hadith book logo

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবদান

লেখকঃ ড. মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

শান্তি, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায়

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক স্পষ্ট ভাষায় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন যে, "আমি তোমাকে সমগ্র সৃষ্টির জন্যে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।" [.আল্-কুরআন, সূরা আম্বিয়া : ১০৭।] কুরআনের এ বাণী পরিপূর্ণভাবে সত্যে পরিণত করেছিলেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র মানব জাতির ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অনন্য সাধারণ উদাহরণ রেখে গেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা আজো অদ্বিতীয় এবং সর্বজন স্বীকৃত অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত। কেননা তিনি কেবল মুসলিমদের আদর্শ ছিলেন না, ছিলেন গোটা মানব জাতির আদর্শ। আল্লাহ পাক তাঁকে এই মর্মে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন: "বলুন (হে মুহাম্মাদ), হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর রসূল।" [.আল্-কুরআন, সূরা আরাফ : ১৫৮।]

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব যিনি অতি শৈশবে বিস্ময়করভাবে সমবণ্টন নীতিতে তার দুধমাতা হালিমার ঘরে দুধমাতার একটি মাত্র স্তন পান করতেন আর একটি রেখে দিতেন হালিমার নিজের সন্তানের জন্যে।" [.অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম, শান্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সা.), সীরাত স্মরণিকা ১৪১৫, ইফাবা, ঢাকা, পৃ. ৩৮।] তাঁর জীবনে সবক্ষেত্রে সব পর্যায় শান্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তিনি অনুকরণীয় আদর্শ রেখে গেছেন, এমনকি নবুওয়তের আগেও, "হিলফুল ফুজুল" গঠন তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহ পাকের দেয়া বাণী প্রচার ও তাঁর একত্ববাদী ধর্মমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কি মক্কায়, কি তায়েফে বহুভাবে তিনি নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছেন- কিন্তু কিছুতেই ধের্যহারা হননি। পরবর্তীকালে শত্রুর মোকাবেলা করতে, নওমুসলিমদের জীবন ও নতুন রাষ্ট্রকে বাঁচাতে আল্লাহ পাকের অনুমতিক্রমে তাঁকে হয়তঃ অনেকগুলো যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে কিন্তু, গবেষকগণ যথার্থই বলেছেন, "সবগুলো যুদ্ধই ছিল প্রতিরক্ষামূলক এবং শান্তিকে সুদৃঢ় বুনিয়াদের উপর সংস্থাপনের লক্ষ্যে।" [.প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০।] মনে রাখতে হবে, তিনি যুদ্ধ করেছিলেন সম্পূর্ণভাবে পবিত্র কুরআনের এই নীতিমালার অধীনে: "তাদেরকে যুদ্ধ (কিতাল)-এর অনুমতি দেয়া হলো যারা আক্রান্ত হয়েছে, কেননা তাদের উপর যুলম করা হয়েছে" [.আল্-কুরআন, সূরা হজ্জ : ৩৯।] এবং "যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাহে যুদ্ধ কর কিন্তু সীমালংঘন করো না। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।" [.আল্-কুরআন, সূরা বাকারা : ১৯০।]

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাই যুদ্ধ করেছেন শান্তির জন্যই। যখনই শান্তি চুক্তির প্রস্তাব এসেছে এমনকি আপাত দৃষ্টিতে তা মুসলিম স্বার্থ বিরোধী হলেও, তিনি বিনা দ্বিধায় তা গ্রহণ করেছেন একমাত্র শান্তির প্রত্যাশায়। হুদায়বিয়ার সন্ধি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিযানটি ছিল একটি রক্তপাতহীন অনন্য সাধারণ যুদ্ধ। সমগ্র মক্কাবাসী যখন তাদের দ্বারা নির্যাতিত, বিতাড়িত, চরম প্রতিহিংসার শিকার মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাতে চরম দণ্ড পাওয়ার আশংকায় ক্ষণ ইতিহাস রচনা করেন।

বংশমর্যাদা আর জ্যাত্যাভিমানের সেই যুগে তিনিই প্রথম শান্তি আর সাম্য প্রতিষ্ঠায় এই মহান বাণী প্রচার করেন যে, "তাকওয়া (খোদা ভীরুতা) ছাড়া অন্য কোন কারণে অনারবদের উপর আরবদের কোন মর্যাদা নাই। সাদা কালোর প্রতি এবং কালো সাদার প্রতি বৈষম্য ছোট বা বড় নয়। তাই তো তিনি হাবসি গোলাম বেলাল (রা.)-কে পৃথিবীর প্রথম মুয়াজ্জিন-এর মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। উপঢৌকন পাওয়া ক্রীতদাস যায়দ বন হারিসকে কেবল আজাদই করেছিলেন তা নয়, নিজের ফুপাতো বোন জয়নাবের সাথে তার বিয়ে দিয়ে পরিবারের একজন করে নিয়েছেন। নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে অমুসলিমদেরকেও তিনি সমান অধিকার দিয়েছেন। তার স্পষ্ট নির্দেশ: "ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিমদের রক্ত আমাদের রক্তের মতই পবিত্র। তাদের ধন-সম্পদ আমাদের ধন-সম্পদের মতই হিফাজতযোগ্য।" নাগরিক সাম্য ও মৈত্রীর এই মহান নীতি ইসলাম ও মুসলিম শক্তি ভিন্নধর্মী কোন নাগরিকের ওপরেই জবরদস্তিমূলকভাবে ইসলাম চাপিয়ে দেননি, যার ছোট একটা উদাহরণ এই যে, প্রায় এক হাজার বছর মুসলিমরা এ উপমহাদেশে শাসকালেও মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র এক চতুর্থাংশ।" [.প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।]