিতনা-ফ্যাসাদে নিপতিত করতে না পারে। হাদিসের ক্ষেত্রে সহীহ, হাসান, দুর্বল ও বানোয়াট যেহেতু আছে, তাই ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য হাদিসের এ বিষয়গুলো জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি এ বিষয়গুলো জানা না থাকে তাহলে ইসলাম সম্পর্কে নিরেট জ্ঞান লাভ আদৌ সম্ভব নয়। জ্ঞানহীন আমল বা অন্ধানুকরণ ইসলামী আদর্শের বিপরীত মেরু ও প্রতিপক্ষ। আমল করার জন্য কোন হাদিসটি সহীহ আর কোন হাদিসটি দুর্বল আর কোনটি মাওজু বা বানোয়াট তা জানা থাকা খুবই জরুরি। এ সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেই একজন মানুষ তার আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারবে এবং ইসলামী শরিয়তের বিধান মেনে চলতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে মানুষের মধ্যে সূন্নাহ সম্পর্কে বিষয়টি না জানা থাকাতে আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। কোন আমলটি কোন পর্যায়ের তা তারা অনুধাবন করতে পারে না। বিষয়টি যদি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হত, তাহলে তা খুব একটি দুশ্চিন্তার কারণ ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হল, তথা কথিত আলেম, ওলামা, পীর মাশায়েখরাও যখন এ সম্পর্কে জ্ঞানহীন হয়, তাহলে মুসলিম জাতির গতিবিধি কি হতে পারে তা চিন্তাই করা যায় না। অজ্ঞতার ফলে বর্তমানে সমাজে আমরা দেখতে পাই সহীহ আমলের বিপরীতে অসংখ্য ভিত্তিহীন আমল স্থান পেয়েছে। সঠিক ও নির্ভুল কথার বিপরীতে কাল্পনিক, শোনা কথা, বানানো কথাগুলো স্থান পেয়েছে। নকল ভেজালটাই বাজারজাত হয়ে আছে। তার বিপরীতে খাঁটি কথা, খাঁটি আমল মূল্যহীন। তার কোন স্থানই নাই। অবস্থা এতই অবনতির দিকে গিয়েছে, আপনি যদি বলেন, তুমি এ কথাটা কোথা থেকে বললে, অথবা তুমি যে এ আমল করছ তার প্রমাণ কি? তাহলে আপনাকে বলবে, তুমি প্রমাণের কি বুঝ? আমাদের বাপ-দাদা, পীর-মাশায়েখ, মুহাদ্দিস ও মুফতিরা কি কম বোঝেন? তারাওতো আলেম বা তারাও দাওরা/কামিল পাশ। এখানেই শেষ নয়, বরং আপনাকে উল্টো গোমরাহ বলে চুপে করিয়ে দেবে। আপনাকে বিভিন্ন ধরনের ভৎসনা করবে। আপনার বিরুদ্ধে তারা ফতোয়া গ্রহণ করবে। কিন্তু দু:খের বিষয় হল, যারা ফতোয়া দেবেন, তারা তথাকথিত জ্ঞানী নামধারীরাই, যাদের কাছে মূলত: কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান বলতে কিছুই নাই।
মুসলিম উম্মাহর এ দূরাবস্থার কারণে তাদের সূন্নাহ সম্পর্কে সচেতন করা এবং সূন্নাহের গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের অবগত করা খুবই জরুরি। এ বইটিতে সূন্নাহের গুরুত্ব এবং সূন্নাহ বিষয়ে কুরআন হাদিস ও উম্মতের ইজমা কি তা আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা এই যে আল্লাহ যেন আমাদের কুরআন সূন্নাহর উপর চলা ও তদুনুযায়ী জীবন যাপন করার তাওফীক দেন। আমীন।
সংকলক
জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।