১
বেনামাযীর পরিণতি
লেখকঃ মোঃ আবদুর রহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৩
বেনামাযীদের জন্য করণীয়
বেনামাযীদের জন্য তওবা করা অপরিহার্য :
যারা নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করা সত্ত্বেও নামায পড়ে না, তাদের জন্য প্রধান করণীয় হচ্ছে, তওবা করা। তারা যদি একনিষ্ঠ নিয়তে তওবা করে নামাযের প্রতি মনোযোগী হয়, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَخَلَفَ مِنْ ۢبَعْدِهِمْ خَلْفٌ اَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا ‐ إِلَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُوْنَ شَيْئًا﴾
তাদের পরে এমন লোকদের আবির্ভাব হয়েছে, যারা নামাযকে নষ্ট করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। অচিরেই তারা জাহান্নামের ‘গাই’ নামক গর্তে প্রবেশ করবে। কিন্তু যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। (সূরা মারইয়াম- ৫৯, ৬০)
আর তওবা হচ্ছে এমন একটি আমল, যা বান্দাকে যেকোন অপরাধ থেকে মুক্তি দিতে পারে। আর এ দরজা যেকোন বান্দার জন্য সবসময় খোলা রয়েছে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ لَا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ حَتّٰى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ وَلَا تَنْقَطِعُ التَّوْبَةُ حَتّٰى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
মুয়াবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তওবা বন্ধ না হবে। আর তওবার দরজা বন্ধ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হবে। [আবু দাউদ, হা/২৪৮১; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৮২৩৪; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৯০৭।]
সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব তওবা করে নিতে হবে, অন্যথায় মৃত্যু সামনে উপস্থিত হয়ে গেলে তওবা করলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সুতরাং উক্ত তওবা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তিও দিতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ السَّيِّئَاتِ حَتّٰۤى اِذَا حَضَرَ اَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ اِنِّيْ تُبْتُ الْاٰنَ وَلَا الَّذِيْنَ يَمُوْتُوْنَ وَهُمْ كُفَّارٌ اُولٰٓئِكَ اَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا اَلِيْمًا﴾
তাদের জন্য কোন তওবা নেই যারা পাপ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলে আমি এখন তওবা করছি এবং তাদেরও তওবা নেই যারা কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। এদের জন্য আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা নিসা- ১৮)
তওবা করার সাথে সাথেই নামায শুরু করবে :
যখন কোন ব্যক্তি নামাযের গুরুত্ব অনুধাবন করে তওবা করে এর দিকে ফিরে আসবে, তখন তাকে সাথে সাথেই নামায আদায় করা আরম্ভ করে দিতে হবে। তাহলে একদিকে যেমন তার তওবার বিষয়টি প্রমাণিত হবে, তেমনিভাবে ইতিপূর্বে সংঘটিত তার মন্দ আমলসমূহও মিটে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ اِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذٰلِكَ ذِكْرٰى لِلذَّاكِرِيْنَ﴾
তুমি নামায কায়েম করো দিনের দু’প্রামত্মভাগে ও রাতের প্রথমাংশে। সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্মকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, এটা তাদের জন্য এক উপদেশ। (সূরা হূদ- ১১৪)
তাছাড়া তওবাটা করা উচিত নামাযের মাধ্যমে, যা তওবার নামায হিসেবে প্রসিদ্ধ। হাদীসে এসেছে,
قَالَ أَبُوْبَكْرٍ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ مَا مِنْ رَجُلٍ يَذْنُبُ ذَنْبًا ثُمَّ يَقُوْمُ فَيَتَطَهَّرُ ثُمَّ يُصَلِّيْ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللهَ إِلَّا غُفِرَ لَهٗ
আবু বকর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, কোন বান্দা যদি কোন গুনাহের কাজ করে সাথে সাথে ওযু করে দু’রাকাত নামায আদায় করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। [তিরমিযী, হা/৩০০৬; মুসনাদুল জামে‘, হা/৭১৩৩; সহীহ ইবনে মাজাহ, হা/১১৪৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৬৮০; মিশকাত, হা/১৩২৪।]
