hadith book logo

গল্পে আঁকা ইতিহাস ২ -অপরাধী ও পুলিশ

লেখকঃ আলী তানতাভী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

বিদায়, বিদায় হে দামেস্ক

শহরের পরিস্থিতি যখন কিছুটা শান্ত হয়ে এলো এবং আমাকে খুঁজে বের করার উৎসাহেও যখন ভাটা পড়লো তখন গৃহস্বামীকে আমার অন্তরের অন্তঃস্তলের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম, ‘আমি যদি বাগদাদ যেতে পারি তাহলে ভালো হয়?’

তিনি বললেন, ‘তিনদিন পর বাগদাদের উদ্দেশ্যে এক কাফেলা রওয়ানা হবে। সেই কাফেলায় ছদ্মবেশে শরীক হলেই ভালো হয়।’

সফরের ইন্তিযাম (ব্যবস্থা ও আয়োজন) কীভাবে হবে- তা ভেবে আমি চিন্তিত ছিলাম। কেননা আমার হাতে তখন কোনো উপায় বা সম্বল ছিলো না। সামান্য হাতখরচও ছিলো না। কিন্তু একটা ব্যবস্থা না করলে দূরের সফরে কীভাবে নামবো? এদিকে সংকোচের কারণে গৃহস্বামীকে কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারি নি। এমনিতেই দীর্ঘ চার মাস ধরে তাদের মহানুভবতা ও মেহমানদারির ভিতরে মায়ের আদরে ছিলাম, তার উপর নতুন করে তাদের কাছে কিছু চাইতে কিছুতেই আমার কৃতজ্ঞ মন সায় দিচ্ছিলো না। এসব ভাবতে ভাবতে প্রায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলাম।

কিন্তু কাফেলা যেদিন রওয়ানা হবে সেদিন ভোরে গৃহস্বামী ও তার স্ত্রী আমাকে বিদায় জানাতে এলেন। তখনই শুরু হলো,

আমার অবাক হওয়ার পালা!

কৃতজ্ঞতায় উদ্বেলিত হওয়ার পালা!

আনন্দে-উত্তেজনায়-আবেগে মাথা নীচু করার পালা!

অপূর্ণ চোখে দু’জন মহানুভব মানুষের মহানুভবতা দেখার পালা!

কী দেখলাম আমি?

আমি দেখলাম– এই তিনদিন তারা আমার চেয়েও বেশী ভেবেছেন আমার সফর নিয়ে! যাবতীয় ইন্তিযাম সম্পন্ন করে এখন তাঁরা আমাকে ‘বিদায়!’ বলতে এসেছেন। পাঁচ হাজার দিরহামের একটি থলে প্রায় জোর করে তারা আমার হাতে তুলে দিলেন!

তারপর?

তারপর বিনয়-বিগলিত হয়ে তারা আমার কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন!

কেন এই ক্ষমা?

এই ক্ষমা- তাঁদের দৃষ্টিতে মেহমানদারীতে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে বলে!

আমি তাদের আচরণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষাটুকুও হারিয়ে ফেললাম! মহানুভবতার এমন শীতলধারায় সিক্ত হলে জবাব দেবার ভাষা ক’জন খুঁজে পায়? আমি মুগ্ধ হলাম, ভীষণ মুগ্ধ। আমি সিক্ত হলাম, ভীষণ সিক্ত। মুগ্ধচিত্তের অভিব্যক্তি মেশানো ঝাপসা চোখে তাঁদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম! আমার ভাষাহীন চোখ দু’টো বলছিলো,

এরা মানুষ না ফেরেশতা?

মানুষ এতো ভালো হয়?

মানুষ এতো মহৎ হয়?

মানুষ কি এমন করে পারে- পরকে আপন করে নিতে?

এইসব মহৎ মানুষের জন্যেই বুঝি–

আজো পৃথিবীটা টিকে আছে?

রক্ষা পাচ্ছে মানবতার লাজ?

কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা বারবার নুয়ে এলো। হৃদয়-মন আপ্লুত হলো। কিন্তু হৃদয়ের সে ভাব প্রকাশ করার কোনো ভাষা বারবার চেষ্টা করেও আমি খুঁজে পেলাম না। মনে মনে শুধু প্রতীজ্ঞা করলাম আল্লাহ যদি কখনো সুযোগ দেন তাহলে একদিন এই মহানুভবতার প্রতিদান দেবো। দিতে চেষ্টা করবো।’