hadith book logo

শিয়া আলেম ও অধিকাংশ মুসলিম আলেমের মধ্যে বিরোধের বাস্তব চিত্র

লেখকঃ সা‘ঈদ ইসমাঈল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

আহলে বাইত (নবী পরিবার)

আহলে বাইত তথা নবী পরিবারকে শিয়া আলেমগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছোট কন্যা ফাতেমা, তার স্বামী আলী, তার দুই পুত্র হাসান ও হোসাইন এবং হোসাইনের বংশীয় নয় জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পছন্দ করে; যিনি (হোসাইন) ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর আমলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন পারস্য সম্রাট এযদাজারদের কন্যার (শাহবানু) সাথে; আর তারা (শিয়াগণ) নবী পরিবারের ঐসব সদস্যদের সাথে এমন সব গুণাবলী নির্দিষ্ট করে, যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ উত্তরাধিকার সূত্রে শাসন ক্ষমতার অধিকারী হওয়া, নিষ্পাপ হওয়া, অদৃশ্য জগতের জ্ঞান থাকা.. ইত্যাদি।

অতঃপর তারা বিভিন্ন যুগের মুসলিমদের খলিফা ও বিচারকদের উপর গাফলতির অপবাদ এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। আর অন্যান্যদের সাথে তাদের এই ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত করেন সম্মানিত সাহাবাগণকে (রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম); তবে তিনি ব্যতীত, যিনি শিয়া আলেমদের নিকট অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে, তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাহায্য করেছেন এবং কোন বিষয়ে কখনও তার বিরোধিতা করেননি। [অথাৎ শুধুমাত্র এ কয়েকজনকেই অপবাদমুক্ত রাখেন; বাদবাকী সকল সাহাবীর প্রতিই গাফিলতির অপবাদ দিয়ে থাকেন।]

অথচ অধিকাংশ মুসলিম আলেম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটাত্মীয়দের মধ্য থেকে এমন প্রত্যেককে আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করেন, যার জন্য সাদকার মাল গ্রহণ করা হারাম বা নিষিদ্ধ; আর তাদের অন্তর্ভুক্ত হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার, জাফর রা. ও তাঁর পরিবার, আকিল রা. ও তাঁর পরিবার এবং আব্বাস রা. ও তাঁর পরিবার। [সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৫১ - ৭৫২, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৭৩।]

যেমনিভাবে মুসলিম আলেমগণ সূরা আল-আহযাবের ৩৩ নং আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীগণকে আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করেন। কারণ, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ وَأَقِمۡنَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتِينَ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣﴾ [ سورة الأحزاب : 33]

“আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন যুগের মত নিজেদেরেকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাকবে। হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ পবিত্র করতে।” [সূরা আল-আহযাব: ৩৩।]

তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ হলেন প্রত্যেক মুমিনের মা। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা সূরা আল-আহযাবের ৬ নং আয়াতে বলেন:

﴿ ٱلنَّبِيُّ أَوۡلَىٰ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ مِنۡ أَنفُسِهِمۡۖ وَأَزۡوَٰجُهُۥٓ أُمَّهَٰتُهُمۡ ...﴾ [ سورة الأحزاب : 6]

“নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মাতা ...।” [সূরা আল-আহযাব: ৬।]

যেমনিভাবে আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের কাউকে বাদ না দিয়ে সৎকর্মশীল সবার জন্য মুসলিম আলেমদের নিকট রয়েছে উন্নত মর্যাদার স্বীকৃতি। মুসলিম র. বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, [সহীহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৭৩।] যায়েদ ইবন আরকাম রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘খুম’ নামক কূপের কাছে দাঁড়িয়ে বলেন:

« ... فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِىَ رَسُولُ رَبِّى فَأُجِيبَ وَأَنَا تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ أَوَّلُهُمَا كِتَابُ اللَّهِ فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ فَخُذُوا بِكِتَابِ اللَّهِ وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ » . فَحَثَّ عَلَى كِتَابِ اللَّهِ وَرَغَّبَ فِيهِ ثُمَّ قَالَ « وَأَهْلُ بَيْتِى أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِى أَهْلِ بَيْتِى أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِى أَهْلِ بَيْتِى أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِى أَهْلِ بَيْتِى » . [ أخرجه مسلم ]

“... আমি তো শুধু একজন মানুষ, অচিরেই আমার প্রতিপালকের (মৃত্যুর) দূত এসে যাবেন, অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দেব; আর আমি বিদায় বেলায় তোমাদের মধ্যে দু’টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি: তার প্রথমটি হল আল্লাহর কিতাব, যাতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে; সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর এবং তাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধর।” সুতরাং তিনি আল্লাহর কিতাবের প্রতি উৎসাহিত করলেন; অতঃপর বললেন: “অপরটি হল আমার পরিবার-পরিজন; আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।” সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সময়ে আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক সে সময়ে তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করার নির্দেশও দিয়েছেন। আর এটা তাঁর চরিত্রের পরিপূর্ণতার নিদর্শন, কেননা তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। আর মুসলিম আলেমগণ অভিমত পেশ করেন যে, নবী পরিবারের জন্য এ ধরনের সম্মান প্রদর্শন নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি [নবী পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন] সাহাবীগণ এবং সর্ব যুগের ও সকল স্থানের সৎকর্মশীল মুমিনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দিকেই আহ্বান করে।

হে ভাই ও বোনেরা! আমরা মুসলিমগণ কি সত্যিকার অর্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাকি কন্যাগণ, তাঁর নিকটাত্মীয় সকল এবং তাদের সৎকর্মশীল বংশধরগণকে (নবী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত না করে) এড়িয়ে যেতে সক্ষম হব? আমরা কি সত্যিকার অর্থে আহলে বাইত তথা নবী পরিবারকে শিয়া আলেমদের পছন্দমত সীমিত সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারি? তারা কি আহলে বাইতের সৎকর্মশীল সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান এবং হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামকে অভিশাপ দেয়ার বিষয়টি আমাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়? আর ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে কোন বিধান প্রযোজ্য হবে, যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই কন্যাকে বিয়ে করেছেন এবং তাদের একজনের পক্ষ থেকে তাঁর একটি ছেলেও রয়েছে? আর তার বংশধরের ক্ষেত্রেই বা কোন বিধান প্রযোজ্য হবে? আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম নাতী হাসান রা.-এর বংশধরের ক্ষেত্রেই বা কোন বিধান প্রযোজ্য হবে? তোমরা কি বিশ্বাস কর না যে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর বংশের সৎকর্মশীলগণই সর্বপ্রথম এই বাড়াবাড়িকে অপছন্দ করে, যা প্রকৃত ভালবাসাকে তার বিপরিতমুখী করে তোলে? চিন্তা করুন, কোন মানুষ যখন কারও প্রশংসা করার ক্ষেত্রে এমন বাড়াবাড়ি করে যা শুনলে প্রত্যেক শ্রোতারই ঘৃণার উদ্রেক করে; তখন কি তা প্রশংসার নামে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও নিন্দা করার নিকটবর্তী নয়?