hadith book logo

ধূমপান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ফাতাওয়া

লেখকঃ আমের সালেহ আলাওয়ী নাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

৭- তামাক বিক্রেতা ও তা পানকারীকে সহযোগিতা করা

প্রশ্ন/ আল্লামা ইবনে উসাইমীন রহমাতুল্লাহ আলাইহিকে এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল: ‘কোনো কোনো ব্যক্তি কখনও কখনও ধূমপায়ীর নিকট গিয়ে তাকে তামাক তথা বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য টাকা দিয়ে থাকে, আর বলে যে, এটিও আল্লাহর পথে দাওয়াতী কাজ, এটি কি সঠিক?

উত্তর: এটি ঠিক নয়, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াটাও অন্যায়। সিগারেট কেনার জন্য তাকে টাকা প্রদান করার মাধ্যমে লোকটির দ্বীনের প্রতি আকর্ষণ বাড়বে এটি ঠিক নয়, তাকে দ্বীনের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির মাধ্যম হল: তাকে সদুপদেশ দেওয়া এবং গুনাহ ও অপরাধের যাবতীয় ক্ষতি তুলে ধরে তা থেকে সতর্ক করে দেওয়া, সেটি ধূমপান হোক বা অন্য কিছু হোক। সেই সাথে তাকে দিক নির্দেশনামূলক ক্যাসেট বা ছোট ছোট বই পড়তে দেওয়া। এটিই হচ্ছে সত্যিকারের মন আকর্ষণ।

নিজেই অপরাধ করা অথবা তার জন্য সিগারেট কিনা বা তাকে সিগারেট কিনার জন্য টাকা দেওয়া ঠিক নয়। [উন্মুক্ত সাক্ষাৎ নং ১৯ পৃ : ৫৪-৫৫।]

প্রশ্ন/ এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল ফাতাওয়ার স্থায়ী কমিটিকে: আমি ব্যতীত বাবার আর কোনো ছেলে নেই, তিনি আমাকে সিগারেট আনতে বলেন, আমি না আনলে আমার উপর রাগ করেন এবং মনে কষ্ট পান অথচ আমি তা আনতে অপছন্দ করি, কারণ আমি জানি যে তা হারাম। এমতাবস্থায় আমি কি করব?

উত্তর: তামাক অপবিত্র হারাম, কাজেই তা পান করা হারাম এবং অন্যায় কাজ। পানকারীর জন্য এনে দেওয়া তা পান করার একটি মাধ্যম, আর যে কোনো মাধ্যম উদ্দেশ্যের হুকুম গ্রহণ করে। যদি উদ্দেশ্য হারাম হয় তবে তা সংগ্রহ করার মাধ্যমও হারাম এবং যাতে আল্লাহর আনুগত্য হয় সে ক্ষেত্রে এবং সাধারণ ক্ষেত্রে মাতা-পিতার আনুগত্য করা শরীয়তের বিধান। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের আনুগত্য করা জায়েয নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ»

“আল্লাহর অবাধ্যতায় কারো কোনো আনুগত্য নেই বরং আনুগত্য হচ্ছে ভাল কাজে”। [নাসাঈ: ৪২০৫ ও অন্যান্যগণ, আলবানী সহীহ জামেতে এটাকে সহীহ বলেছেন হা: ৭৫১৯।]

তিনি আরও বলেছেন:

«لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيةِ الخَالِقِ»

“স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কোনো আনুগত্য নেই”। [আহমাদ ও হাকেম, আলবানী সহীহ জামেতে এটিকে সহীহ বলেছেন। হা: ৭৫১৯। আরও দেখুন, শারহুস সুন্নাহ ১০/৪৪।]

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওফীক দাতা। হে আল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মদ এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীগণের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করুন। [স্থায়ী কমিটির ফাতাওয়া - ২২/ ১৮৬-১৮৭।]

প্রশ্ন/ এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল মিসরীয় মুফতি শাইখ নাসর ফরিদ ওয়াসেলকে: সকল মিডিয়াতে বিভিন্ন প্রকার ধূমপানের মাধ্যমে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় তা হালাল না হারাম?

