hadith book logo

শিয়া আলেম ও অধিকাংশ মুসলিম আলেমের মধ্যে বিরোধের বাস্তব চিত্র

লেখকঃ সা‘ঈদ ইসমাঈল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

ইসলামের রুকন ও ঈমানের রুকন

দ্বাদশ ইমামের অনুসারী জা‘ফরীয় আলেমগণ বলেন যে, মুসলিম জাতিকে পরিচালনার জন্য বংশগত প্রথা বা নিয়ম-কানুনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অন্যতম রুকন (ভিত্তি) এবং তার মানগত অবস্থান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মত; যেমনিভাবে তার প্রতি জোর দিয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের দ্বিতীয় ধারায়। সুতরাং জা‘ফরীয় আলেমগণের নিকট ইমামত ঈমানের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ রুকনের নাম, যার মাঝখানে ফেরেশতা এবং তাকদিরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান তথা বিশ্বাসের কথা আসে না। আর শাহাদাতাঈন তথা দুই সাক্ষ্য, সালাত (নামায), সাওম (রোযা) ও হাজ্জের মত এটাও (ইমামত) ইসলামের অন্যতম রুকন। [ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান, দ্বিতীয় ধারা, অনুচ্ছেদ- ৫ ; আসেফী, আস-সালাত, পৃ. ২৩ – ২৫ ; আল-কাফী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১০।]

অন্যদিকে অধিকাংশ মুসলিম আলেম কুরআন অথবা সুন্নাহর মধ্যে ইমামত বা নেতৃত্ব সম্পর্কে শিয়া ধারণার বাস্তবতা না থাকার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন; আর যারা ইসলামে খেলাফত ও শাসন ব্যবস্থায় এবং দীনের বুঝের ক্ষেত্রে ব্যাপক বংশগত শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার উপর বক্তব্য দেন তারা সে বক্তব্যও নাকচ করে দেন। বরং তারা এই বংশগত প্রথা যা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করে, তার সাথে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে তার প্রতি জোর দেন। সুতরাং আল-কুরআনুল কারীম মুমিনদের প্রশংসায় বলে:

﴿ وَٱلَّذِينَ ٱسۡتَجَابُواْ لِرَبِّهِمۡ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَمۡرُهُمۡ شُورَىٰ بَيۡنَهُمۡ وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ ٣٨﴾ [ سورة الشورى : 38]

“যারা তাদের প্রতিপালকের আহ্বানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে এবং তাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।” [সূরা আশ-শূরা: ৩৮।]

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় নবীকে নির্দেশ দিয়ে বলেন:

﴿ فَبِمَا رَحۡمَةٖ مِّنَ ٱللَّهِ لِنتَ لَهُمۡۖ وَلَوۡ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ ٱلۡقَلۡبِ لَٱنفَضُّواْ مِنۡ حَوۡلِكَۖ فَٱعۡفُ عَنۡهُمۡ وَٱسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ وَشَاوِرۡهُمۡ فِي ٱلۡأَمۡرِۖ فَإِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَوَكِّلِينَ ١٥٩ ﴾ [ سورة آل عمران : 159]

“আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলে; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর; আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবে; যারা (আল্লাহর উপর) নির্ভর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৫৯।]

মুসলিম আলেমগণ এই কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেন যে, ইসলামকে পাঁচটি ভিত্তির উপর স্থাপন করা হয়েছে: এই কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য বা ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল; সালাত (নামায) প্রতিষ্ঠা করা; যাকাত প্রদান করা; রমযান মাসে রোযা রাখা এবং বাইতুল্লাহ শরীফে পৌঁছতে সক্ষম ব্যক্তির হাজ্জ পালন করা। [ইয়াহইয়া ইবন শরফুদ্দীন আন-নববী, মিনাল আরবা‘ঈনা আন-নববীয়া ( من الأربعين النووية ), (চল্লিশ হাদিস), পৃ. ৩৫।] যেমনিভাবে মুসলিম আলেমগণ এই কথার উপরও ঐক্যমত পোষণ করেন যে, ঈমানের মূল ভিত্তি হল: আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি এবং পরকাল ও তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। [ইয়াহইয়া ইবন শরফুদ্দীন আন-নববী, মিনাল আরবা‘ঈনা আন-নববীয়া ( من الأربعين النووية ), (চল্লিশ হাদিস), পৃ. ৩০।]

কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি আল-কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করে, তবে সে এমন একটি আয়াতও পাবে না, যা শিয়া আলেমগণ এই বংশগত শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ও আবশ্যকতার ব্যাপারে যে বক্তব্য দেয় তাকে সমর্থন করে। আর যে শিশু তার নবম অথবা অষ্টম বছর বয়সে তার (শাসনব্যবস্থার) উত্তরাধিকারী হবে, ...। আর কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি বিশুদ্ধ সুন্নাহ তথা হাদিস অধ্যয়ন করে, তবে সেও একই ফল দেখতে পাবে। [অর্থাৎ বংশগত শাসনব্যবস্থার অসারতা]

হে মুসলিম ভাই ও বোনেরা! আমাদের জন্য কি আল-কুরআনুল কারীম ও নির্ভরযোগ্য সুন্নাহ থেকে প্রদত্ত সুস্পষ্ট দলিলসমূহ দ্বারা উপস্থাপিত অধিকাংশ মুসলিম আলেমের মতামতকে সত্য বলে মেনে নেয়া উত্তম হবে; নাকি আল-কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহর সাথে বিরোধপূর্ণ শিয়া আলেমদের মতামত ও বক্তব্যের অনুসরণ করাটা উত্তম হবে? এই প্রশ্নের জওয়াব দেয়ার পূর্বে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই যে, আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হল এক আল্লাহ তা‘আলাকে সন্তুষ্ট করা এবং এই নশ্বর পৃথিবীতে মুক্তি ও চিরস্থায়ী পরকালীন জীবনে সফলতার জন্য প্রকৃত সত্য নিয়ে গবেষণা করা।

হে ভাই ও বোনেরা! আমাদের জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য হল, আমরা যাতে ভুলে না যাই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُونُواْ قَوَّٰمِينَ بِٱلۡقِسۡطِ شُهَدَآءَ لِلَّهِ وَلَوۡ عَلَىٰٓ أَنفُسِكُمۡ أَوِ ٱلۡوَٰلِدَيۡنِ وَٱلۡأَقۡرَبِينَۚ إِن يَكُنۡ غَنِيًّا أَوۡ فَقِيرٗا فَٱللَّهُ أَوۡلَىٰ بِهِمَاۖ فَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلۡهَوَىٰٓ أَن تَعۡدِلُواْۚ وَإِن تَلۡوُۥٓاْ أَوۡ تُعۡرِضُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٗا ١٣٥ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا ١٣٦ ﴾ [ سورة النساء : 135 - 136]

“হে মুমিনগণ! তোমারা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীন হোক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না। যদি তোমারা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তার সব খবর রাখেন। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহতে, তাঁর রাসূলে, তিনি যে কিতাব তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন তাতে এবং যে কিতাব তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর; আর কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখেরাত তথা পরকালকে প্রত্যাখ্যান করলে সে তো ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।” [সূরা আন-নিসা: ১৩৫ – ১৩৬।]