hadith book logo

ইলমে গায়েব

লেখকঃ অধ্যাপক আবদুন নূর সালাফী (রহ.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

দ্বিতীয় ভ্রম

সীমালঙ্ঘনকারী বিদআতীরা কয়েকটি হাদীস দ্বারা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর গায়েব জানার সপক্ষে মতামত ব্যক্ত করে থাকে। তাদের প্রমাণপঞ্জির অন্যতম একটি হাদীস আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। একদা নবী করীম (সাঃ) ফজরের নামাযের জন্যে অনেক বিলম্বে কিন্তু সূর্য উদয়ের প্রাক্কালে তাড়াহুড়া করে বাড়ী থেকে বের হয়ে মাসজিদে আসলেন। ইকামত দেয়া হলে তিনি ছোট ছোট সূরা পড়ার মাধ্যমে নামায সংক্ষেপ করলেন। নামাযান্তে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে সকলকে স্ব স্ব স্থানে বসবার আদেশ প্রদান করে বললেনঃ

(আরবী)

আজ রাতে অযু করে নামাযে ভাগ্যে যতটুকু নামায লিপিবদ্ধ ছিল তা পড়েছি বটে কিন্তু নামাযে তন্দ্রাভিভূত হয়ে পড়েছি। এমনকি তন্দ্রা নিন্দ্রার আকার ধারণ করায় নিজেকে নিজের প্রতি ভারি বোধ করছিলাম। এমতাবস্থায় উৎকৃষ্ট আকৃতিতে মহান ও সমৃদ্ধ প্রভু পরওয়ারদেগারের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করলাম। আল্লাহ। তাআলা জিজ্ঞেস করলেনঃ হে মুহাম্মাদ! উত্তরে আরজ করলাম-হে আমার প্রভু পরওয়ারদেগার আমি উপস্থিত। (পুনরায়) আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, আকাশের ফেরেশতামণ্ডলী কিসের আলোচনা করছে? উত্তরে আরজ করলাম জানি না। এরূপ

প্রশ্নোত্তর তিনবার হয়েছিল। অতঃপর আমি আল্লাহকে তদীয় পবিত্র হাত আমার দু’স্কন্ধের মাঝে রাখতে দর্শন করলাম। শেষ পর্যন্ত তাঁর অঙ্গুলীসমূহের স্নিগ্ধতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম। ফলে সমুদয় বস্তুর তত্ত্ব আমার কাছে উদঘাটিত হয়ে গেল এবং আমি জানতে পারলাম। এবারে আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মাদ! উত্তরে আমি নিবেদন করে জানালামঃ হে প্রভু পরওয়ারদেগার! আমি তোমার আদেশ পালনের জন্য উপস্থিত। আল্লাহ বলেন, উর্ধ্বাকাশের ফেরেশতাগণ কিসের আলোচনা করছে? আমি নিবেদন করলামঃ তারা আলোচনা করছেন, অপরাধসমূহ কিসে বিদূরিত হয়।

তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন। সেগুলো কি? আমি উত্তর প্রদান করলামঃ পায়ে হেঁটে বিভিন্ন নামাযের জামাআতের সাথে পড়ার জন্য চলা, নামাযান্তে মসজিদসমূহে (আল্লাহর স্মরণের) জন্য উপবেশন করা, প্রচণ্ড শীতের সময় পূর্ণভাবে অযু করা। (অর্থাৎ এ কাজগুলো সম্পাদন করলে অপরাধসমূহ ক্ষমা হয়ে যায়।) অতঃপর আল্লাহ বললেনঃ আর কিসের আলোচনা করছে? উত্তরে আমি বললামঃ পদ মর্যাদাসমূহ কিসে বৃদ্ধি হয় সে নিয়ে আলোচনা করছেন

