hadith book logo

পরিবেশ বিপর্যয় রোধে ইসলাম

লেখকঃ মাওলাই মোস্তাফা বারজাওয়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

পরিবেশের সংজ্ঞা:

ক. আরবী ‘বীআ‘’ বা পরিবেশের শাব্দিক অর্থ: স্থান বা বাসস্থান। আর ‘বিআ’’, ‘বাআ‘’ ও ‘মাবাআ‘’ শব্দগুলো গোত্রের বাসস্থান অর্থে ব্যবহৃত হয়। উপত্যকা বা পর্বতচূড়ার যেখানে তারা সংঘবদ্ধভাবে আশ্রয় নেয়। এ থেকেই যে পানির স্থানে উটকে বসানো হয় বা যেখানে সে রাত কাটায় তাকে ‘মাবাআ‘’ বলা হয়। [ইবন মানযূর, লিসানুল আরব: ১/৩৮২।]

খ. ইসলামে ‘বিআ‘’ বা পরিবেশ বলতে কী বুঝায়: এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ যা জীবনের সকল পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করে। পরিবেশ কখনো আরও ব্যাপকার্থে আমাদের ভারকারী যমীন এবং আমাদের ছায়াদানকারী আসমানকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আবার কখনো তা সংকুচিত অর্থে মানুষের ঘরকে এবং তার কাজ ও বাসস্থান বুঝায়। এক কথায় পরিবেশ হলো, ‘মানুষের চারপাশের সবকিছু। সৃষ্টিজগতের সবকিছু। পানি ও বাতাস এবং প্রাণীজগৎ ও জড়জগতের সব। এই সে প্রকৃতির আঙ্গিনা যেখানে মানুষ তার জীবন ও নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এসবের মধ্যে মানুষ তাকে একটি ‘সুদৃঢ় পরিবেশে’ রূপ দিতে পারে। যার পরিমণ্ডলে মানুষ তার নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাযুক্তিক পরিবেশ গড়ে তোলে।’

আর পরিবেশের রয়েছে মহান স্রষ্টা এবং মহাপ্রজ্ঞাবান পরিচালক আল্লাহ প্রবর্তিত একটি সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ সূক্ষ্ম ব্যবস্থা। আল্লাহ বলেন,

﴿صُنۡعَ ٱللَّهِ ٱلَّذِيٓ أَتۡقَنَ كُلَّ شَيۡءٍۚ﴾ [ النمل : 88]

“আল্লাহর কাজ, যিনি সব কিছু দৃঢ়ভাবে করেছেন।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৮৮]

কিন্তু মানুষের হাতই পরিবেশের সব সুন্দরকে ম্লান করে। সবুজ ও সজীবতার বিনাশ ঘটায়। ধ্বংসের এই আকৃতিকেই পবিত্র কুরআন ‘বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে এবং অধুনা বিজ্ঞান ‘দূষণ’ নামে অভিহিত করেছে।

পরিবেশের শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং পৃথিবীর জীবনকে অসম্ভব ও ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে এমন যে কোনো অনাচারের বিরুদ্ধেই ইসলাম সোচ্চার। তা রোধে ইসলাম নানা উপায় ও প্রকৃতির শিক্ষার প্রবর্তন করেছে। বরং তার জন্য এমন সব বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছে, অন্য যে কোনো সনদ বা ধর্ম কিংবা সংগঠনে যার পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ রূপ খুব কমই দেখা যায়।

শিক্ষা: এটি মানুষের সেই স্বভাব বা প্রকৃতি জন্মক্ষণ থেকেই যা সে তার সঙ্গে নিয়ে আসে। ইসলামের উচ্চ মূল্যবোধ বপনের মাধ্যমে এর গঠন আরও পূর্ণতা পায়। অতএব, যে পরিবেশে আত্মীয়তা বা অঙ্গীকারের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না, ধর্মীয় বিধি-নিষেধের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না, সেখানে সুস্থ সমাজের সকল উপাদান বিলীন হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَأَقِمۡ وَجۡهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفٗاۚ فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٣٠﴾ [ الروم : ٣٠ ]

“অতএব, তুমি একনিষ্ঠ হয়ে দীনের জন্য নিজকে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

(ঐশ্বরিক) রব্বানী বিধি: এটি হলো স্বয়ংক্রিয় কর্মকাণ্ড। আর আল্লাহর কিতাব এবং হাবীব মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ উদ্ভূত বিধানাবলিকে কার্যে রূপান্তরিত করতে প্রয়োজন আল্লাহর বাধ্য ও অনুগত বিনীত বান্দার। আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ»

“নিশ্চয় দুনিয়া সবুজ লোভনীয় বস্তু। আল্লাহ তোমাদেরকে এতে তাঁর প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। কারণ, তিনি দেখবেন তোমরা কী আমল করো।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭১২৪।]

অতএব, দীন ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে জীবন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যত্ন নেবার ক্ষেত্রে ইসলামী শরী‘আহ মুসলিমদের এক শিক্ষা ভাণ্ডার। একটি পথ ও পন্থা। আর পরিবেশ সংক্রান্ত যত সনদ, সংগঠন ও আইন বেরিয়েছে, পরিবেশ রক্ষায় যত আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সবই ইসলামী শরী‘আর প্রতিফলন ঘটায়। যে ইসলাম উদ্বুদ্ধ করে পরিবেশ সংরক্ষণে, পরিবেশে সুন্দর আচরণে, পরিবেশ রক্ষায় এবং মানুষ ও জীবের কল্যাণে এর বিকাশ ও উন্নয়ন সাধনে।