hadith book logo

বেনামাযীর পরিণতি

লেখকঃ মোঃ আবদুর রহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

বেনামাযী কাফির হলে তার ইহলৌকিক বিধান

১. বেনামাযী ব্যক্তি মুসলিমের অলী বা অভিভাবক হতে পারবে না :

ইসলাম যেসব ক্ষেত্রে অভিভাবকত্বকে শর্তারোপ করেছে সেসব ক্ষেত্রে বেনামাযী অলী বা অভিভাবক হতে পারবে না। কারণ অলী বা অভিভাবক হওয়ার প্রথম শর্ত হলো মুসলিম হওয়া। বেনামাযী তার নিজের সন্তানদেরও অলী বা অভিভাবক হতে পারবে না। এমনিভাবে কোন মুসলিম মেয়েকে বিবাহ দিতে যে অলীর প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রেও বেনামাযী অলী বা অভিভাবক হতে পারবে না। ফিকহশাস্ত্রবিদগণ তাদের সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত কিতাবে বলেন, অলী হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, মুসলিম হওয়া- যখন সে কোন মুসলিম মেয়ের বিবাহ দেবে। তারা আরো বলেন,

لَا وِلَايَةَ لِكَافِرٍ عَلٰى مُسْلِمَةٍ

মুসলিম মেয়ের উপর কোন কাফির ব্যক্তির অভিভাবকত্ব চলবে না। [আল-হাভী ফী ফিক্বহিশ শাফেঈ, ৯/১১৫।]

ইবনে আববাস (রাঃ) এ সম্পর্কে বলেন,

لَا نِكَاحَ إلَّا بِوَلِيِّ مُّرْشِدٍ

যোগ্য অলী বা অভিভাবক ছাড়া কোন বিবাহ বৈধ হবে না। [বায়হাকী, হা/১৪০২১; মুসনাদে শাফেঈ, হা/১০৯৩।]

আর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বন করা; আর নিকৃষ্টতম মূর্খতা ও অযোগ্যতা হলো কুফরী করা ও ইসলাম হতে বিমুখ হওয়া। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَمَنْ يَّرْغَبُ عَنْ مِّلَّةِ اِبْرَاهِيْمَ اِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهٗ﴾

যে নিজেকে নির্বোধ বানিয়ে নিয়েছে সে ব্যতীত কে ইবরাহীমের ধর্ম হতে বিমুখ হবে। (সূরা বাকারা- ১৩০)

২. বেনামাযী ব্যক্তি মুসলিমের উত্তরাধিকার লাভ করতে পারবে না :

বেনামাযী মুসলিমের উত্তরাধিকার লাভ করতে পারবে না। কারণ উত্তরাধিকার লাভ করার শর্তসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি শর্ত হলো মুসলিম হওয়া। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ لَا يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ وَلَا يَرِثُ الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ

উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, মুসলিম কাফিরের উত্তরাধিকারী হবে না এবং কাফিরও মুসলিমের উত্তরাধিকারী হবে না। [সহীহ বুখারী, হা/৬৭৬৪; সহীহ মুসলিম, হা/৪২২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৭৪৭; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১০৮২; আবু দাউদ, হা/২৯১১; ইবনে মাজাহ, হা/২৭২৯; মিশকাত, হা/৩০৪৩।]

৩. বেনামাযী মক্কার হেরেমে প্রবেশ করতে পারবে না :

বেনামাযী মক্কার হেরেমে প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ মক্কার হেরেমে প্রবেশ করতে হলে পবিত্র হতে হবে। আর কাফির-মুশরিকরা অপবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنَّمَا الْمُشْرِكُوْنَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هٰذَا﴾

হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মুশরিকরা অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকটেও না আসে। (সূরা তাওবা- ২৮)

মক্কায় ইসলাম বিজয় লাভ করার পূর্বে অমুসলিমরা উলঙ্গ হয়ে মক্কার হেরেমে প্রবেশ করত এবং কা‘বা ঘর তাওয়াফ করত। কিন্তু যখন ইসলাম বিজয় লাভ করল তারপর থেকেই অমুসলিমদের মক্কার হেরেমে প্রবেশ করা এবং উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করাকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এই হুকুম চলমান থাকবে।

৪. বেনামাযীর যবাই করা পশু খাওয়া যাবে না :