তিনি বললেন, সেগুলো কি? আমি বললাম, অন্নদান, নরম কথোপকথন এবং লোক সকল যখন গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত হয় তখন একাকী নামায পড়ন। অর্থাৎ এ কাজগুলো সম্পাদন করলে মর্যাদা বৃদ্ধি হয়।) আল্লাহ বললেন, ভিক্ষা চাও। আমি বললাম, হে আল্লাহ! মঙ্গল কার্য সাধনে অমঙ্গল থেকে বিরত থাকার, মিসকীনকে ভালবাসার, তুমি আমার প্রতি দয়া পরবশ হয়ে ক্ষমা প্রদান করবে তার এবং কোন জাতিকে বিপদগ্রস্ত করার ইচ্ছে পোষণ করলে আমাকে বিনা বিপদে তোমার কাছে তুলে নিবার প্রার্থনা জানাচ্ছি।

আমি আরও ভিক্ষা চাচ্ছি, যাতে করে আমি তোমায় ভালবাসি, যে তোমায় ভালবাসে, তাকে ভালবাসি এবং যে কাজ সম্পাদন করলে তোমার ভালবাসার নিকটবর্তী করে দেয় সে কাজকে ভালবাসি! অতঃপর রসূল (সাঃ) বললেনঃ এ ঘটনা সত্য। এ দু'আকে পাঠ কর। এ কলেমাগুলো মুখস্থ করে শিক্ষা দাও। হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন আহমদ ইবনে হাম্বল ও তিরমিযী। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। তিনি হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম বুখারীকে জিজ্ঞেস করলে, তিনি মন্তব্য করেছেন, হাদীসটি বিশুদ্ধ।

হাদীসটির সরল বঙ্গানুবাদ হৃদয়ঙ্গমের পর সীমালঙ্গনকারী বিদআতীদের (রসূলের গায়েব জান্তা হবার) প্রমাণ শুনুন। তারা বলে যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের হাত রসূল (সাঃ)-এর স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করার দরুন

রসূল (সাঃ) সমুদয় বিষয়ের তত্ত্ব জ্ঞাত হয়েছেন। একবার সমুদয় বিষয়ের তত্ত্ব অবহিত হবার অর্থ হচ্ছে, রসূল (সাঃ) চিরদিনের জন্য সমুদয় বিষয়ের তত্ত্ব জেনে ফেলেছেন। সুতরাং তিনি (রসূল সঃ) গায়েব জানতেন।

প্রিয় পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ গভীর মনোনিবেশের সাথে বিষয়টিকে হৃদয়ঙ্গম করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনারা হাদীসের সরল বঙ্গানুবাদে অবলোকন করেছেন, মুহাম্মাদ (সাঃ) নামাযের মধ্যে তন্দ্রা আসার অবস্থায় আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে তার উৎকৃষ্ট আকৃতিতে দর্শন লাভ করেছেন।

প্রশ্নোত্তরের পর তিনি (আল্লাহ) তাঁর পবিত্র হস্ত রসূল (সাঃ)-এর স্কন্ধ দ্বয়ের মাঝখানে স্থাপন করায় নভোমণ্ডলের ফেরেশতামণ্ডলী, কি বিষয়ে আলোচনা করছিলেন তা সাময়িকভাবে তিনি অবগত হন এবং (বলেন, সেখানকার) সব বিষয়ের তত্ত্ব আমার জন্য উদ্ভাসিত হয়ে গেল; এখানে একথাও সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ রব্বল আলামীন রসূল (সাঃ)-কে উর্ধ্বাকাশের ফেরেশতামণ্ডলী কি বিষয়ের আলোচনায় রত আছেন জিজ্ঞেস করেছেন? এবং তিনিই সে বিষয়গুলোর উত্তর প্রদান করেছেন। স্মরণ রাখবেন, আল্লাহর দর্শন, নভোমণ্ডলের সমস্ত অবস্থান দর্শন সবই সাময়িকভাবে হয়েছিল। কোন সময়ই সাময়িক জিনিস চিরস্থায়ী হয় না। যুক্তি বিদ্যায়ও সাময়িক জ্ঞান চিরস্থায়ী হবার কোন নজীর খুঁজে পাওয়া যায় না।

