hadith book logo

শির্ক কী ও কেন

লেখকঃ ড. মুহাম্মদ মুয্‌যাম্মিল আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৩

কা‘বা শরীফ নির্মাণ ও এর হজ্জ করার নির্দেশের উদ্দেশ্য:

ইসলাম একটি বিশ্বজনীন দ্বীন। এ দ্বীনের অনুসারীরা সকলেই এক আল্লাহর বান্দা ও পরস্পরের ভাই ভাই। সে কারণে তিনি চান তাঁর বান্দারা এক ও অভিন্ন নিয়মে এবং একই কিবলা বা দিকে তাদের মুখ ফিরিয়ে তাঁর উপাসনা করুক। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে [. কা‘বা গৃহটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ার প্রমাণে ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত একটি মাওকূফ হাদীস উপস্থাপন করা যায়। তাতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বলেন: আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবী সৃষ্টির দু’হাজার বছর পূর্বে পানিতে চারটি স্তম্ভের উপর কা‘বা গৃহ স্থাপন করেন। অতঃপর এ-গৃহের নিচ থেকেই পৃথিবীর সম্প্রসারণ শুরু হয়’’। দেখুন: তাফছীরুল কুরআনিল ‘আযীম; ১/১৮৪। পৃথিবীর মানচিত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে বাস্তবেই প্রমাণিত হয় যে, আরব উপ-দ্বীপটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। লেখক] তাদের জন্য কা‘বা গৃহ তথা কিবলা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। তারা যে পরস্পরের ভাই ভাই তা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখানোর লক্ষ্যে তাদের মধ্যকার সুস্থ ও সম্পদশালীদের উপর সারা জীবনে অন্তত একবার সে গৃহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করার বিধান জারী করেন। তাঁর বান্দারা যাতে সে উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে পৃথিবীর সর্বত্র থেকে তা যিয়ারতে আগমন করে, সে-জন্য তিনি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন:

﴿وَأَذِّن فِي ٱلنَّاسِ بِٱلۡحَجِّ يَأۡتُوكَ رِجَالٗا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٖ يَأۡتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٖ ٢٧ ﴾ [ الحج : ٢٧ ]

“আর তুমি মানুষের মধ্যে (এ গৃহের হজ্জের) ঘোষণা প্রচার কর, তারা যেন পায়ে হেটে এবং কৃষ্ণকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দুর-দুরান্ত থেকে তোমার কাছে (মক্কায়) আসে।’’ [. আল-কুরআন,সূরা হজ্জ :২৭।]

এ-গৃহের চার পার্শে ত্বাওয়াফ করার প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:

﴿وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ﴾ [ الحج : ٢٩ ]

“আর তারা যেন প্রাচীন পবিত্র গৃহের ত্বওয়াফ করে।’’ [. আল-কুরআন,সূরা হজ্জ :২৯।]

এ গৃহ বরকতময় হওয়ার কারণে সম্ভব হলে ত্বওয়াফ করার সময় বরকত হাসিলের জন্য এ-গৃহের ডান পার্শ্ব হাত দিয়ে স্পর্শ করে অন্যথায় সে দিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে সম্মান প্রদর্শণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। [. ইবন ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যে দিন রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে এ দু‘পার্শ্ব (অর্থাৎ- কা‘বা গৃহের ডান পার্শ্ব ও বাম পার্শ্ব যেখানে হাজারে আসওয়াদ অবস্থিত) স্পর্শ করতে দেখেছি সে দিন থেকেই আমি এ দু’পার্শ্ব কষ্টে হোক আর বিনা কষ্টে হোক কোনো অবস্থাতেই তা স্পর্শ করা পরিত্যাগ করি নি’’। দেখুন: বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাসিক, বাব নং: ৫৬, তাকবীলুল হাজার, হাদীস নং ১৫২৯; ২/৫৮২; নাসাই, প্রাগুক্ত; ৪/৫/১৮৫।]

