hadith book logo

গল্পে আঁকা ইতিহাস ২ -অপরাধী ও পুলিশ

লেখকঃ আলী তানতাভী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫

একদিকে আনন্দের বসন্ত-হাওয়া, আরেকদিকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ঝড়ো হাওয়া

এতোদিন পর অমন অপ্রত্যাশিতভাবে আমার প্রিয় মেজবানকে পেয়ে হৃদয় আমার কেমন আনন্দ-উদ্বেলিত হয়েছিলো তা বোঝাবার মতো কোনো উপমা আমার জানা নেই। মনে হচ্ছিলো- যেনো মহা মূল্যবান কোনো হীরকখণ্ড হারিয়ে হঠাৎ আবার আমি তা ফিরে পেয়েছি!

অথবা মনে হচ্ছিলো- আমার আনন্দ যেনো সেই জননীর মতো, যে হাজার হাজার বিনিদ্র রজনী অপেক্ষা করে প্রিয়তম সন্তানকে ফিরে পেয়েছে বুকের মাঝে! কিন্তু আনন্দোচ্ছাসে ভেসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তখন ছিলো না। কঠিন বাস্তবতা তার বিকট চেহারা নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলো।

আমার উপকারী বন্ধুকে কীভাবে আমি বর্তমান বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারি? খলীফার আদেশে আমারই যিম্মাদারিতে (দায়িত্বে) তিনি বন্দি। তার সম্পর্কে খলীফার কাছে আমাকেই জবাবদেহী করতে হবে।

দামেস্কে যিনি আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন আগামীকাল তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার জন্যে খলীফার পক্ষ থেকে আমি পাহারাদারি করছি- এরই নাম কি উপকারের প্রতিদান?!

কী করবো এখন আমি? তাঁকে বন্ধনমুক্ত করে শারাফাতের মর্যাদা রক্ষা করবো নাকি আগামীকাল খলীফার দরবারে তাকে হাজির করে খলীফার ওয়াফাদারি রক্ষা করবো?

তাকে মুক্তি দিলে আমাকে জীবন দিতে হবে। সেই সাথে আমার স্ত্রী-পুত্র ও পরিবার পরিজনের জীবনে নেমে আসবে চরম ভাগ্য বিপর্যয়। কেউ হবে এতীম, কেউ বিধবা। সুখী-স্বচ্ছল একটি পরিবার হঠাৎ হয়ে যাবে বে-সাহারা, ছিন্নমূল।

অন্যদিকে খলীফার সাথে ওয়াফাদারির পরিচয় দিলে আমার ও আমার পরিবারের ভবিষ্যত হবে নিরাপদ। ইজ্জত ও তরক্কীর রাস্তা হবে উন্মুক্ত। কিন্তু তখন আমি কি ছোট হয়ে যাবো না, নিজের চোখে?

পরিবারের চোখে?

আমার ছোট্ট সন্তানদের চোখে?

মানবতার চোখে?

আমার মহান মেজবানের চোখে?

এ-ধরনের পরস্পর-বিরোধী চিন্তা আমার অনুভূতিকে ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষত করে চললো। একবার ভাবি- পরিণতি যা হবার হোক, আমি আমার আশ্রয়দাতা ‘জীবনদাতা” বন্ধুর জীবন রক্ষা করবোই। কিন্তু পর মুহূর্তেই সেই ভাবনা তলিয়ে যায় প্রাণপ্রিয় স্ত্রী পুত্রের ভবিষ্যত চিন্তায়।

মনে হচ্ছিলো, আমার বুকে যেনো এক জগদ্দল পাথর চেপে বসেছে, যার ভারে আমার দম-যায়-যায়-অবস্থা। আমি দু’হাতে মাথা চেপে ধরলাম। ক্রমাগত ভাবতে লাগলাম। আমার মন বললো ‘খলীফার আদেশ পালন করাই তোমার কর্তব্য। তদুপরি পিতা ও স্বামী হিসাবেও রয়েছে তোমার দায়িত্ব।’

কিন্তু সামনে বসে থাকা দামেস্কের ‘জীবনদাতা’ বন্ধুর অসহায় মুখমণ্ডলে দৃষ্টি পড়া মাত্রই বিবেক আমাকে শাসন করে বললো, ‘প্রাণের মায়ায় ভুলে যাবে তুমি মানবতার মায়া?

ভুলে যাবে উপকারী বন্ধুকে!

এমনই কাপুরুষ তুমি?

নাহ! কাপুরুষতার অপবাদ আমি সইতে পারবো না!

আমার জীবনে কতো কঠিন ও নাজুক মুহূর্ত এসেছে।

কতো রক্তঝরা যুদ্ধের ময়দানে আমি তলোয়ার চালিয়েছি,

বীর বিক্রমে!

পাহাড় যখন টলে যায় তখনো আমি ছিলাম অটল!

হারানো দিনের সেই ঐতিহ্য তো আমার গরবের ধন!

সেই গর্বিত ইতিহাস সামনে নিয়ে আজ আমি সইবো- কাপুরুষতার অপবাদ?

অসম্ভব!

কিন্তু আজ আমি অন্য রকম এক কঠিন সঙ্কটের মুখোমুখি- যা জীবনে এই প্রথম।

কল্পনায় আমি আমার ও আমার পরিবারের ভবিষ্যত ছবি চিন্তা করলাম।

খলীফার রোষানলে পড়ে আমি পদচ্যুত হয়েছি।

কিংবা আমার নামে কতলের হুকুম জারি হয়েছে।

আমার এতীম ছেলেমেয়েরা অসহায় অবস্থায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।

আমার বিধবা স্ত্রী যিল্লতির জীবন-যাপন করছে।

উহ! আর কল্পনা করতে পারছি না!

আবার কল্পনা করলাম, আমার উপকারী বন্ধুকে আমি জল্লাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। আর সবাই আমাকে ‘ছি! ছি!!’ করছে। এমনকি আমার স্ত্রী-পুত্র-কন্যারাও -যাদের কাছে আমি বহুবার সেই উপকারী বন্ধুর কথা গল্প করেছি। আমাকে ‘ছি! ছি!!’ করছে।

চারদিকে একটানা ‘ছি! ছি!!’ শুনতে শুনতে আমি যেনো অস্থির হয়ে পড়লাম। অনন্যোপায় হয়ে আল্লাহর শরণাপন্ন হলাম।

আমার আল্লাহ! আমাকে পথ দেখাও!

বলে দাও আমার করণীয়!

আমার মেজবানের মর্যাদা তুমি রক্ষা করো!