hadith book logo

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবদান

লেখকঃ ড. মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

দয়া, ক্ষমা ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায়

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, ক্ষমাশীল ও কোমল। দয়া, ক্ষমা, শান্তি ও সাম্যের প্রতিরূপ এই মহামানব স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, "যে মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহ পাক তাকেএ দয়া করেন না।" [.আল্-হাদীস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।] এখানে কেবল মুসলিমদের কথাই নয় বরং গোটা মানব জাতির কথা বলা হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনকে তিনি নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। অন্য একটি হাদীসে হাদীসে মহানবী (সা.) বলেন: "পৃথিবীতে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া কর। উর্দ্ধালোকে যারা আছেন আর তারা তোমার প্রতি সদয় হবেন।" [.আল্-হাদীস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।] অন্যদিকে শ্রমিক অধীনস্থ কর্মচারী চাকর-চাকরানীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করা, তাদেরকে নিজেদের অনুরূপ খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-আশাক, বিশ্রাম ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেও তিনি বারংবার তাগিদ দিয়েছেন। বস্তুত বিশ্বনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শ্রমিকদের সব প্রকার বঞ্চনা, অত্যাচার, নিপীড়ন আর গ্লানির অবসান করে এমন সব শ্রমনীতির প্রবর্তন করে গেছেন যার সিকি শতাংশও জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আই.এল.ও) বিগত ১১৮ বছর ধরে মে দিবস উদ্‌যাপনের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।" [.মুহাম্মাদ ফরহাদ হোসেন, মে দিবস, শ্রমিক শ্রেণী এবং ইসলাম, দৈনিক যুগান্তর, ৩০ এপ্রিল ২০০৪, পৃ. ১২।]

বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত এক হাদীসে বলা হচ্ছে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন: শক্তি-সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ শ্রমিকদের উপর চাপাবে না। যদি তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত কেন কাজ তাকে দাও তাহলে সে কাজ শ্রমিকদের উপর চাপাবে না। যদি তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন কাজ তাকে দাও তাহলে সে কাজে তাকে সাহায্য কর। [.প্রাগুক্ত, পৃ. ১২।] তিনি আরো বলেছেন: "বিনিয়োগকারী যেন নিয়োজিত শ্রমিকের কাছ থেকে তার সামর্থ্যের বাইরে কোন কাজ আশা না করে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নষ্ট হতে পারে এমন কোন কাজে যেন তাদের বাধ্য করা না হয়।" [.আল্-হাদীস, ইবনে মাজাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ।] শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরী থেকে তাকে বঞ্চিত করা সেই আবহমান কাল থেকেই মালিক পক্ষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আজকের সমাজে এর উদাহরণ ভুরি ভুরি পাওয়া যায়। অথচ এ ব্যাপারে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কঠোর নির্দেশ রয়েছে তাদের ন্যায্য মজুরী প্রদানের জন্যে। বায়হাকী শরীফের একটি হাদীস অনুযায়ী, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন তিন প্রকার মানুষের সঙ্গে আমি ঝগড়া করবো, আর যার সঙ্গে ঝগড়া করবো তাকে আমি পরাজিত করে ছাড়বো। তার মধ্যে এক ব্যক্তি হলো, শ্রমিক থেকে সে পুরোপুরি কাজ আদায় করে কিন্তু সে অনুপাতে পারিশ্রমিক প্রদান করে না।" [.প্রাগুক্ত, পৃ. ১২।] তিনি আরো বলেন: "শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।" [.বায়হাকী শরীফের হাদীস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২।] অন্যদিকে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শ্রমিকদের মালিকের সঙ্গে অযথা বাড়াবাড়ি করাকে নিষিদ্ধ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে শ্রমিকের কাছে মালিকের জিনিসপত্র আমানতস্বরূপ। এসব নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে তিনি এক অপূর্ব আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।

শুধু তাই নয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নবী হওয়া সত্ত্বেও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে শ্রমিকের কাজ করেছেন। কখনো বাণিজ্য প্রতিনিধি হিসাবে, নিজ হাতে জুতা সেলাই করে, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন কর, পরিখা খননে বাধাগ্রস্থ বড় বড় পাথরকে কুঠারের আঘাতে টুকরা করে, সঙ্গী সাথীদের জন্য রান্নার কাঠ সংগ্রহে নিজ হাতে কুঠার ধরে, শ্রমিককে ভাই সম্বোধন করে, শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বলেছেন শ্রমকে তাচ্ছিল্য করো না কারণ শ্রম আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। তিনি আরো বলেন, সকল নবী-রাসূলই মেষচারী ছিলেন। [.মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন, শ্রমিক আল্লাহর বন্ধু, দৈনিক যুগান্তর, ৩০ এপ্রিল, ২০০৪, পৃ. ১২।] বিদায় হজ্জের ভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি নির্দেশ দেন: "সতর্ক থাকিও, সতর্ক থাকিও দাস-দাসী সম্পর্কে। তোমরা যেরূপ খাবে তাহাদেরও অবশ্যই খাওয়ার ব্যবস্থা করিবে। তোমরা যেরূপ পরিবে তাহাদেরও পরার ব্যবস্থা করিবে।" [.রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিদায় হজ্জে ভাষণ, বাংলায় বোখারী শরীফ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৭।] এভাবে শান্তি, মৈত্রী, ক্ষমা, দয়া শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায় বিচারের যে মহান আদর্শ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রেখে গেছেন নিজের জীবনে তার প্রতিষ্ঠা করে- মানব মর্যাদা ও মানবাধিকারের ধারণা ও তা অর্জনের ক্ষেত্রে তা এক অতুলনীয় দিক-নির্দেশনা। তাঁর এই গুণাবলী ও দৃষ্টিভঙ্গীতে মুগ্ধ বিখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্যিক জর্জ বার্ণাড শ' তাই বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি, "If all the world was united under one leader, Mohammad would have been the best fitted man to lead the peoples of various creeds, dogmas and ideas to peace and happiness." [.অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২।]