উত্তর: পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ধূমপান হারাম এবং এর সাথে সম্পৃক্ত সকল জিনিস হারাম। মিডিয়াতে এর যাবতীয় বিজ্ঞাপন শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম, কারণ তা হচ্ছে অবৈধ কাজে সহযোগিতা করা, আর অবৈধ কাজে সহযোগিতা করাও অবৈধ কাজ। [ফাতাওয়া নং ৮৭২, প্রশ্ন ৩।]

প্রশ্ন/ এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল আল্লামা ইবনে উসাইমীন রহমাতুল্লাহ আলাইহকে: যে ব্যক্তি সিগারেট, গানের ক্যাসেট, অশ্লীল ভিডিও ক্যাসেট বিক্রি করে এবং সূদী ব্যাংকে লেনদেন করে থাকে; এমন ব্যক্তিকে দোকান ভাড়া দেওয়ার হুকুম কি?

উত্তর: এসব ক্ষেত্রে দোকান ভাড়া দেওয়ার হুকুম জানা যায় আল্লাহর নিম্নাক্ত বাণী থেকে। তা হচ্ছে,

﴿وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ﴾ [ المائ‍دة : ٢ ]

“তোমরা পরস্পরে ভাল এবং তাকওয়াপূর্ণ কাজে সহযোগিতা কর পক্ষান্তরে পাপ এবং আল্লাহদ্রোহী কাজে সহযোগিতা করো না।” [সূরা মায়েদা: ২]। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রশ্নে উল্লেখিত কাজের জন্য দোকান ভাড়া দেওয়া হারাম, কারণ তা পাপ এবং আল্লাহদ্রোহী কাজে সহযোগিতা করার অন্তর্ভুক্ত।’ [ফাতাওয়া ইসলামিয়া ৪/ ৫২১।]

প্রশ্ন/ জনাব আপনাকে বলতে চাই যে, আমরা বিল্ডিং কনষ্ট্রাকশন, পরিস্কার এবং মেরামত কোম্পানীর লোক, এ ক্ষেত্রে কখনো কখনো নিম্নোক্ত দোকানে কাজ করতে হয় যেমন: সেলুন যেখানে দাড়ি শেভ করা হয়, ব্যাংক, ষ্টুডিও, গানের ক্যাসেটের দোকান, ড্রাগ ও হুক্কা বিক্রির দোকান এবং সাধারণ চা কফির দোকান। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বদলা দিন এবং আপনাদের জ্ঞান দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমদেরকে উপকৃত করুন। আর আল্লাহ নবী মুহাম্মদ এর উপর সালাত পেশ করুন।

উত্তর: আপনি যা বলেছেন তাই যদি হয় তবে উল্লেখিত কোম্পানীর পক্ষে বিল্ডিং কনষ্ট্রাকশন, পরিস্কার মেরামত এবং প্রশ্নে উল্লেখিত দোকানে তৈরীর জন্য কনস্ট্রাকশন চুক্তিতে প্রবেশ করা উচিত নয়, কেননা তা আল্লাহ কর্তৃক হারাম করা জিনিসে পতিত হওয়ার একটি মাধ্যম। আর শরীয়তের একটি নীতি হলো (মাধ্যম বা পদ্ধতি মূল উদ্দেশ্যের হুকুম গ্রহণ করে)।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওফীক দাতা। হে আল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মদ এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীগণের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করুন। [স্থায়ী কমিটির ফাতাওয়া - ১৪/ ৪৪৯-৪৫০।]

প্রশ্ন/ আমি একজন দ্বীন পালনকারিনী মুসলিম নারী, আমার স্বামী হুক্কা পান করে, মাঝে মধ্যে আমাকে তা ঠিক করে আনতে বলেন, আমি যদি তা করি তাহলে কি আমি পাপী হব?

উত্তর: হুক্কা পান করা হারাম, আপনি যদি তা ঠিক করে দেন তাহলে আপনি পাপী হবেন, আল্লাহ বলেন: “তোমরা পরস্পরে পাপ ও আল্লাহ দ্রোহী কাজে সহযোগিতা করো না”। [সূরা মায়েদা: ২]

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওফীক দাতা। হে আল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মদ এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীগণের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করুন। [স্থায়ী কমিটির ফাতাওয়া - ২২/ ১৪৬-১৪৭।]

প্রশ্ন/ আমার মা ধূমপান করেন, আমি তা ক্রয় করে দেই, আমি মাকে তা ত্যাগ করার জন্য অনেক বলেছি এতে মা রাগান্বিত হন, এর হুকুম কি?