রাতের শেষ ভাগে উঠে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে :
দু‘আ কবুল হওয়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছে, রাতের শেষ ভাগ। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার নিকটতম আসমানে এসে বান্দাদেরকে দু‘আ করার জন্য আহবান করতে থাকেন। ফলে এ সময় যেসব বান্দা দু‘আ করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবুল করেন। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالٰى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقٰى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْاٰخِرُ فَيَقُوْلُ مَنْ يَدْعُوْنِىْ فَاَسْتَجِيْبَ لَهٗ وَمَنْ يَسْأَلُنِىْ فَاُعْطِيَهٗ وَمَنْ يَسْتَغْفِرُنِىْ فَأَغْفِرَ لَهٗ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক রাতের যখন একতৃতীয়াংশ বাকি থাকে, তখন আমাদের মহান প্রতিপালক নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, কে আছে যে আমার নিকট দু’আ করবে? আমি তার দু’আ কবুল করব; কে আছে যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দান করব; কে আছে যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। [সহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮০৮।]
আর এ কারণেই এটি মুমিনদের তথা জান্নাতী ব্যক্তিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَبِالْاَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ﴾
রাতের শেষাংশে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করে। (সূরা যারিয়াত- ১৮)
﴿اَلصَّابِرِيْنَ وَالصَّادِقِيْنَ وَالْقَانِتِيْنَ وَالْمُنْفِقِيْنَ وَالْمُسْتَغْفِرِيْنَ بِالْاَسْحَارِ﴾
তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, আনুগত্যশীল, (আল্লাহর পথে) দানশীল এবং শেষ রাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। (সূরা আলে ইমরান- ১৭)
বেশি বেশি নিচের দু‘আটি পাঠ করবে :
যেসব ব্যক্তি নামায আদায় করে না এবং যেসব ব্যক্তি নামায আদায় করে- প্রত্যেকের জন্যই নিম্নোক্ত দু‘আটি পাঠ করা খুবই জরুরি। যারা নামায আদায় করে না তারা পড়বে নামায আদায় করার তাওফীক লাভের জন্য এবং যারা নামায আদায় করে, তারা পড়বে এ অবস্থায় টিকে থাকার জন্য। কেননা শয়তান তাদেরকে তা হতে বিচ্যুত করার জন্য সবর্দা ওঁৎ পেতে থাকে। আর এ কারণেই ইবরাহীম (আঃ) এ দু‘আটি পাঠ করতেন; অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তার উদ্ধৃতি দিয়ে আমাদেরকে এই দু‘আটি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
﴿رَبِّ اجْعَلْنِيْ مُقِيْمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِيْ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَآءِ﴾
উচ্চারণ : রবিবজ্ ‘আল্নী মুক্বীমাস্ সালা-তি ওয়ামিন যুর্রিয়্যাতী, রববানা ওয়া তাক্বাববাল দু‘আ।
অর্থ : হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়ে দিন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়ে দিন। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি দু‘আ কবুল করুন।
(সূরা ইব্রাহীম- ৪০)
উমরী কাযা আদায় না করে বেশি বেশি নফল নামায আদায় করতে হবে :
যে ব্যক্তির নামায অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছুটে যায়, তার জন্য কাযা আছে। তার মনে অবহেলা না থাকলে আল্লাহ তার কাযা গ্রহণ করবেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করলে সে নামাযের কাযা নেই। সুতরাং উমরী কাযা অর্থাৎ অতীত জীবনের কাযা নামাযসমূহ আদায় করার কোন বিধান ইসলামে নেই। এটি বর্তমান যুগের একটি বিদআতী প্রথা। [আলোচনা দ্রষ্টব্য : আলবানী-মিশকাত হা/৬০৩, টীকা-২।] এ ক্ষেত্রে তার উচিত হবে বিগত দিনের নামায ছুটে যাওয়ার কারণে খালেসভাবে তওবা করা এবং বেশি বেশি নফল নামায আদায় করা। কেননা ফরয ইবাদাতের ঘাটতি হলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর হুকুমে নফল ইবাদাতের নেকী দ্বারা তা পূর্ণ করা হবে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ حُرَيْثِ بْنِ قَبِيْصَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِيْنَةَ فَقُلْتُ اَللّٰهُمَّ يَسِّرْ لِىْ جَلِيْسًا صَالِحًا قَالَ فَجَلَسْتُ اِلٰى اَبِىْ هُرَيْرَةَ فَقُلْتُ اِنِّىْ سَاَلْتُ اللهَ اَنْ يَّرْزُقَنِىْ جَلِيْسًا صَالِحًا فَحَدِّثْنِىْ بِحَدِيْثٍ سَمِعْتَهٗ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ - - لَعَلَّ اللهَ اَنْ يَنْفَعَنِىْ بِهٖ فَقَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ - - يَقُوْلُ : اِنَّ اَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهٖ صَلَاتُهٗ فَاِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ اَفْلَحَ وَاَنْجَحَ وَاِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ فَاِنِ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيْضَتِهٖ شَىْءٌ قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ انْظُرُوْا هَلْ لِعَبْدِىْ مِنْ تَطَوُّعٍ فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الْفَرِيْضَةِ ثُمَّ يَكُوْنُ سَائِرُ عَمَلِهٖ عَلٰى ذٰلِكَ
হুরাইছ ইবনে কাবীছা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মদিনায় আগমন করলাম। অতঃপর বললাম, হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সঙ্গী দান করুন। অতঃপর আমি আবু হুরায়রা (রাঃ) এর নিকট গিয়ে বসলাম এবং বললাম, আমি আল্লাহর কাছে দু‘আ করেছি যে, তিনি যেন আমাকে উত্তম সঙ্গী দান করেন। সুতরাং আপনি এমন একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি নবী ﷺ হতে শুনেছেন। আমি আশা রাখি আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা আমাকে উপকৃত করবেন। এরপর আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন বান্দার সকল আমলের মধ্যে প্রথমে নামাযের হিসাব নেয়া হবে। যদি তার নামায সঠিক হয়, তবে সে মুক্তি পাবে এবং সফলতা লাভ করবে। আর যদি তার নামায সঠিক না হয়, তবে সে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ফরয নামাযের মধ্যে কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, ‘‘দেখো! আমার বান্দার আমলের মধ্যে নফল নামায আছে কি না’’ যদি (তার আমলে নফল নামায) থাকে তবে তা দিয়ে ফরযের ঘাটতি পূর্ণ করে দেয়া হবে। এরপর তার সকল আমলের হিসাব এভাবেই নেয়া হবে। [তিরমিযী, হা/৪১৩; নাসায়ী, হা/৪৬৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৪২৬; জামেউস সগীর, হা/৩৭৮৩।]
যারা নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করা সত্ত্বেও নামায পড়ে না, তাদের জন্য প্রধান করণীয় হচ্ছে, তওবা করা। তারা যদি একনিষ্ঠ নিয়তে তওবা করে নামাযের প্রতি মনোযোগী হয়, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَخَلَفَ مِنْ ۢبَعْدِهِمْ خَلْفٌ اَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا ‐ إِلَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُوْنَ شَيْئًا﴾
তাদের পরে এমন লোকদের আবির্ভাব হয়েছে, যারা নামাযকে নষ্ট করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। অচিরেই তারা জাহান্নামের ‘গাই’ নামক গর্তে প্রবেশ করবে। কিন্তু যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। (সূরা মারইয়াম- ৫৯, ৬০)
আর তওবা হচ্ছে এমন একটি আমল, যা বান্দাকে যেকোন অপরাধ থেকে মুক্তি দিতে পারে। আর এ দরজা যেকোন বান্দার জন্য সবসময় খোলা রয়েছে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ لَا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ حَتّٰى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ وَلَا تَنْقَطِعُ التَّوْبَةُ حَتّٰى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
মুয়াবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তওবা বন্ধ না হবে। আর তওবার দরজা বন্ধ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হবে। [আবু দাউদ, হা/২৪৮১; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৮২৩৪; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৯০৭।]
সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব তওবা করে নিতে হবে, অন্যথায় মৃত্যু সামনে উপস্থিত হয়ে গেলে তওবা করলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সুতরাং উক্ত তওবা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তিও দিতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ السَّيِّئَاتِ حَتّٰۤى اِذَا حَضَرَ اَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ اِنِّيْ تُبْتُ الْاٰنَ وَلَا الَّذِيْنَ يَمُوْتُوْنَ وَهُمْ كُفَّارٌ اُولٰٓئِكَ اَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا اَلِيْمًا﴾
