hadith book logo

সাহাবায়ে কেরামের অবস্থান ও মর্যাদার বিষয়ে আহলে সুন্নাতের আকীদা-বিশ্বাস

লেখকঃ ড. মো: আমিনুল ইসলাম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

চতুর্থ অধ্যায়: সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত ঘটনা নিয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থাকা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إذا ذكر أصحابي فامسكوا، وإذا ذكر القدر فامسكوا، وإذا ذكر النجوم فامسكوا» .

“যখন আমার সাহাবীগণকে নিয়ে সমালোচনা হবে, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে। আর যখন তাকদীর নিয়ে আলোচনা হবে, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে আর যখন তারকারাজি তথা জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা হবে, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে।” [তাবারানী, আল-কবীর: ২/৭৮; আবু না‘ঈম, আল-হিলইয়া: ৪/১০৮; আর আল-ইমামা এর মধ্যে বর্ণিত আছে, ইবনু মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর হাদীস থেকে এবং আলবানী কয়েকটি সনদের মাধ্যমে বর্ণনাটিকে শক্তিশালী করেছেন; আস-সিলসিলাতুস সহীহা: ১/৩৪]

আর এ জন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নীতি হলো সাহাবীগণের ভুল-ত্রুটি আলোচনা এবং তাদের বিচ্যুতি বা পদস্খলনের বিষয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থাকা, আর তাদের মধ্যকার সংঘটিত বিতর্কের মধ্যে ডুবে না থাকা।

আবু না‘য়ীম রহ. বলেন, “সুতরাং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের ভুল-ত্রুটি আলোচনা এবং তাদের বিচ্যুতি বা পদস্খলনের বিষয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থাকা, তাদের ভালো ও সুন্দর দিকসমূহ এবং তাদের গুণাবলী ও কৃতিত্বসমূহ প্রকাশ করা, আর তাদের কর্মকাণ্ডসমূহকে অনিবার্য কারণের দিকে ফিরিয়ে দেওয়াটা তাদেরকে যথাযথ অনুসরণকারী মুমিনদের লক্ষণ, যাদের প্রশংসা করেছেন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে:

﴿وَٱلَّذِينَ جَآءُو مِنۢ بَعۡدِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا وَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَا بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَا تَجۡعَلۡ فِي قُلُوبِنَا غِلّٗا لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٞ رَّحِيمٌ ١٠﴾ [ الحشر : ١٠ ]

“আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]

তিনি নির্দেশিত হাদীসের ব্যাখ্যায় আরও বলেন: “তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের ভালো ও সুন্দর দিকসমূহ এবং তাদের মর্যাদা ও ফযীলতসমূহ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন নি। তাদেরকে শুধু তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং রাগজনিত উত্তেজনার সময় তাদের থেকে যেসব বাড়াবাড়ি হয়েছে, তার সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” [আল-ইমামা, পৃষ্ঠা ৩৪৭]

হাদীসে নির্দেশিত বিরত থাকার মানে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিরত থাকা, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের মধ্যকার সংঘটিত যুদ্ধসমূহ ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে ডুবে না থাকা‌ এবং বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা না করা আর এ বিষয়গুলো সাধারণ জনগণের মাঝে প্রকাশ না করা অথবা এক দলের দোষ ধরা এবং অপর দলের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের পিছনে না লাগা। [মুহাম্মদ ইবন সামেল আল-‘আলইয়ানী আস-সুলামী, মানহজু কিতাবাতিত্ তারিখিল ইসলামী: পৃষ্ঠা ২২৭, ২২৮]

আর আমাদেরকে পূর্বে যা অতিবাহিত হয়েছে, সে বিষয় আলোচনার নির্দেশ দেওয়া হয় নি; বরং আমাদেরকে শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে, তাদেরকে ভালোবাসতে এবং তাদের সৌন্দর্যপূর্ণ দিক ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকাশ করতে; কিন্তু যখন কোনো বিদ‘আতপন্থী আত্মপ্রকাশ করে তাদের ব্যাপারে অপবাদ দেয়, তখন জরুরি ভিত্তিতে তাদেরকে সে অপবাদ থেকে রক্ষা করা এবং ইলম ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে এমন বিষয় আলোচনা করা, যা তার যুক্তিকে অসার করে দিবে তা বর্ণনা করা অপরিহার্য। [মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/২৫৪, সম্পাদনা: ড. রাশাদ সালেম।]

আর এটি এমন একটি বিষয়, আমাদের সময়ে আমরা যার প্রয়োজন অনুভব করি, যেমন মুসলিম জাতিকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও মদরাসাসমূহে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে এমন কতগুলো সিলেবাসের মাধ্যমে, যা তার সৃজনশীল ও শিক্ষা সম্পর্কিত কতৃপক্ষের চিন্তার ফসল। তারা সাহাবীগণের মাঝে সংঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার মাঝে ডুবে থাকে অন্যায়ভাবে, কোনো প্রকার আদব-কায়দার তোয়াক্কা না করেই, যা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।

অনুরূপভাবে আফসোসের বিষয় হলো, এ শত্রুতামূলক আচরণ কোনো কোনো ইসলামপন্থী ব্যক্তির মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে, এমনকি তাদের কেউ কেউ সাহাবীগণের মধ্যে সংঘটিত বিশৃঙ্খলাকে কেন্দ্র করে বর্ণিত বর্ণনাসমূহ থেকে বাজে বর্ণনা কিংবা দামী কথা সংগ্রহ করে, অতঃপর সে বিশেষজ্ঞ ইমামদের কথা ও তাদের বিশ্লষণসমূহের কোনো প্রকার সঠিক দিকনির্দেশনা তোয়াক্কা না করেই সেগুলোর উপর ভিত্তি করে সাহাবীগণের ব্যাপারে হুকুম দেওয়া আরম্ভ করে দেয়, এ জন্যই আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি যে, আমরা এমন কিছু মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করব, যেগুলো একজন গবেষকের জন্য জেনে নেওয়া উচিত হবে, যখন তিনি সাহাবীগণের মাঝে সংঘটিত বিষয় নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন অনুভব করবেন।