hadith book logo

ইসলামের দৃষ্টিতে দুর্নীতি প্রতিরোধ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

লেখকঃ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

দুর্নীতি সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিঃ

ইসলামের দৃষ্টিতে নীতিবিরুদ্ধ যে কোনো কাজই দুর্নীতি এবং মারাত্মক অপরাধ। দুর্নীতি প্রতিরোধ প্রসংগে ইসলাম দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে থাকে। কোন ব্যক্তি হয়ত এ চেতনায় দুর্নীতি করে যে, তার অপরাধের কোন সাক্ষী নেই অথবা তার বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য প্রদানে সাহস করবে না অথবা কোন ব্যক্তি বা সম্পর্কের মাধ্যমে ও প্রভাবে সে দুর্নীতি অপরাধ হতে অব্যাহতি লাভে সমর্থ হবে। আর যদি শাস্তি হয়েই যায় তবে তা কৃত অপরাধ বা সে যে পরিমাণ দুর্নীতি করেছে,তার চেয়ে কম হবে। [গাজি শামছুর রহমান, ইসলামের দন্ড-বিধি (ঢাকা : ইসলামামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯২ খৃ.) পৃ. ৪৫।] আল্লাহ তা‘আলাকে যে ভয় করে এবং আখিরাতের প্রতি যার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে, সে কখনও দুর্নীতি করতে পারে না। এ বিশ্বাসই তাকে দুর্নীতি হতে ফিরায়ে রাখে। কারণ সে বিশ্বাস করে যে , গাঢ় অন্ধকার বা কোন নিভৃত জায়গা বা প্রকোষ্ঠে বা ক্ষমতা অথবা দাপট দেখিয়ে দুর্নীতি করলেও তা এ পৃথিবীর কোন কিছুই তার দৃষ্টির বাইরে নয়। দুনিয়ার দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ বা লোক চক্ষুকে ফাঁকি দিতে পারলেও আল্লাহ তা‘আলার নিযুক্ত বাহিনীকে সে কখনও ফাঁকি দিতে পারবে না। সুতরাং দুনিয়ার শাস্তি হতে রেহাই পেলেও আখেরাতের শাস্তি তার জন্য অবধারিত। শুধু তাই নয়, তার দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে ও প্রতিটি কাজের রেকর্ড রাখা হচ্ছে। তাই দুনিয়ার শাস্তি হতে অব্যাহতি পেলেও পরকালে সে অবশ্যই ধৃত হবে। [প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫-৪৬।] এ বোধ ও ঈমানী চেতনাই মানুষকে দুর্নীতি হতে ফিরিয়ে রাখে। তারপরও যদি সে দুর্নীতি করে তখন ইসলাম দুর্নীতির প্রকৃতি ও এর সাথে সংশ্লিষ্ঠ সকল বিষয় বিবেচনা করে শাস্তির ব্যবস্থা করে। এজন্য ইসলাম প্রথমত ব্যক্তির মন-মানসিকতায় এ প্রত্যয় সৃষ্টি করে যে, যত সংগোপনে দুর্নীতি করুক না কেন, আল্লাহ তা‘আলা তা দেখছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ أَمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّا لَا نَسۡمَعُ سِرَّهُمۡ وَنَجۡوَىٰهُمۚ بَلَىٰ وَرُسُلُنَا لَدَيۡهِمۡ يَكۡتُبُونَ ٨٠ ﴾ [ الزخرف : ٨٠ ]

‘‘তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? অবশ্যই রাখি, আমার নিয়োজিত ফেরেশতাগণ তো তাদের নিকট থেকে সব কিছু লিপিবদ্ধ করে।’’ [আল-কুরআন, ৪৩:৮০।](সূরা যুখরুফ:৮০)

এ সম্পর্কে আল-কুরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে,

﴿ هَٰذَا كِتَٰبُنَا يَنطِقُ عَلَيۡكُم بِٱلۡحَقِّۚ إِنَّا كُنَّا نَسۡتَنسِخُ مَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٢٩ ﴾ [ الجاثية : ٢٩ ]

‘‘এটা আমার কিতাব, যা তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে, সত্যতা সহকারে। তোমরা যা করতে তা আমি লিপিবদ্ধ করেছিলাম।’’ [আল-কুরআন, ৪৫: ২৯।](সূরা আল যাছিয়া:২৯)

