hadith book logo

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবদান

লেখকঃ ড. মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

নিপীড়ন-নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তি লাভের অধিকার

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কোন ব্যক্তিকে শারীরিক-মানসিক শাস্তিদান বা তাকে কষ্ট দেয়াকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন, "প্রকৃত মুসলিম হচ্ছে সে ব্যক্তি যা কথা বা হাত (কাজের নিপীড়ন) থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকেন।" [.আল্-হাদীস, ওয়ালী উদ্দিন মোহাম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহ, মিশকাত আল মাসাবিহ, এম. বশির হাসান এন্ড সন্স, কলিকাতা, তা. বি. ১ম খণ্ড, পৃ. ১২।] এমনকি এক্ষেত্রে অমুসলিম নাগরিকগণের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় তিনি বলেছেন: "মনে রেখো! যদি কোন মুসলিম অমুসলিম নাগরিকের উপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার উপর সাধ্যাতীত বোঝা (জিযিয়া বা প্রতিরক্ষা কর) চাপিয়ে দেয় অথবা তার কোন বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষ অবলম্বন করব।" [.আল্-হাদীস থেকে উদ্ধৃত, মো. আতাউর রহমান, ইসলামী শ্রমনীতির রূপরেখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৪৬, জুন- '৯৩, পৃ. ৪৩।]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কারো অপরাধের জন্য অন্যকে দণ্ড দেওয়ার যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রেওয়াজও চিরতরে রহিত করে দেন। বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক অভিভাষণে তিনি বলেন, "কারো অপরাধের জন্য অন্যকে দণ্ড দেয়া যাবে না। সুতরাং পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে দায়ী করা যাবে না।" [.আল্-হাদীস, ইবনু মাজা ও তিরমিযী, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রণীত, মোস্তফা চরিত, ৪র্থ সংস্করণ, পৃ. ৮৫৫।] রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই ঘোষণার মূলে ছিল কুরআনের সেই বাণী, "প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী। যে ব্যক্তি কোন অপরাধ সংগঠিত করে তা তারই দায়িত্বে থাকে, কেউ অন্যের বোঝা বহন করে না।" [.আল্-কুরআন, সূরা তূর : ২১ ও সূরা আনআম : ১৬৪।] এছাড়াও "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও খলীফাদের শাসনামলে এমন বহু ঘটনা রয়েছে যাতে আইনগত প্রতিবিধানের ব্যবস্থা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দান ব্যতীত কাউকে আটক করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।" [.মুহাম্মদ শফিক আহমদ ও মুহাম্মদ রুহুল আমিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪।]

সাম্প্রতিককালে দেখছি মানবাধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর হাতেও আমরা যুদ্ধবন্দীদের উপর কি বিভৎস, অমানবিক ও নিষ্ঠুর অত্যাচার, নির্যাতন চলছে- অথচ এ ব্যাপারে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নীতি প্রকৃত মানবাধিকার সংরক্ষণে কত কার্যকর। তিনি বলেছেন, "মুসলিমদের প্রতি মুসলিমদের যে কর্তব্য, আশ্রয়প্রার্থী ও যুদ্ধবন্দিদের প্রতি কর্তব্য তার চেয়ে অনেক বেশি।" [.আল্-হাদীস, তিরমিযী শরীফ থেকে উদ্ধৃত : মুহাম্মদ ফায়জুল হক, যুদ্ধ বন্দিদের সঙ্গে আচরণ : কোরআন কী বলে, দৈনিক যুগান্তর, ১৪ মে ২০০৪ সংখ্যা, পৃ. ১২।] ইবনে রুশদ সাহাবী আল হাসান ইবনে মুহাম্মদ আল তামিমির বরাত দিয়ে বলেন, "রাসূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীরা সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বন্দীকে হত্যা করা বে-আইনী"। বদর যুদ্ধে প্রাপ্ত যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে আদর্শ ব্যবহার দেখিয়েছিলেন জগতের ইতিহাসে তাঁর তুলনা মেলা ভার। তাঁর আদেশে মদীনার আনসার এবং মুহাজিররা সাধ্যানুসারে বন্দিদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে আপন আপন গৃহে স্থান দিয়েছিলেন এবং আত্মীয়-স্বজনের মত তাদের সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর এই নীতি যুদ্ধবন্দিদের জীবনে মানবাধিকার এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, পরবর্তীকালে উইলিয়াম মূর 'লাইফ অব মুহাম্মাদ' গ্রন্থে লেখেন যে, "মুহাম্মাদের নির্দেশানুযায়ী বন্দি এবং স্থানীয়রা একই বাড়িতে স্থান পেয়েছিলেন, তারা বন্দিদের দয়া এবং সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করেন ...।" [.উদ্ধৃতি, মুহাম্মদ ফায়জুল হক, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২।]