তাদের জন্য কোন তওবা নেই যারা পাপ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলে আমি এখন তওবা করছি এবং তাদেরও তওবা নেই যারা কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। এদের জন্য আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা নিসা- ১৮)
তওবা করার সাথে সাথেই নামায শুরু করবে :
যখন কোন ব্যক্তি নামাযের গুরুত্ব অনুধাবন করে তওবা করে এর দিকে ফিরে আসবে, তখন তাকে সাথে সাথেই নামায আদায় করা আরম্ভ করে দিতে হবে। তাহলে একদিকে যেমন তার তওবার বিষয়টি প্রমাণিত হবে, তেমনিভাবে ইতিপূর্বে সংঘটিত তার মন্দ আমলসমূহও মিটে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ اِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذٰلِكَ ذِكْرٰى لِلذَّاكِرِيْنَ﴾
তুমি নামায কায়েম করো দিনের দু’প্রামত্মভাগে ও রাতের প্রথমাংশে। সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্মকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, এটা তাদের জন্য এক উপদেশ। (সূরা হূদ- ১১৪)
তাছাড়া তওবাটা করা উচিত নামাযের মাধ্যমে, যা তওবার নামায হিসেবে প্রসিদ্ধ। হাদীসে এসেছে,
قَالَ أَبُوْبَكْرٍ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ مَا مِنْ رَجُلٍ يَذْنُبُ ذَنْبًا ثُمَّ يَقُوْمُ فَيَتَطَهَّرُ ثُمَّ يُصَلِّيْ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللهَ إِلَّا غُفِرَ لَهٗ
আবু বকর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, কোন বান্দা যদি কোন গুনাহের কাজ করে সাথে সাথে ওযু করে দু’রাকাত নামায আদায় করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। [তিরমিযী, হা/৩০০৬; মুসনাদুল জামে‘, হা/৭১৩৩; সহীহ ইবনে মাজাহ, হা/১১৪৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৬৮০; মিশকাত, হা/১৩২৪।]
রাতের শেষ ভাগে উঠে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে :
দু‘আ কবুল হওয়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছে, রাতের শেষ ভাগ। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার নিকটতম আসমানে এসে বান্দাদেরকে দু‘আ করার জন্য আহবান করতে থাকেন। ফলে এ সময় যেসব বান্দা দু‘আ করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবুল করেন। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالٰى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقٰى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْاٰخِرُ فَيَقُوْلُ مَنْ يَدْعُوْنِىْ فَاَسْتَجِيْبَ لَهٗ وَمَنْ يَسْأَلُنِىْ فَاُعْطِيَهٗ وَمَنْ يَسْتَغْفِرُنِىْ فَأَغْفِرَ لَهٗ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক রাতের যখন একতৃতীয়াংশ বাকি থাকে, তখন আমাদের মহান প্রতিপালক নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, কে আছে যে আমার নিকট দু’আ করবে? আমি তার দু’আ কবুল করব; কে আছে যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দান করব; কে আছে যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। [সহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮০৮।]
আর এ কারণেই এটি মুমিনদের তথা জান্নাতী ব্যক্তিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَبِالْاَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ﴾
রাতের শেষাংশে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করে। (সূরা যারিয়াত- ১৮)
﴿اَلصَّابِرِيْنَ وَالصَّادِقِيْنَ وَالْقَانِتِيْنَ وَالْمُنْفِقِيْنَ وَالْمُسْتَغْفِرِيْنَ بِالْاَسْحَارِ﴾
তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, আনুগত্যশীল, (আল্লাহর পথে) দানশীল এবং শেষ রাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। (সূরা আলে ইমরান- ১৭)
বেশি বেশি নিচের দু‘আটি পাঠ করবে :
