hadith book logo

ফেরারী নারী

লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

অবাধ পেশা ও একজন ফেরারী নারী সাংবাদিকের গল্প

নারীদের পেশার অবারিত ও অপ্রতিরোধ্য বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি করেছে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। বহিঃবিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশেও চলছে সব পেশায় নারীকে প্রতিষ্ঠিত ও অধিষ্ঠিত করার অদম্য প্রতিযোগিতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসহায়ত্ব ও আর্থিক দুর্বলতার সুবাধে পেশায় যুক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা পেশায় আসছে অপ্রয়োজনে এবং ‘পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেই উপার্জন করতে হবে’ এই মানসিকতা নিয়ে। এই মানসিকতা নারীর ভ্যানিটি ব্যাগে কিছু অর্থের সংস্থান করলেও তারা যে কী সম্পদ হারিয়েছে তা একবারও ভেবে দেখার দরকার মনে করে নি।

দরকার মনে করবেই বা কেন? অর্থলোভী মুনাফাখোররা নারীদের মনে এই চিন্তা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম ও সফল হয়েছে যে, সতীত্বে নারীত্ব নয়; নারীত্ব ও নারীর মর্যাদা পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দেয়ায়, তাদের কাঁধে কাঁধ রেখে চলায়। এই খ্যাপাটে ভাবনা ও মানসিকতা বাংলাদেশে সবচেয়ে বিস্তৃত হয়েছে মিডিয়া অঙ্গনে। মিডিয়া জগতে নারীর অবাধ বিচরণ দেখলে সন্দেহ লাগে; এগুলো দ্বিতীয় গার্মেন্টস সেক্টর কিনা! এই অঙ্গনে নারীদের আসাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খোদ নারীরাই। ইসলামী সমাবেশে এক নারী সাংবাদিককে তৌহিদি জনতার কেউ কেউ শালীন পোশাকে এবং পুরুষদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর তাতেই ক্ষেপে গিয়েছিলেন এদেশের নারীবাদীরা! ‘নারীদের মানসম্মান ও অধিকার গেলো রে’ বলে হইচই জুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সতর্ককরণ যে মানবিক দিক বিবেচনায়, তা এই নারীবাদীরা মানতে নারাজ। তারা নারীদেরকে উস্কে দিতে পারে বটে, কিন্তু পারে কি সতীত্ব-সম্ভ্রমহারা নারীর সতীত্ব ফিরিয়ে দিতে? একজন নারীর জন্য অর্থোপার্জন করা বৈধ বটে কিন্তু তাই বলে তাদের জন্য সব ধরনের পেশা যে নিরাপদ নয়, তা বুঝিয়ে দিলেন এক নারী সাংবাদিক তার নারীত্বের দাম চুকিয়ে।

কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটে আটক করা হয় ঢাকার এক তরুণী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিককে। ঘটনার উৎস সম্পর্কে জানাতে গিয়ে তিনি নিজে দাবি করেছেন, ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে বিক্রি করা হয়েছিল তাকে। সেখানে একটি ঘরে তাকে আটকে রাখা হয়। তবে এক সহৃদয় যুবকের সহায়তায় তিনি পশ্চিমবঙ্গে ফিরে গিয়েছেন। পুলিশ বলছে, সন্দেহ হওয়ায় তারা তাকে সোমবার বালুরঘাট স্টেশন থেকে আটক করে। তার কাছে বাংলাদেশের কোন পাসপোর্ট বা ভিসা পাওয়া যায় নি। ফলে তাকে মালদহের একটি হোমে রাখা হয়। তরুণীটি জানিয়েছেন, তার নাম বর্ষা চৌধুরী। ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের বাণিজ্য বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কিছুদিন একটি অপরাধ বিষয়ক পত্রিকায় কাজ করেছেন। পরে তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করছিলেন।