দেখলেন তো! সীমালঙ্ঘনকারী বিদআতীর ফল, স্ব-কপোল কল্পিত মর্যাদা দানকারীর দল কুরআন ও সুন্নাহয় কোন সুস্পষ্ট প্রমাণাদি খুঁজে না পেয়ে এদিক সেদিক থেকে ধানাই পানাই করে দু'চারটে কথা বানিয়ে বলার চেষ্টা করে থাকে। ধানাই পানাই করলে কি রসূল (সাঃ)-এর গায়েব জান্তা হবার প্রমাণ হয়? সত্যবাদী হলে কুরআন সুন্নাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা থেকে প্রমাণ করুন। অন্যথায় স্ব-কপোল কল্পিত মর্যাদা দেয়া থেকে বিরত থাকুন।

আল্লাহ রব্বল ইজ্জত কুরআন মাজীদে সুস্পষ্ট ভাষায় রসূল (সাঃ)-কে ব্যক্ত করতে বলেছেনঃ “হে মুহাম্মাদ বল! আমি গায়েব জানি না”- (সূরা আনআম ৫০)। এহেন সুস্পষ্ট ঘোষণার পরে রসূল (সাঃ)-কে গায়েব জান্তা বলার কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর গুণ-গরীমা ও মর্যাদা সর্বজনবিদিত। তিনি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তাই বলে আমরা তাঁকে সৃষ্ট জীবের আসন থেকে উন্নীত করে স্রষ্টার আসনে সমাসীন করতে পারি না। মনে রাখবেন! ভূত-ভবিষ্যৎ গোপন ও প্রকাশ্য জানা একমাত্র আল্লাহর গুণ। সর্বক্ষণে সমুদয় বিশ্বের অবস্থা সম্যকভাবে জ্ঞাত

থাকাও আল্লাহর গুণ। কেবলমাত্র এবং একমাত্র আল্লাহ রব্বল আলামীন যে গুণে গুণান্বিত, সে গুণ রসূল (সাঃ)-কে প্রদান করার অর্থ হচ্ছে, মুহাম্মাদ (সাঃ)-ও আল্লাহর সমকক্ষ? নাউযুবিল্লাহ! এরূপ ধারণা পোষণ করার অর্থ হচ্ছে, মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে সৃষ্ট জীব থেকে উন্নীত করে স্রষ্টার আসনে সমাসীন করার সমতুল্য। কোন মুসলমান এরূপ ধারণা করতে পারে না। আল্লাহর গুণ কোন সৃষ্ট জীবের আছে বলে যারা বিশ্বাস করে, তারা মূলত পৌত্তলিক। কারণ সৃষ্ট ও স্রষ্টা, কার্য ও কারণ কোন সময়ই এক হতে পারে না। যারা সৃষ্টকে স্রষ্টার গুণে গুণান্বিত করল, তারা আসলে সৃষ্টকে স্রষ্টার সমতুল্য করল এবং এরূপ ধারণা পোষণ করা স্পষ্ট শির্ক।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! মনোনিবেশ সহকারে পাঠ করুনঃ গভীর রাতে তাহাজ্জুদের নামাযে তার অবস্থায় মুহাম্মাদ (সাঃ) স্রষ্টাকে দর্শন করেছেন এবং মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র হাত স্কন্ধদ্বয়ের মাঝে স্থাপন করায় রসূল (সাঃ)-কে আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যা আছে এবং তার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্ষণিকের জন্য দেখানো হয়েছিল মাত্র। এতে নিখিল ধরণীর রহমতের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে, রসূল (সাঃ)-এর ক্ষণিকের জন্য যে তত্ত্বজ্ঞান লাভ তা সর্বক্ষণের জন্য ছিল না। এ বক্তব্যের সমর্থন নিয়ে উদ্ধৃত হাদীসগুলো থেকে পাওয়া যাবে।