বেনামাযীর যবাই করা হালাল পশুও খাওয়া যাবে না। যদিও সে যবাই করার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে যবাই করে তারপরও একজন মুসলিমের জন্য তা খাওয়া বৈধ নয়। হালাল পশু খাওয়া বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো যবাই করা। আর এই যবাই করার জন্য আবার শর্ত হলো, ব্যক্তি মুসলিম বা আহলে কিতাব হতে হবে। এর স্বপক্ষে প্রখ্যাত তাফসীরবিদ খাযিন (রহ.) বলেন, আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, মাজুসী অর্থাৎ অগ্নিপূজক এবং সমস্ত বহুত্ববাদীদের যবাইকৃত সমস্ত জমত্মুই হারাম। হোক সে আরবের মুশরিক কিংবা মূর্তিপূজক। এমনিভাবে যাদের উপর কোন কিতাব অবতীর্ণ করা হয়নি তাদেরও যবাইকৃত জমত্মু খাওয়া মুসলিমের জন্য বৈধ নয়।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন,

لَا أَعْلَمُ أَحَدًا قَالَ بِخِلَافِه إِلَّا أَنْ يَّكُوْنَ صَاحِبَ بِدْعَةٍ

আমি জানি না যে, এর বিপক্ষে কেউ কোন মত পোষণ করেছেন। তবে হ্যাঁ, সে যদি বিদআতী হয় তবে বলতে পারে।

৫. বেনামাযী ব্যক্তি কোন মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না :

বেনামাযী ব্যক্তি কোন মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না। কারণ বিয়ের অন্যতম একটি শর্ত হলো, ছেলে-মেয়ে উভয়কেই মুসলিম হতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِذَا جَآءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوْهُنَّؕ اَللهُ اَعْلَمُ بِاِيْمَانِهِنَّۚ فَاِنْ عَلِمْتُمُوْهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوْهُنَّ اِلَى الْكُفَّارِؕ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّوْنَ لَهُنَّ﴾

হে মুমিনগণ! যখন তোমাদের নিকট মুমিন নারীরা হিজরত করে আসে, তখন তোমরা তাদেরকে (প্রথমে) পরীক্ষা করে নাও। তবে আল্লাহ তাদের ঈমান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। অতঃপর যদি তোমরা জানতে পার যে তারা মুমিন, তবে তাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিয়ো না। মুমিন নারীরা কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিররা মুমিন নারীদের জন্যও বৈধ নয়। (সূরা মুমতাহিনা- ১০)

তবে আহলে কিতাবের বিষয়ে কিছু কথা আছে। তারা যদি শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত না হয় তবে তাদের মেয়েদেরকে বিবাহ করা যাবে।

এমনিভাবে বিবাহ হওয়ার পর যদি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কেউ বেনামাযী হয়ে যায় তাহলে স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। যদি বিবাহের পর বাসর রাতের পূর্বেই মুরতাদ হয়ে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। আর যদি বাসর রাতের পর মুরতাদ হয় তাহলে কেউ কেউ বলেন, সাথে সাথেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। আর কেউ কেউ বলেন, স্ত্রীর ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর বিবাহ বিচ্ছেদ হবে।

৬. বেনামাযীর জানাযা পড়া এবং তার মাগফিরাতের জন্য দু‘আ করা যাবে না :

বেনামাযীর জানাযা পড়া এবং তার জন্য মাগফিরাতের দু‘আ করা কোন মুসলিমের জন্য জায়েয হবে না। বরং তা প্রত্যেকটি মুসলিমের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تُصَلِّ عَلٰۤى اَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ اَبَدًا وَّلَا تَقُمْ عَلٰى قَبْرِهٖؕ اِنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهٖ وَمَاتُوْا وَهُمْ فَاسِقُوْنَ﴾

তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে তুমি কখনো তার জন্য (জানাযার) নামায আদায় করবে না এবং তার কবরের পার্শ্বেও দাঁড়াবে না। তারা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং তারা পাপাচারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। (সূরা তাওবা- ৮৪)

বেনামাযী যদিও নিজের আত্মীয়স্বজন হয় তারপরও মুসলিমের জন্য তার জানাযা পড়া ও তার জন্য মাগফিরাতের প্রার্থনা করা হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْاۤ اُولِيْ قُرْبٰى مِنْ ۢبَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ اَنَّهُمْ اَصْحَابُ الْجَحِيْمِ ‐ وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ اِبْرَاهِيْمَ لِاَبِيْهِ اِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَّعَدَهَاۤ اِيَّاهُۚ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهٗۤ اَنَّهٗ عَدُوٌّ لِّلّٰهِ تَبَرَّاَ مِنْهُؕ اِنَّ اِبْرَاهِيْمَ لَاَوَّاهٌ حَلِيْمٌ﴾

নবী এবং ঈমানদারদের জন্য এটা উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়; তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হওয়ার পরও যে, তারা জাহান্নামবাসী। আর ইবরাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিল এজন্য যে, সে তাকে এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু; তখন ইবরাহীম তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। নিশ্চয় ইবরাহীম কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও সহনশীল। (সূরা তাওবা- ১১৩, ১১৪)