বর্ষা (১৭) পুলিশকে জানিয়েছেন, ১৫ দিন আগে ঢাকা থেকে চার বান্ধবী এবং তিন বন্ধু মিলে যশোরে বেড়াতে গিয়েছিলেন তারা। সেখান থেকেই ইছামতি নদীতে নৌবিহারে বের হওয়ার প্রস্তাব করে সুজন ও মনির। একপর্যায়ে তারা ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে যাওয়ার পর বন্ধু সুজন প্রস্তাব দেয় ভারতের গুজরাটের আমেদাবাদে তার আপন মামা থাকেন। সেখানেই তারা যাবেন। এই প্রস্তাবে বর্ষা প্রথমে আপত্তি করলেও পরিস্থিতি অনুকূলে নয় বুঝতে পেরে রাজি হয়ে যান। হাওড়া হয়ে বর্ষাদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রথমে আমেদাবাদে। সেখান থেকে রাজস্থানের জয়পুরের একটি হোটেলে। সেখানে ২০ হাজার রুপিতে তাকে বিক্রি করে দিয়ে সুজন-মনির চম্পট দেয়। বর্ষাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। সেখানে তিনি যা হারানোর সবই হারান। হারান জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সতীত্ব।

সব হারানোর পর হোটেলের বাঙালি এক কেয়ারটেকারের সাহায্যে পালিয়ে হাওড়া হয়ে হাওড়া-বালুরঘাট তেভাগা এক্সপ্রেসে করে দক্ষিণ দিনাজপুর হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পথেই বর্ষা বাংলাদেশী বলে কোনো একজন যাত্রীর সন্দেহ হয়। ওই যাত্রী স্থানীয় পুলিশকে খবর দেন। বালুরঘাট স্টেশনে নামলেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে বর্ষাকে। বালুরঘাট থানা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বর্ষার সঙ্গে আরও তিন বন্ধুর নাম ও পরিচয় উদ্ধার করা হয়। বর্ষার সঙ্গে আসা আরও তিন তরুণীর খোঁজে পুলিশ গুজরাট ও রাজস্থান যাওয়ার পরিকল্পনা করে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ডিএসপি উত্তম ঘোষ জানান, বাংলাদেশী ওই তরুণীকে মালদার একটি হোমে পাঠানো হয়েছে। পুরো ঘটনা শুনে সত্যিই অবাক হয়েছি আমরা। গত এক বছরে এমন বেশ কয়েকজন শিক্ষিতা মেয়ে নানাভাবে প্রতারিত হয়ে ভারতে পাচার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্তারা। আরও জানা গেছে, ঢাকার রায়েরবাগের বাসিন্দা বর্ষা চৌধুরী। তিনি অপরাধ বিষয়ক পত্রিকা ‘সরেজমিন’-এ কাজ করেছেন কয়েক মাস। সম্প্রতি সে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। সর্বশেষ ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছিলেন।

উত্তম ঘোষণার কথাটা আমাদের ভাবা দরকার। তিনি স্বীয় অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, মাত্র কিছুদিনের মধ্যে অনেক শিক্ষিত মেয়েকে ভারতে পাচার করা হয়েছে। তিনি তো শুধু ধরা পড়া মেয়েদের তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু যারা ধরা পড়েন নি, যাদেরকে চাকরি দেয়ার কথা বলে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সুদূর সীমানায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে তাদের খবর কি কেউ রেখেছে? এভাবে নারীরা পেশা গ্রহণ করতে গিয়ে দুঃসাহসী হয়ে উঠছে এবং বিশ্বের যে কোনো প্রান্তরে কাজ করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে।

তারা একথা বোঝার চেষ্টা করেনি যে, তাদেরকে এক হাতে পেশায় আহ্বান করা হলেও অপর হাত দিয়ে ইশারা করা হয়েছে ভোগের খামারে নাম লেখাতে। আজ পেশাদারিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে কত নারীকে যে কতভাবে ভোগের শিকার হতে হচ্ছে তার ইয়াত্তা নেই। একবার পেশার খাতায় নাম লেখার পর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি নারীত্বের স্বকীয় মর্যাদায়। এভাবে প্রতিনিয়ত মুখ বুজে সহ্য করতে হয় নিজের নারীত্বের অবমাননা। সতীত্ব যাবে, মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে কিন্তু তবু রক্ষা করতে হবে পেশার সম্মান। নিজের সম্মান ডুবানো যাবে, কিন্তু পেশার অসম্মান করা যাবে না!