hadith book logo

পরিবেশ বিপর্যয় রোধে ইসলাম

লেখকঃ মাওলাই মোস্তাফা বারজাওয়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

বায়ু দূষণ এড়াতে ইসলামী নির্দেশাবলি:

ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তদীয় ‘তিব্বে নববী’ বা ‘নববী মেডিসিন’ গ্রন্থে একটি অধ্যায়ই রচনা করেছেন মহামারি ও সেসব রোগ সম্পর্কে বায়ু দূষণের মাধ্যমে যার বিস্তার বা সংক্রমণ ঘটে। আর সেসব সংগ্রহ করেছেন তিনি ওহী মারফত প্রাপ্ত (কুরআন ও হাদীসের) বাণী থেকে। পরিবেশ সম্মেলন বসার শত বছর আগে তিনি তা রচনা করেছেন। তিনি রহ. বলেন, ‘উদ্দেশ্য হলো: মহামারীর সক্রিয় কারণ ও পূর্ণ হেতুগুলোর অন্যতম বায়ু দূষণ। আর বায়ুর উপাদান দূষণ মহামারির প্রকোপকে অনিবার্য করে। এদিকে বায়ু দূষণ হয় খারাপ অবস্থা প্রবল হবার প্রভাবে তার কোনো উপাদান মন্দে রূপান্তরিত হলে। যেমন, পচন, দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত হওয়া। চাই তা বছরের যে কোনো সময় হোক না কেন। যদিও প্রায় ক্ষেত্রে এর উদ্ভব ঘটে গ্রীষ্ম ও বসন্তের শেষভাগে।’ [ইবনুল কাইয়্যেম: ‘আত-তিব্ব আন-নাববী’, দারু মাকতাবা হিলাল, বৈরুত, পৃষ্ঠা: ১০৮।]

প্রশ্ন হলো তাঁকে এ জ্ঞান কে শেখালো? এটা নিশ্চয় আল্লাহ শিখিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহই তিনি যিনি তাঁকে সাহায্য করেছেন শরী‘আর ইলমসমূহে গভীরতা অর্জনে এবং সেই মৌলিক নীতিমালা ও মূলনীতি উদ্ভাবনে যা তখনো ধ্বংস হবে না যখন দুনিয়ার লোকেরা ধ্বংস হয়ে যাবে।

পক্ষান্তরে ইবন খালদূন পরিবেশ দূষণের কারণ হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছেন অধিক মৃত্যু ও মড়ককে। পাশাপাশি তিনি তার ‘আল-মুকাদ্দিমা’ নামক অমর গ্রন্থে এর অনেকগুলো কারণ নির্দেশ করেছেন। সেসবের মধ্যে রয়েছে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি। তিনিও তাতে উল্লেখ করেছেন যে এর বেশিরভাগের মূলে রয়েছে বায়ু দূষণ। যার কারণ এর বয়োবৃদ্ধি এবং আর্দ্রতা ও বিকৃতি। এ জন্য তিনি বলেন, মানুষের বিচক্ষণতার অংশ হলো বাড়ি-ঘরে মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখা। যাতে বাতাস তরঙ্গায়িত হতে পারে। যাতে করে বাতাসে বিদ্যমান বিকৃতি ও পচন থেকে সৃষ্ট ক্ষতিকর উপাদানগুলো উড়ে যেতে পারে। [ইবন খালদূন, ‘আল-মুকাদ্দিমা’: ২/৭৭১-৭৭২।]

সম্প্রতি বিশ্বের শ্বাস-বিশ্বাস ‘গ্রিনহাউজ এফেক্ট’কে তীব্র করে তুলেছে। গাড়ি-ঘোড়া ও শিল্পকারখানা থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাস বায়ুমণ্ডলে আটকে যাচ্ছে। এতে করে এর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জল, স্থল ও অন্তরীক্ষ দূষিত হয়ে পড়ছে। বাতাসে কার্বনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিবেশে এই দূষণের জন্য মানুষই মূলত দায়ী বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন। মানুষই এর প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করেছে।

বায়ু দূষণের প্রতিই ইঙ্গিত করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অমূল্য বাণী। আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا مِنْ رِيحِهَا فَهِىَ زَانِيَةٌ» .

“যে কোনো মহিলা সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করে। অতঃপর মানুষের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে যাতে তারা তার সুবাস পায়, সে একজন ব্যভিচারিণী।” [নাসাঈ, হাদীস নং ৫১৪৩। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।]

সত্যিই (নারীর সুগন্ধি ব্যবহার) এমন এক দূষণ যা খাঁটি মুত্তাকীদের ঈমানের স্বচ্ছতাকে কর্দমাক্ত করে এবং মনুষ্যরূপী নেকড়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ঐ বস্তুগুলোও দৈনন্দিন জীবনের বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে আলিমগণ যেসব হারাম হবার বিষয়ে একমত। যেমন ধূমপান প্রবণতা। অনেক মানুষকে দেখবেন পাবলিক স্পেসগুলোয় দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট জ্বালিয়ে মজা নিচ্ছেন। অথচ তা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট বড় উপস্থিত সবাই। কারণ, নিয়মিত ধূমপানের চেয়ে প্যাসিভ স্মোকিং মানুষের জন্য আরও ক্ষতিকর।

অপরদিকে সুগন্ধির প্রতি দুর্বলতা, সুগন্ধি ছড়ানো এবং অন্যকে তা উপহার প্রদান পরিবেশের সৌন্দর্যায়নে ভূমিকা রাখে। মুসলিমের ঘ্রাণেন্দ্রিয় যেমন নান্দনিক আচরণ ও সুরভিত কাজে অভ্যস্ত তেমনি তা একইসঙ্গে দূষিত পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে। চাই যেখানেই দূষণ হোক না কেন। যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ عُرِضَ عَلَيْهِ رَيْحَانٌ فَلاَ يَرُدُّهُ فَإِنَّهُ خَفِيفُ الْمَحْمِلِ طَيِّبُ الرِّيحِ» .

“যার সামনে সুগন্ধি উপস্থাপন করা হয় সে যেন তা প্রত্যাখ্যান না করে। কারণ, তা বহনে হালকা এবং বাতাসকে সুবাসিত করে।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮৩৫।]