এর বাম কোণে যে কৃষ্ণকায় পাথর ( الحجر الأسـود ) রয়েছে, এর সাথে মানুষের লাভ ও ক্ষতি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও [. ‘উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কৃষ্ণ পাথরকে চুম্বন করার সময় বলেছিলেন, «عَلِمْتُ أَنَّكَ حَجَـرٌ لَا تَضُـرُّ وَلَا تَنْـفَعُ، وَلَوْ لَا رَأَيْتُ رَسُـوْلَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهَ عَلَيْهِ وَسَلَّـمَ قَبَّلَكَ مَا قَبَّلْتُك» “আমি জানি যে তুমি একটি পাথর, তুমি কোন লাভ ও ক্ষতি করতে পার না, রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- তোমাকে চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না’’। দেখুন:বুখারী,প্রাগুক্ত, কিতাবুল মানাসিক, বাব নং: ৫৬, হাদীস নং: ১৫২৮, ২/৫৮২; সুলাইমান ইবন আশআছ,সুনানে আবী দাউদ; কিতাবুল মানাকিব, বাব: ফী তাক্ববীলিল হাজারি; (সিরিয়া: দারুল হিমস, ১ম সংস্করণ, ১৯৭০ খ্রি.), ২/৪৩৯।] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত হিসেবে সে পাথরকেও যথাসম্ভব চুম্বন বা স্পর্শ করার অনুমতি রয়েছে। কা‘বা গৃহের দরজা ও মুলতাযামকে (দরজার চৌকাঠের নিচের পাকা স্থান) হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে তাঁর নিকট আকুতি ও মিনতি করে প্রার্থনা করারও অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। [. ‘আব্দুর রহমান ইবন সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: (মক্কা বিজয়ের বছর) আমি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে তাঁর সাথীদের সহ কা‘বা গৃহ থেকে বের হতে দেখলাম, তখন তাঁরা কা‘বা গৃহের দরজা থেকে হাতীম পর্যন্ত হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে ছিলেন এবং তাদের গণ্ডদেশ দেয়ালের সাথে লাগিয়ে রেখেছিলেন, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তখন তাঁদের মাঝে ছিলেন’’। দেখুন: আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ২/৪৫১। [তবে এর সনদ দুর্বল। সম্পাদক]]

এ গৃহের নিকটে ও দুরে অবস্থিত মাকামে ইব্রাহীম, সাফা ও মারওয়াহ পাহাড়দ্বয়, মিনা, মুযদালিফাহ ও আরাফাতের ময়দানকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,

﴿۞إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّهِ﴾ [ البقرة : ١٥٨ ]

“নিশ্চয় সাফা ও মারওয়াঃ পর্বতদ্বয় আল্লাহর নিদর্শনাদির অন্তর্গত।’’ [. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ :১৫৮।]

এ-সব স্থানের সম্মান করাকে অন্তরে তাকওয়ার পরিচায়ক হিসেবে গণ্য করে বলেছেন:

﴿ ذَٰلِكَۖ وَمَن يُعَظِّمۡ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقۡوَى ٱلۡقُلُوبِ ٣٢ ﴾ [ الحج : ٣٢ ]

“এটা, আর যে কেউ আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো তার অন্তরের তাকওয়ারই পরিচায়ক হয়ে থাকে।’’ [. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ৩২।]

এ-সব নিদর্শনাদির যথাযথ মর্যাদা দান বিশেষ করে আরাফাতে অবস্থান করাকে ‘হজ্জ’ এর পরিপূর্ণতার অন্তর্গত বলে গণ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«الحَجُّ عَرَفَةُ»

‘‘আরাফার ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করাই হচ্ছে হজ্জ।” [. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ২/৪৮৬; ইবনে মা-জাহ, প্রাগুক্ত; ১/১০০৩।]

তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মিনা ও মুযদালিফায় অবস্থান করে রাত্রি যাপন করাকেও হজ্জের পূর্ণতার অংশ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। হজ্জ আদায়কারীদের সাথে নিজ নিজ বাড়ী বা এলাকা থেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার জন্য সাথে পশু নিয়ে যাওয়াকেও তাঁর নিদর্শনাদির মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,

﴿ وَٱلۡبُدۡنَ جَعَلۡنَٰهَا لَكُم مِّن شَعَٰٓئِرِ ٱللَّهِ لَكُمۡ فِيهَا خَيۡرٞۖ ﴾ [ الحج : ٣٦ ]

‘‘কা‘বা গৃহের উদ্দেশ্যে সাথে উট নিয়ে যাওয়াকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনের মধ্যে গণ্য করলাম, এতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ।’’ [. আল-কুরআন,সূরা হজ্জ : ৩২।]