hadith book logo

ইসলামি অর্থনীতি শান্তি ও সমৃদ্ধির অব্যর্থ ব্যবস্থা

লেখকঃ আলী হাসান তৈয়ব • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

প্রথমত ; মানব প্রকৃতির প্রতি খেয়াল রাখা :

আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি মানুষকে এমন কিছু সহজাত প্রকৃতি ও প্রবণতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যা কখনো তার থেকে বিচ্ছিন্ন বা নির্মূল হবার নয়। তবে যেসব প্রকৃতি কলুষিত বা বিকৃত হলে তার সংস্কার এবং সংশোধন সম্ভব। এ কারণেই যে ব্যবস্থা মানব প্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তা কখনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। টিকে থাকতে পারে না সহজে। ইসলামি অর্থনীতি তাই মানব প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রেখেছে কারণ ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম। আর মানব প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখার বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রথমত মানুষের ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ মালিকানা লাভে আগ্রহী। এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআন বলছে- আর তোমরা ধন-সম্পদকে অতিশয় ভালবাস। [. ফাজর : ২০] দ্বিতীয়ত উত্তরাধীকার স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে। কেননা মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সন্তানদের ভালোবাসে। তাদেরকে সম্পদহীন কপর্দকশূন্যভাবে রেখে যেতে অস্থিরতা বোধ করে। এ জন্যই ইসলাম মিরাছ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। কারণ ইসলাম প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল একটি ধর্ম। সন্তানদের প্রতি মানুষের টান, তাদের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্য এবং নিজের অবর্তমানে তাদের অবস্থা চিন্তা করে ভেতরে অস্থিরতা বোধ করার প্রবণতার প্রতি ইঙ্গিত করে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- আর তাদের ভয় করা উচিৎ যে, যদি তারা তাদের পেছনে অসহায় সন্তান রেখে যেত, তাহলে তারা তাদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হত। সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং যেন সঠিক কথা বলে। [. নিসা : ০৯] আরো ইরশাদ হয়েছে- তোমাদের কেউ কি কামনা করে, তার জন্য আঙ্গুর ও খেজুরের এমন একটি বাগান থাকবে, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদ-নদী, সেখানে তার জন্য থাকবে সব ধরনের ফল-ফলাদি, আর বার্ধক্য তাকে আক্রান্ত করবে এবং তার জন্য থাকবে দুর্বল সন্তান-সন্ততি। অতঃপর বাগানটিতে আঘাত হানল ঘুর্ণিঝড়, যাতে রয়েছে আগুন, ফলে সেটি জ্বলে গেল? এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর। [. বাকারা : ২৬৬]

ইসলাম তার অর্থ ব্যবস্থায় মানুষকে নিজ প্রচেষ্টা ও শ্রমের ফল ভোগ করার অধিকার দিয়েছে। কারণ এটাই মানুষের স্বভাব। বরং মানুষের সহজাত চাহিদা হলো, সে তার পরিশ্রমের ফসলে অন্য কারো অংশীদারিত্ব সহ্য করতে পারে না। তবে সে এমন অংশীদারিত্ব সাদরে মেনে নেয় যার বিনিময়ে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়া যায়। মানুষের এ স্বভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে কুরআন বলছে- আর আল্লাহ রিয্কে তোমাদের কতককে কতকের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন; কিন্তু যাদেরকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তারা তাদের রিয্ক দাসদাসীদের ফিরিয়ে দেয় না। (এই ভয়ে যে,) তারা তাতে সমান হয়ে যাবে। তবে তারা কি আল্লাহর নিআমতকে অস্বীকার করেছে? [. নাহল : ৭১]

ইমাম কুরতুবি র. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা তোমাদের মধ্যে ধনী-গরিব সৃষ্টি করেছেন। যাদেরকে রিজিক দিয়েছেন তারা তাদের গোলামদেরকে রিজিক দিতে চায় না এই ভয়ে যে পাছে মুনিব-ভৃত্য সমান হয়ে যায় কি-না। [. তাফসিরে কুরতুবি : ১০/১৪১] অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে একটি উপমা বর্ণনা করেছেন; আমি তোমাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তাতে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীরা কি অংশীদার? ফলে তোমরা কি এ বিষয়ে সমান? [. রূম : ২৮]

ইমাম কুরতুবি এ আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, ‘ من أنفسكم ’ এখানে من ইবতিদা বা শুরু বুঝানোর জন্য এসেছে। যেন তিনি বলছেন, আমি একটি দৃষ্টান্ত দিব আর তা নেব তোমাদের সবচে’ কাছের জিনিস থেকে। তা হচ্ছে তোমাদের অন্তর। ইমাম কুরতুবি বলেন, ব্যাখ্যা হলো, তোমাদের কেউ কি রাজি হবে যে, তার অধীনস্ত ব্যক্তি সম্পদে-সম্মানে তার সমকক্ষ হোক? কখনো না, এখন ভেবে দেখ তোমরা নিজেদের সম্পদে যখন সমকক্ষ বা অংশীদার বানাতে সম্মত হও না তাহলে কীভাবে আল্লাহর অংশীদার বানাও?

আর মানব প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রেখেই তৈরি হয়েছে ইসলামি অর্থনীতির সকল ধারা উপধারা। যাবতীয় মূলনীতি। যেমনটি আমরা সামনে আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখার অর্থ অন্ধের মতো প্রবৃত্তির পিছে ছোটা নয় যে, সে যেদিকেই আর যেভাবেই চলুক না কেন আমিও তাই করব। বরং এর অর্থ তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে মূলের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং সংস্কারেরও অবকাশ রাখা যখন সে বিকৃত বা বিচ্যুত হয়।