hadith book logo

শিয়া আলেম ও অধিকাংশ মুসলিম আলেমের মধ্যে বিরোধের বাস্তব চিত্র

লেখকঃ সা‘ঈদ ইসমাঈল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

সুন্নাত ও হাদিস

জা‘ফরীয়া আলেমগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন এবং নিষ্পাপ শিয়া ইমামগণ যা বলেছে, তাকে সুন্নাহ বা হাদিস বলে বিবেচনা করে। [তাবতাবায়ী, পৃ. ৯৩; ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান, দ্বিতীয় ধারা।] আর আমরা যদি ‘আল-কাফী’ নামক গ্রন্থের প্রতি দৃষ্টি দেই, যে গ্রন্থটিকে আত-তাবতাবায়ী ‘শিয়া জগতের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও প্রসিদ্ধ হাদিসের গ্রন্থ’ বলে বিবেচনা করেছেন [তাবতাবায়ী, পৃ. ১১০।], তবে আমরা দেখতে পাব যে, অধিকাংশ হাদিসের ক্ষেত্রে বলা হয় না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; বরং বলা হয়, ইমাম বলেছেন: এইরূপ এইরূপ। আর অধিকাংশ হাদিসের কোন সনদ নেই।

আর আমরা যখন ঐসব হাদিসের বিষয়বস্তু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি, তখন আমরা তার অধিকাংশগুলোকে আল-কুরআনুল কারীমের সাথে বিরোধপূর্ণ হিসেবে পাই। আর সেখানে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত, যে মানদণ্ডের সুস্পষ্ট গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে হাদিসসমূহের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়, তা মূলত শিয়া দর্শন ও চিন্তাধারাকেই সমর্থন করে অথবা কমপক্ষে তার সাথে বিরোধ করে না। আর শিয়া আলেমদের মধ্য থেকে অন্য দুই এক জনের মত করে আত-তাবতাবায়ী দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, হাদিসে নববীর মধ্যে সেই হাদিসই সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য, যা নিষ্পাপ ইমামদের বর্ণনার পরে উল্লেখ করা হয়; যদিও ইমাম তার এমন উত্তরাধিকার রেখে মারা যান যে, তিনি তার বয়সের নবম বা অষ্টম অথবা পঞ্চম অতিক্রম করেন না। [তাবতাবায়ী, পৃ. ৯৪, ২০৭, ২০৮, ২১০, ২১১।] সুতরাং উদাহরণস্বরূপ এমন হাদিসের কথা বলা যায়, যা আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন এবং ইমাম বুখারী রহ. তা তাঁর সহীহ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেন; অথচ জা‘ফরীয়া আলেমগণ তা প্রত্যাখ্যান করেন, যদি সে হাদিস শিয়া আকিদার সাথে বিরোধপূর্ণ হয়; যেমন: ‘মুত‘আ বিয়ে নিষিদ্ধের হাদিস’। অপরদিকে, যখন হাদিসটি শিয়া মতবাদকে সুদৃঢ় করবে, তখন যিনি বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন, তার দিকে দৃষ্টি না দিয়েই তা খুব দ্রুততার সাথে তারা তা গ্রহণ করবে। [তাবতাবায়ী, পৃ. ৯৪।]

অপরদিকে মুসলিম আলেমগণ সুন্নাহর পরিচয় দেন এইভাবে, ‘সুন্নাহ’ হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, অথবা করেছেন অথবা স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তাঁর সৃষ্টিগত গুণাবলীসমূহ। [আজমী, পৃ. ৩।]

আর সাধারণভাবে সেখানে দু’টি পদ্ধতি রয়েছে, যার উপর অধিকাংশ মুসলিম আলেম হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য নির্ভর করে থাকে:

প্রথমত: বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততার ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জনের জন্য সনদ পরীক্ষা করা। এই জন্য পরিচয়হীন অস্পষ্ট বর্ণনাকারীদের সততা অথবা দোষ-ত্রুটি জানতে অক্ষম হলে বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত হাদিসসমূহ প্রত্যাখ্যান করা হয়।