উত্তর: ধূমপান হারাম, আর তা পান করায় সহযোগিতা করাও হারাম।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওফীক দাতা। হে আল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মদ এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীগণের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করুন। [স্থায়ী কমিটির ফাতাওয়া - ২২/ ২০৬।]

প্রশ্ন/ এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল আল্লামা ইবনে উসাইমীন রহমাতুল্লাহ আলাইহকে: ধূমপান একটি ঘৃণিত বদভ্যাস এবং তা অপবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ ﴾ [ الاعراف : ١٥٧ ]

“তাদের জন্য ভাল পবিত্র জিনিস হালাল করা হয়েছে এবং তাদের উপর অপবিত্র জিনিসকে হারাম করা হয়েছে।” [সূরা আ‘রাফ: ১৫৭]। তাছাড়াও এটি বিভিন্ন রোগের কারণ। তারপরও আমরা পত্র পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখতে পাই কখনো এ থেকে সতর্ক করছে আবার কখনো এর উপকারিতা বর্ণনা করছে, এ মিথ্যা সংশয়ের হুকুম কি?

উত্তর: প্রশ্নকারী যা বলেছে যে, তা হারাম। এটাই সঠিক এবং হক্ক, কেননা তা পান করায় আর্থিক, শারিরীক এবং সামাজিক ক্ষতি হয়।

আর পত্র পত্রিকায় এর যে ক্ষতির দিক তুলে ধরা হয় তা এবং এর প্যাকেটের গায়ে যে সতর্কতা দেওয়া হয় তাতে তারা প্রশংসিত হবে, কেননা এতে পাপ কাজ ও আল্লাহদ্রোহী কাজ ত্যাগ করার জন্য সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু কোম্পানী ও বিক্রেতারা তা পানে উৎসাহমূলক যে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে তাতে পাপ ও আল্লাহদ্রোহী কাজে সহযোগিতা করা হয় এবং তা হারাম, কোনোক্রমেই তা প্রচার করা যাবে না। [ফাতাওয়া ও দিক নির্দেশনা পৃ: নং ৯১।]

প্রশ্ন/ এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল মিসরীয় মুফতি শাইখ নাসর ফরিদ ওয়াসেলকে: তামাক ব্যবসায়ী, প্রচারকারী এবং সাপ্লাইদাতা সম্পর্কে, ধূমপান থেকে বিরত থাকার জন্য আপনার দৃষ্টিতে ভাল পদ্ধতি কি?

উত্তর: পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, তামাক, এর প্রচারণা এবং সাপ্লাই করা হারাম এবং এর সাথে যা সম্পৃক্ত রয়েছে তাও শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম, কারণ এর দ্বারা ধূমপায়ী এবং তার সাথে উঠা বসা অন্যান্যদের ক্ষতি সাধন হয়। তারপরও এতে অপব্যয় রয়েছে যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ وَلَا تُسۡرِفُوٓاْۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُسۡرِفِينَ ﴾ [ الاعراف : ٣١ ]

“তোমরা খাও এবং পান কর, কিন্তু অপব্যয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সূরা আ‘রাফ: ৩১]

তিনি আরও বলেন:

﴿ وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِيرًا ٢٦ إِنَّ ٱلۡمُبَذِّرِينَ كَانُوٓاْ إِخۡوَٰنَ ٱلشَّيَٰطِينِۖ ﴾ [ الاسراء : ٢٦، ٢٧ ]

“তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করো না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীগণ শয়তানের ভাই।” [সূরা ইসরা: ২৬-২৭]

এজন্যে তামাক তৈরী, ক্রয় বিক্রয়, বিজ্ঞাপন এবং প্রচারের ক্ষেত্রে যার লেনদেন রয়েছে সে পাপী হবে, তার উপর আল্লাহর, ফেরেশ্তামণ্ডলীর এবং সকল মানুষের অভিশাপ বর্ষণ হবে।

এ থেকে বিরত থাকার উত্তম পদ্ধতি হলো: এ হারাম ব্যবসা মূলোৎপাটন করে কৌশলে সদোপদেশ দ্বারা মানুষের মন জাগিয়ে তুলতে হবে এবং এ ব্যবসার উৎসকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শক্তভাবে পর্যেবেক্ষণ করতে হবে। সেই সাথে নতুন প্রজন্মকে ইসলামী সুন্দর নীতিমালার উপর গড়ে তুলতে হবে। প্রচার মাধ্যম, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক দিকসহ অন্যান্য দিক গুলোকে এ ভয়াবহ বিপদের মোকাবেলা করার জন্য আন্তরিকতা এবং আমানতের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। তারপর ছেলে-মেয়েদের জন্য বাবা-মা’দের উত্তম নমুনা হতে হবে যেন তা আশান্বিত ফলাফল বয়ে আনে, আর তা হচ্ছে ধূমপান ত্যাগ করা। [ফাতাওয়া নং ৮৭২ প্রশ্ন নং ৮।]