hadith book logo

সালাতে একাগ্রতা অর্জনের ৩৩টি উপায়

লেখকঃ শাইখ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

সালাতে চোখ বন্ধ রাখার বিধান

কতক মুসল্লির অন্তরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় যে, সালাতে চোখ বন্ধ করে রাখার বিধান কী, বিশেষভাবে যদি এরূপ করার কারণে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়?

উত্তর: সালাতে চোখ বন্ধ রাখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত সুন্নতের বিপরীত, পূর্বের আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়েছে। অধিকন্তু চোখ বন্ধ রাখলে সাজদার জায়গায় নজর দেওয়া ও আঙ্গুল দেখার সুন্নত ছুটে যায়।

মাসআলাটিতে আরো একটু ব্যাখ্যা আছে, দেখি মীমাংসক আলেমগণ কী বলেছেন, বিশেষভাবে আবু আব্দুল্লাহ ইবনুল কাইয়্যেম রহ. । তিনি বিষয়টি কীভাবে সুরাহা ও সমাধান করেছেন সেটাই এখানে পেশ করব। তিনি বলেছেন: “সালাতে দু’চোখ বন্ধ রাখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের বিপরীত। উল্লিখিত একাধিক হাদীস থেকে জেনেছি যে, তিনি তাশাহহুদের সময় ইশারার আঙ্গুলে চোখ রাখতেন এবং তার চোখ তার ইশারাকে অতিক্রম করত না।

আরো অনেক দলিল রয়েছে চোখ বন্ধ না রাখার, যেমন কুসুফের সালাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জান্নাত দেখে আঙ্গুরের ছড়া ধরতে হাত বাড়ানো; সালাতে জাহান্নাম দেখা; জাহান্নামে বিড়ালওয়ালী ও হাতুড়িওয়ালাকে দেখা; তার সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী চতুষ্পদী জন্তুকে বাঁধা দেওয়া; ছেলে ও মেয়েকে ঠেকানো এবং দুই মেয়ের মাঝে তার আড়াল হয়ে দাঁড়ানো; সালামদাতাকে ইশারা করে উত্তর দেওয়ার একাধিক হাদীস চোখ বন্ধ না রাখার প্রমাণ, কারণ তিনি সালামদাতাকে চোখে দেখেই ইশারা করতেন; অনুরূপ শয়তানকে তাড়া করা, তাকে পাকড়াও করে গলা চেপে ধরা প্রভৃতি ঘটনা তার চোখের দেখা। এসব ঘটনা ও অন্যান্য দলিল থেকে প্রতীয়মান হয় তিনি সালাতে দু’চোখ খোলা রাখতেন।

সালাত আদায় করাবস্থায় চোখ বন্ধ রাখা ‘মাকরূহ’ কি—না আলিমগণ মতভেদ করেছেন। ইমাম আহমদ ও অন্যান্য ফকিহ বলেন, ‘সালাতে চোখ বন্ধ রাখা ইয়াহূদীদের আমল।’

আরেক দল আলেম বলেন, ‘সালাতে চোখ বন্ধ রাখা বৈধ, মাকরূহ নয়।’

সঠিক উত্তর হলো, যদি চোখ খোলা রাখলে একাগ্রতায় ব্যাঘাত না ঘটে তবে খোলা রাখা উত্তম। আর যদি কেবলার দিকের কারুকার্য ও সাজ-সজ্জা কিংবা অন্য কিছু মুসল্লি ও তার খুশুর মাঝে প্রতিবন্ধক হয় এবং তার অন্তরকে ব্যস্ত ও অন্যমনস্ক করে রাখে, তাহলে চোখ বন্ধ রাখা মাকরূহ নয়। এমতাবস্থায় শরীয়তের নীতি ও উদ্দেশ্যের আলোকে চোখ বন্ধ রাখা মাকরূহ বলার চেয়ে মোস্তাহাব বলা অধিক সঙ্গত। আল্লাহ ভালো জানেন।” [ইবনুল কাইয়্যেম প্রণীত ‘যাদুল মাআদ’: ১/২৯৩। প্রকাশক, ‘দারুর রিসালাহ’।] ইবনুল কাইয়্যেম থেকে আহরণকৃত অংশ শেষ হলো।

উক্ত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হলো যে, সালাতে চোখ বন্ধ না রাখাই সুন্নত, তবে খুশু বিনষ্টকারী বস্তুর অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্যে চোখ বন্ধ করা মাকরূহ নয়।

১১. তাশাহহুদে শাহাদাত অঙ্গুলি নাড়ানো। অনেক মুসল্লি তাশাহহুদের বৈঠকে শাহাদাত আঙ্গুল নাড়ানোর সুন্নতটি ছেড়ে দিয়েছেন, অথচ খুশু তৈরিতে তার বিরাট ভূমিকা রয়েছে, আর অনেক ফযীলত তো আছেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لهي أشد على الشيطان من الحديد» .

“অঙ্গুলির হরকত শয়তানের ওপর লোহার (আঘাতের) চেয়ে কঠিন।” [ইমাম আহমদ সংকলিত ‘মুসনাদ’: ২/১১৯; তিনি হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন। দেখুন ‘সিফাতুস সালাত’: পৃ.১৫৯৯।]

আহমদ সাআতি হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেন, “তাশাহহুদে শাহাদাত আঙ্গুলের ইশারা শয়তানের উপর লোহার আঘাতের চেয়ে কঠিন। কারণ, ইশারা বান্দাকে আল্লাহর তাওহিদ ও ইখলাস স্মরণ করিয়ে দেয়, যা শয়তানের নিকট সর্বাধিক কষ্টের। আল্লাহর নিকট তার থেকে পানাহ চাই।” [আহমদ সাআতি প্রণীত ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’: ৪/১৫।]

ইশারা করার অনেক ফযীলত বলেই সাহাবীগণ একে অপরকে তার উপদেশ দিতেন, যত্নসহ ইশারা করতেন এবং কারো থেকে ছুটে যাচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণ করতেন, অথচ বর্তমান যুগে অনেক মুসল্লি শুধু ঢিলেমি ও অবহেলাবশত সেটা ত্যাগ করে চলেছেন। ইবন আবি শায়বাহ রহ. বর্ণনা করেন,

«كان أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم يأخذ بعضهم على بعض . يعني : الإشارة بالأصبع في الدعاء» .

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ একে অপরের ভুল ধরতেন। অর্থাৎ দো‘আর সময় আঙ্গুলের ইশারা না করাকে ভুল গণ্য করতেন।” [আলবানি প্রণীত ‘সিফাতুস সালাত’, পৃ.১৪১; তিনি বলেছেন, “হাদীসটি ইবন আবি শায়বাহ হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন।” আরো দেখুন মুদ্রিত ‘মুসান্নাফ’ ইবন আবি শায়বাহ, খণ্ড ১০, হাদীস নং ৯৭৩২, পৃ.৩৮১। দারুস সালাফিয়া ইন্ডিয়া।]

ইশারা করার সুন্নত হচ্ছে, পুরো তাশাহহুদ জুড়ে আঙ্গুল উঠিয়ে কেবলা মুখী করে নাড়তে থাকা।