দ্বিতীয়ত: হাদিসের মতন পরীক্ষা করা, যাতে তার বক্তব্য কুরআন অথবা সনদের দিক থেকে শক্তিশালী অপরাপর হাদিসমূহের বিপরীত না হয় ...। [আজমী, পৃ. ৩২ – ৭২।]

সনদের এই মানদণ্ডে হাদিসসমূহ নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হাদিস বিশেষজ্ঞগণ একমত পোষণ করেছেন যে, সুন্নাতে নববীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য দু’টি গ্রন্থ হল সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম। [ফাতাওয়া, খণ্ড (১৭), পৃ. ১৮ এবং আজমী, পৃ. ৮৭, ৯৬ ।]

যেমনিভাবে আমরা জানতে পারলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর পরই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আল-কুরআনুল কারীম এক খণ্ডে সংকলন সমাপ্ত হয়েছে; কিন্তু ইলমে হাদিসের সংকলন শুরু হয়েছে হিজরি প্রথম শতকের একেবারে শেষের দিকে। [আজমী, পৃ. ২৫।] আর এই সংকলনের পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে; তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, হাদিস শাস্ত্র বিস্তারিতভাবে ইসলামী শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং তাকে একটি সমন্বিত অবকাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার অনুকরণ ও অনুসরণ করা মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার দৈনন্দিন জীবনে বিশেষ ও সাধারণভাবে আবশ্যক; এমনকি আল্লাহর সাথে ও জনগণের সাথে তার (মুসলিম ব্যক্তির) নিবিড় সম্পর্কের প্রয়োজনেও তার অনুকরণ জরুরী। জীবনের সাথে সুন্নাতে নববীর সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুমের প্রচণ্ড আগ্রহ থাকার কারণে বাস্তব ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন হাদিসের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং তার বড় উৎস। আর এ কারণেই সেই যুগে বহু খণ্ডে হাদিস সংকলনের খুব বেশি প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তাছাড়া কিছু সংখ্যক বড় মাপের সাহাবী কুরআনের সাথে হাদিসের মিশ্রণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য প্রথম দিকে আল-কুরআনুল কারীম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অভিমত ব্যক্ত করতেন; যে ধরনের মিশ্রণ ঘটেছিল তাওরাত এবং ইঞ্জিলে।

হে আমার ভাই ও বোনেরা! আসুন, আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করি, বিশেষভাবে (সুন্নাত ও হাদিসের দুই পক্ষ থেকে প্রদত্ত) দু’টি সংজ্ঞার কোন সংজ্ঞাটি অধিক সত্য ও বাস্তব? যখন আমরা জানি যে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশেষ নবী; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ ﴾ [ سورة الأحزاب : 40]

“মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন; বরং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।” [সূরা আল-আহযাব: ৪০।]

সুতরাং তাঁর পরে কারো পক্ষে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ওহী লাভ করা সম্ভব নয় এবং সমীচীনও নয়। কারণ, আল্লাহ প্রদত্ত ওহী নবী ও রাসূলদের জন্য নির্ধারিত। আর শিয়া আলেম যখনই রাসূলের কথা ও শিয়া ইমামদের কথাকে এক পাল্লায় ওজন করে, তখন সে যেন বলতে চায়, ইমামগণও নবী ও রাসূলদের মত আল্লাহ প্রদত্ত ওহী লাভ করে; আর এর (এই চিন্তার) মধ্যে কুরআনের সাথে সুস্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। আর যখন কথাটি এমন হয় যে, ঐসব ইমামগণ শুধু ইলহাম প্রাপ্ত হন, তাহলে তো ইলহাম এক জিনিস, আর ওহী হল আরেক জিনিস। সুতরাং ওহীর অনুসরণ আবশ্যক; আর ইলহামের মধ্যে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ রয়েছে এবং তার অনুসরণ বাধ্যতামূলক নয়। তাছাড়া নবী ও রাসূলগণ কর্তৃক প্রাপ্ত ইলহাম ওহীরই অংশবিশেষ।