এখানে স্মরণযোগ্য যে আল্লাহকে দর্শনের ঘটনা হুদায়বিয়া সন্ধির প্রাক্কালে সংঘটিত হয়েছিল, এর প্রমাণ রিজাল শাস্ত্রে ও হাদীসে বিদ্যমান আছে। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আপনারা বিদিত আছেন যে, ৬ষ্ঠ হিজরী সনে মুহাম্মাদ (সাঃ) ন্যুনাধিক ১৫০০ সহচরবৃন্দকে সাথে নিয়ে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদীন থেকে মক্কাভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। এ যাত্রায় রসূল (সাঃ) কুরবানীর পশু পালও সাথে নিয়েছিলেন। মক্কাবাসীদের প্রবল বাধা ও বিরোধিতার দরুন রসুল (সাঃ) হুদায়বিয়ায় কয়েকদিন অবস্থান করেন। উক্ত স্থানে কুরাইশদের সাথে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী রসূল (সাঃ)-কে সহচরবৃন্দগণ সমেত মদীনা মুনাওয়ারা প্রত্যাবর্তন করতে হয়। এমতাবস্থায় মুহাম্মাদ (সাঃ) সহচরবৃন্দকে সম্বোধন করে বললেন?

(আরবী)

“আমি যদি মদিনা থেকে বের হবার প্রাক্কালে জানতে পারতাম যা আমি এখন হুদায়বিয়ায় এসে) জানতে পারলাম, তবে কুরবানীর পশুপাল সঙ্গে নিয়ে আসতাম না।” হাদীসটি বুখারীর। স্বপ্নে আল্লাহকে দর্শন লাভের পর নবী (সাঃ) গায়েব জান্তা হয়ে গেলে এবং সর্বক্ষণের জন্য সর্ববিষয়ের তত্ত্বজ্ঞান তার জানা থাকলে তিনি কুরবানীর পশুপাল সঙ্গে নিয়ে মক্কাভিমুখে যাত্রা করতেন না। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হচ্ছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি (রসূল) জানতেন না যে কি হবে। সুতরাং তিনি গায়েব জানতেন না।

(আরবী)

সাহাল বিন সা’দ বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি রসূল (সাঃ)-এর গৃহ দ্বারের পর্দা উত্তোলন পূর্বক গৃহাভ্যন্তরে অবলোকন করেছিল। রসূল (সাঃ) দ্বার দেশের দিকে পিঠ রেখে একটা লোহার চিরুনী দ্বারা মাথার চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। তিনি লোহার চিরুনীটি মাটিতে রেখে দ্বার দেশের দিকে ফিরে লোকটিকে দেখেই বলে উঠলেনঃ যদি আমি পূর্বে জানতে পারতাম যে, তুমি গৃহাভ্যন্তরে অবলোকন করছ, তাহলে আমি এ লোহার চিরুনী দিয়ে তোমার চোখে আঘাত হানতাম।

এ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, লোকটির দিকে দেখার পূর্বে রসূল (সাঃ) জানতেন না যে, লোকটি গৃহাভ্যন্তরে অবলোকন করছিল।

(আরবী)

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু-এর বর্ণনা মতে নবী করীম (সাঃ) কখনও কখনও নগরের বাইরে গমন করে, প্রস্রাব করে তায়াম্মুম করতেন। আমি আরজ করে বলতামঃ “হে আল্লাহর রসূল! নিকটেই পানি আছে। তায়াম্মুমের প্রয়োজন কি? উত্তরে রসূল (সাঃ) বলতেন, “আমি অবগত নই যে, সে স্থান পর্যন্ত পৌঁছতে পারব

কিনা? অর্থাৎ আমি সেখানে পৌছার পূর্বেও পরলোক গমন করতে পারি। এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞানই নেই। এ হাদীস দ্বারাও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, রসূল (সাঃ) গায়েব জানতেন না।

উল্লিখিত ঘটনা প্রবাহ ব্যতীতও রসূল (সাঃ)-এর মাদানী জিন্দেগীতে বহু এরূপ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, যার দ্বারা প্রকাশ্য দিবালোকের মত প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) গায়েব জানতেন না। তন্মধ্যে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা-এর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ, বিষ মিশ্রিত গোশত খণ্ড ভক্ষণ ইত্যাদি সমধিক প্রসিদ্ধ।