যেসব ব্যক্তি নামায আদায় করে না এবং যেসব ব্যক্তি নামায আদায় করে- প্রত্যেকের জন্যই নিম্নোক্ত দু‘আটি পাঠ করা খুবই জরুরি। যারা নামায আদায় করে না তারা পড়বে নামায আদায় করার তাওফীক লাভের জন্য এবং যারা নামায আদায় করে, তারা পড়বে এ অবস্থায় টিকে থাকার জন্য। কেননা শয়তান তাদেরকে তা হতে বিচ্যুত করার জন্য সবর্দা ওঁৎ পেতে থাকে। আর এ কারণেই ইবরাহীম (আঃ) এ দু‘আটি পাঠ করতেন; অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তার উদ্ধৃতি দিয়ে আমাদেরকে এই দু‘আটি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
﴿رَبِّ اجْعَلْنِيْ مُقِيْمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِيْ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَآءِ﴾
উচ্চারণ : রবিবজ্ ‘আল্নী মুক্বীমাস্ সালা-তি ওয়ামিন যুর্রিয়্যাতী, রববানা ওয়া তাক্বাববাল দু‘আ।
অর্থ : হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়ে দিন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়ে দিন। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি দু‘আ কবুল করুন।
(সূরা ইব্রাহীম- ৪০)
উমরী কাযা আদায় না করে বেশি বেশি নফল নামায আদায় করতে হবে :
যে ব্যক্তির নামায অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছুটে যায়, তার জন্য কাযা আছে। তার মনে অবহেলা না থাকলে আল্লাহ তার কাযা গ্রহণ করবেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করলে সে নামাযের কাযা নেই। সুতরাং উমরী কাযা অর্থাৎ অতীত জীবনের কাযা নামাযসমূহ আদায় করার কোন বিধান ইসলামে নেই। এটি বর্তমান যুগের একটি বিদআতী প্রথা। [আলোচনা দ্রষ্টব্য : আলবানী-মিশকাত হা/৬০৩, টীকা-২।] এ ক্ষেত্রে তার উচিত হবে বিগত দিনের নামায ছুটে যাওয়ার কারণে খালেসভাবে তওবা করা এবং বেশি বেশি নফল নামায আদায় করা। কেননা ফরয ইবাদাতের ঘাটতি হলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর হুকুমে নফল ইবাদাতের নেকী দ্বারা তা পূর্ণ করা হবে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ حُرَيْثِ بْنِ قَبِيْصَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِيْنَةَ فَقُلْتُ اَللّٰهُمَّ يَسِّرْ لِىْ جَلِيْسًا صَالِحًا قَالَ فَجَلَسْتُ اِلٰى اَبِىْ هُرَيْرَةَ فَقُلْتُ اِنِّىْ سَاَلْتُ اللهَ اَنْ يَّرْزُقَنِىْ جَلِيْسًا صَالِحًا فَحَدِّثْنِىْ بِحَدِيْثٍ سَمِعْتَهٗ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ - - لَعَلَّ اللهَ اَنْ يَنْفَعَنِىْ بِهٖ فَقَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ - - يَقُوْلُ : اِنَّ اَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهٖ صَلَاتُهٗ فَاِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ اَفْلَحَ وَاَنْجَحَ وَاِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ فَاِنِ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيْضَتِهٖ شَىْءٌ قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ انْظُرُوْا هَلْ لِعَبْدِىْ مِنْ تَطَوُّعٍ فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الْفَرِيْضَةِ ثُمَّ يَكُوْنُ سَائِرُ عَمَلِهٖ عَلٰى ذٰلِكَ
হুরাইছ ইবনে কাবীছা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মদিনায় আগমন করলাম। অতঃপর বললাম, হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সঙ্গী দান করুন। অতঃপর আমি আবু হুরায়রা (রাঃ) এর নিকট গিয়ে বসলাম এবং বললাম, আমি আল্লাহর কাছে দু‘আ করেছি যে, তিনি যেন আমাকে উত্তম সঙ্গী দান করেন। সুতরাং আপনি এমন একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি নবী ﷺ হতে শুনেছেন। আমি আশা রাখি আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা আমাকে উপকৃত করবেন। এরপর আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন বান্দার সকল আমলের মধ্যে প্রথমে নামাযের হিসাব নেয়া হবে। যদি তার নামায সঠিক হয়, তবে সে মুক্তি পাবে এবং সফলতা লাভ করবে। আর যদি তার নামায সঠিক না হয়, তবে সে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ফরয নামাযের মধ্যে কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, ‘‘দেখো! আমার বান্দার আমলের মধ্যে নফল নামায আছে কি না’’ যদি (তার আমলে নফল নামায) থাকে তবে তা দিয়ে ফরযের ঘাটতি পূর্ণ করে দেয়া হবে। এরপর তার সকল আমলের হিসাব এভাবেই নেয়া হবে। [তিরমিযী, হা/৪১৩; নাসায়ী, হা/৪৬৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৪২৬; জামেউস সগীর, হা/৩৭৮৩।]