hadith book logo

শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

লেখকঃ ড. হুসাইন আহমাদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

সুন্দর নাম পাবার অধিকার

নাম একটি জাতির স্বকীয়তা ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম হাজলিটের (William Hajlitt) সাবলীল বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন:

A mane fast anchored in the deep abyss of time is like a star twinkling in the firmament cold, distant, silent, but eternal and sublime.” [. Willian Hajlitt. Ibid]

নাম কালের অতল তলে আবদ্ধ নোঙর, যেন দূর নীলিমায় মিটিমিটি তারকা, শান্ত, সুদূর সমাহিত; কিন্তু শাশ্বত সুউন্নত। একটি সুন্দর বা উত্তম নাম পাওয়া প্রতিটি সন্তানের পিতা-মাতা তার হক বা অধিকার হিসেবে শরিয়ত স্বীকৃতি দেয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)এ প্রসঙ্গে এক হাদীস উল্লেখ করেন:

রাসূল (সা) বলেছেন, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের হক হচ্ছে প্রথমত: তিনটি

জন্মের পরে তার জন্য একটি উত্তম নাম রাখতে হবে।

জ্ঞান বুদ্ধি হলে তাকে উত্তম শিক্ষা দিতে হবে।

পূর্ণবয়স্ক হলে তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। [. ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী প্রকাশিত গণশিক্ষা শীর্ষক পুস্তক, পৃ. ১০৩।]

ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে তিনি বলেন, তারা বললো, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা অবগত হয়েছি যে, পিতার হক কি; কিন্তু সন্তানের হক কি? তিনি বললেন, পিতা (সন্তানকে) সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা প্রদান করবে। [. বাযহাকী, এ হাদীসটিকে কেউ কেউ দুর্বল বর্ণনা মনে করলেও বক্তব্যের দিক থেকে এ সংক্রান্ত মৌলিক বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় গ্রহণীয় হতে পারে।]

ইবন আববাস ও আবু সাঈদ (রা.) অন্যত্র বর্ণনা করেন-রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, যার সন্তান জন্মগ্রহণ করে সে যেন সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা দেয় এবং সাবালক হলে তার বিয়ে দেয়। [. প্রাগুক্ত।]

ইসলামে নামের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাওআলা প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম তাকে নামই শিক্ষা দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

﴿وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلۡأَسۡمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمۡ عَلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِ‍ُٔونِي بِأَسۡمَآءِ هَٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣١﴾ [ البقرة : 31]

‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমুদয় ফিরিশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও।’ [. আল-কুরআন, ২:৩১] পরবর্তী আয়াতে দেখা যায় এরপর ফেরেস্তাদের কাছে এ সকল জিনিসের নাম জানতে চাইলে তারা অজ্ঞতা প্রকাশ করে। তখন আদম (আ.)কে জিজ্ঞাস করলে তিনি তা বলে দেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাওআলা আদম (আ.) কে ফেরেস্তাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। [. আল-কুরআন, ২:৩৩।] নামের গুরুত্ব বুঝা যায় যখন সকল কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণের নির্দেশ আসে। এর মধ্যে কিছু কাজ আছে যা আল্লাহর নামে শুরু করা ফরজ। যেমন, সালাত, তায়াম্মুম ও পশু যবেহ ইত্যাদি। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ এসেছে এভাবে:

‘‘আপনি আপনার প্রতিপালকের নাম স্বরণ করুণ এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন থাকুন। [. আল-কুরআন, ৭৩:৮।] তাফসীরকারদের মতে এ আয়াতে তাকবীরে তাহরীমার কথা বলা হয়েছে, যার আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা ফরজ। শুধু কি কাজের আগেই বরং পবিত্র কুরআনে নাযিলকৃত প্রথম আয়াতের নির্দেশও ছিল মহান আল্লাহ্ তাআলার নামে পাঠ করার। যেমন এরশাদ হয়েছে:

﴿ ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ﴾ [ العلق :8]

‘‘পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে। [. প্রাগুক্ত, ৯২:১।] এতে বুঝা গেল যে, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ শুরুর আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ ফরজ। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আল্লাহর নাম উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। হাদীস শরীফের সূত্রে আহকামুল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- খাবার সময় বান্দাহ যদি আল্লাহর নাম উচ্চরণ করে, তাহলে শয়তান তার সাথে খেতে বসতে পারে না। আর নাম উচচারণ না করলে অবশ্যই তার খাবারে শয়তান শরীক হবে। মুশরিকরা তাদের কাজ-কর্ম শুরু করে তাদের দেব-দেবী মূর্তির নামে, যাদের তারা পূজা করে, ওদের বিরোধিতা করা হবে যদি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে কাজ শুরু করা হয়। [. আল্লামা আবু বকর আহমাদ আল-জাস্সাস(র.) , আহকামুল কুরআন, খ. ১, অনুবাদ মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, (ঢাকা: ইফাবা, খৃ. ১৯৮৮), পৃ. ২৩।]

সুতরাং নাম কোন ক্ষুদ্র বিষয় নয়, যে রাখতে হয় তাই রাখা। বরং এর মাধ্যমে পরিচয়ের এক শাশ্বত ধারার সূচনা ঘটে। ফলে বিশ্ব মণীষীরাও নামের গুরুত্ব না দিয়ে পারে নি। কিন্তু তা অর্থবোধক, শ্রুতিমধুর বা অন্য কোন আঙ্গিকে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে মতান্তরের অবকাশ লক্ষ করা যায়। সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে মুসলমানদের গাফলতির সুযোগ নেই। তাই শিশুকে সার্বিক দিক থেকে সুন্দর নাম দিতে হবে। যে ধরনের নাম নিয়ে অন্যরা হাসাহাসি করে, সে ধরনের নামে শিশুকে ডাকা যাবে না। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন: ‘‘তোমরা সুন্দর নাম রাখ।’’ [. আবু দাউদ সুলাইমান ইবন আশআস সিজিস্তানী, সুনানু আবি দাউদ,( দিল্লী: কুতুবখানা রশিদিয়াহ, তা.বি), পৃ. ৫২।]