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী,যারা দুনিয়ায় আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে না, আখিরাতের জবাবদিহিতা বিশ্বাস করে না, তারা এ পৃথিবীর জীবন ছাড়া আর কিছুই নেই বলে মনে করে এবং এ বিশ্ব সম্পদ, জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা লাভের উপর ভিত্তি করে জীবনের সফলতা বা বিফলতা নির্ধারণ করে। তারা অনেকাংশে উচ্ছৃংখল পশুর মত জীবন-যাপন করে এবং নীতি নৈতিকতার কোন পরোয়া করে না। তাদের নৈতিক মূল্যবোধ নিজ ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। হীন লক্ষ্য যা অর্জনের জন্য তারা যে কোন ধরনের দুর্নীতি সংঘটনে পিছপা হয় না। এ সকল লোকের দুর্নীতি ও কুকর্মে সমগ্র পৃথিবী অন্যান্যদের জন্যে নরকে পরিণত হয়। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

﴿ ظَهَرَ ٱلۡفَسَادُ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِي ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعۡضَ ٱلَّذِي عَمِلُواْ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٤١ ﴾ [ الروم : ٤١ ]

‘‘মানুষের কৃতকর্মের দরুণ সমুদ্রে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়ায়ে পড়ে। যার ফলে তাদের কোন কোন কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করাবেন। যাতে তারা ফিরে আসে। [আল-কুরআন, ৩০:৪১।]( সূরা আর রুম:৪১) ।

যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার পথ থেকে দূরে সরে গেছে এবং পরকালীন জীবনকে বিশ্বাস করে না। সে অন্যান্য দিক দিয়ে বড় হলেও পশুর মত জীবন-যাপন করে। কেননা সে কেবলমাত্র পৃথিবীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ, লোভ-লালসা এবং সুযোগ-সুবিধাকেই প্রাধান্য দেয়। এ হীন মানসিকতাই তাকে নৈতিক মূল্যবোধ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَلَقَدۡ ذَرَأۡنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلۡجِنِّ وَٱلۡإِنسِۖ لَهُمۡ قُلُوبٞ لَّا يَفۡقَهُونَ بِهَا وَلَهُمۡ أَعۡيُنٞ لَّا يُبۡصِرُونَ بِهَا وَلَهُمۡ ءَاذَانٞ لَّا يَسۡمَعُونَ بِهَآۚ أُوْلَٰٓئِكَ كَٱلۡأَنۡعَٰمِ بَلۡ هُمۡ أَضَلُّۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡغَٰفِلُونَ ١٧٩ ﴾ [ الاعراف : ١٧٩ ]

‘‘আমি বহু জিন ও মানুষের জন্যে জাহান্নাম তৈরী করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তদ্বারা তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চক্ষু আছে, তদ্বারা তারা দেখে না। এবং তাদের কর্ণ আছে, তদ্বারা তারা শ্রবণ করে না। এরা পশুর মত বরং তদপেক্ষা আরও পথভ্রষ্ট। এরাই বিপথগামী।’’ [আল-কুরআন, ৭:১৭৯।](সূরা আল আ‘রাফ:১৭৯ )

সুতরাং যে ব্যক্তি তার পরকালীন জীবনে হিসাব দেয়াকে মানে না। ভাল কাজের পুরস্কার এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তির ফায়সালায় বিশ্বাস করে না। তাকে দুর্নীতি ও অশ্লিল কাজ হতে কে রক্ষা করবে? অধঃপতনের অতল গহবরে নিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য। পরিশেষে একথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ভয় এবং পরকালে তার নিকট জবাবদিহির অনুভূতিই মানুষকে সকল প্রকার দুর্নীতি হতে রক্ষা করতে পারে।’’ [গাযী শামছুর রহমান, ইসলামের দন্ড-বিধি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮।]

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে দু্র্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন আল্লাহ তা‘আলার ভয় এবং আখিরাতের দৃঢ় চেতনা। কারণ আখিরাতের জবাবদিহিতে যে বিশ্বাস করে, দুর্নীতির সুযোগ থাকলেও সে কখনও এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হবে না।