hadith book logo

ইলমে গায়েব

লেখকঃ অধ্যাপক আবদুন নূর সালাফী (রহ.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

প্রথম ভ্রান্তি

যারা রসূলগণকে গায়েব জান্তা বলে মনে করে, তারা সূরা জীন-এর নিম্নলিখিত আয়াতের অর্ধেকাংশ প্রকাশ করে প্রমাণ করার চেষ্টা পায় যে, রসূলগণ গায়েব জানতেন।

(আরবী)

“আল্লাহই একমাত্র গায়েব জান্তা। তিনি কারো নিকট অদৃশ্য বিদিত করেন না, কিন্তু নির্বাচিত রসূলগণের কাছে অদৃশ্য বিদিত করেন।” অর্থাৎ তাদেরকে গায়েবের সংবাদ দেন। আল্লাহ তা'আলার অদৃশ্য বিদিত করেন মাত্র রসূলগণের নিকট। সুতরাং রসূলগণ গায়েব জানেন।

উত্তরঃ উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা কেবলমাত্র নবী ও রসূলগণকে গায়েবের সংবাদ ওয়াহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। এই প্রত্যাদেশসমূহ আদেশ বাচকও হতে পারে। যেমন তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর। অথবা এই ওয়াহী সংবাদ বাচক হতে পারে।

(আরবী)

“নিকটবর্তী অঞ্চলে রোমকগণ পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তারা এ পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয়ী হবে।” (সূরা রূম ১-২) প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! এক্ষণে সূরা জীনের পূর্ণ আয়াতের অর্থ শুনুন ও করুনঃ

(আরবী)

“আল্লাহই একমাত্র গায়েব জান্তা। তিনি কারোর নিকটে অদৃশ্য বিদিত করেন না। কিন্তু নির্বাচিত রসূলগণের কাছে অদৃশ্য বিদিত করেন। এই গায়েবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অগ্রে-পশ্চাতে রক্ষণশীল ফেরেশতা পাঠিয়েছেন যাতে করে আল্লাহ (প্রকাশ্য ‘ইলমের দ্বারা) জানতে পারেন যে, ফেরেশতামণ্ডলী আল্লাহর পয়গামকে অবিকল নবীগণের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সমুদয় বস্তুকে গণনা করে রেখেছেন”। (সূরা জীন ২৬-২৮)

এই আয়াতে যে গায়েবের সংবাদ নবীগণকে প্রদান করা হয় বলা হয়েছে, তা আল্লাহর প্রত্যাদেশ ছাড়া আর কিছুই নয়, কারণ আল্লাহ শরীয়ত সংক্রান্ত জ্ঞান-বিশ্বাস সংক্রান্ত হোক অথবা অবশ্য প্রতিপালনীয় হোক শুধু নবীগণকেই অবহিত করেন। সূরা আলে ইমরানের আয়াতটি আমাদের বক্তব্যের সমর্থন করছে।

(আরবী)

“আল্লাহর নিয়ম বহির্ভূত যে, তিনি তোমাদেরকে গায়েবের সংবাদ প্রদান করবেন: কিন্তু তিনি (এই গায়েবের সংবাদ প্রদানের জন্য) রসূলগণকে নির্বাচন করে থাকেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তদীয় রসূলগণের প্রতি ঈমান আন।” অর্থাৎ তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর- (সূরা আলে ইমরান ১৭৯)। এখানে গায়েবের সংবাদ রসূলগণকে প্রদান করা হয় বলা হয়েছে। আবার তার প্রতি ঈমান আনতে বলা হয়েছে। কারণ রসূলগণের কাছে যে গায়েবের সংবাদ আসত, সর্বসাধারণের মধ্যে প্রকাশের জন্য আসত। নবীগণ সে গায়েবের এক ক্ষুদ্র অংশও গোপন করতে সক্ষম ছিলেন না। আল্লাহ বলেন :

(আরবী)

হে রসূল! তোমার কাছে (প্রত্যাদেশ আকারে) যা কিছু অবতরণ করা হয়েছে, তার সবটুকু মানবমণ্ডলীর কাছে পৌছিয়ে দাও। মনে রেখ যদি তুমি এ প্রত্যাদেশের এক (ক্ষুদ্র) অংশও লোক সকলের নিকট প্রচার না কর, তবে তুমি আল্লাহর রিসালাতের (বার্তা বাহকের) কোন কাজই সম্পাদন করলে না- (সূরা আল-মায়িদা ৬৬)। সরওয়ারে কায়েনাত, মোফাখখারে মওজুদাত সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতি অর্পিত গুরু দায়িত্বকে পূর্ণমাত্রায় পালন করেছেন। আল্লাহ তা'আলা নিজেই প্রমাণ দিচ্ছেন?

(আরবী)

আমার রসূল গায়েবের সংবাদ (ওয়াহী) প্রকাশ করতে কোন ত্রুটি করেননি, কোন কৃপণতাও করেননি- (সূরা তাকবীর ২৪)। অর্থাৎ যা কিছু প্রত্যাদেশরূপে এসেছিল তার সবটুকুই তিনি পৌছিয়ে দিয়েছেন।

মূল কথা এই যে, আকাশে বাতাসে, জলে, স্থলে, নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে এবং দিবারাত্রি ঘটনা প্রবাহের বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতের জ্ঞান রসূল (সাঃ)-এর ছিল না। অন্য কথায় তিনি গায়েব জানতেন না।

প্রিয় পাঠক-পাঠিকার কাছে সূরা আল-বাকারার নিম্নলিখিত আয়াতের বক্তব্য রেখে বিচারের আবেদন জানাচ্ছি।

(আরবী)

আল্লাহর অগাধ জ্ঞানের এক ক্ষুদ্র অংশকেও কেউ আয়ত্ব করতে পারে না। আল্লাহ যতটুকু ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত- (সূরা আল-বাকারা ২৫৫)। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মানব, দানব, ফেরেশতা ইত্যাদিকে যে জ্ঞান প্রদান করেছেন, তা ইল্লা বিমা-শা-য়া” এর অন্তর্ভুক্ত। এটা আবাল বৃদ্ধবনিতা বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সকলকে বেষ্টন করেছে। এর বাইরে যাবার কারোর ক্ষমতা হয়নি, হবেও না। পৃথিবীর অধিবাসীবৃন্দ যে পরমাণ জ্ঞান আহরণ করেছে এবং ভবিষ্যতে করবে, তা বিজ্ঞান সংক্রান্ত হোক, কারিগরি সংক্রান্ত হোক অথবা অন্য কোন বিষয় সংক্রান্ত হোক এবং তার ধারক বিশ্বাসী হোক, অবিশ্বাসী হোক, পৌত্তলিক হোক, নাস্তিক হোক তা ইল্লা-বিমা-শা-য়া” এর অন্তর্ভুক্ত। এ জ্ঞানগুলোকে আল্লাহ শিক্ষা প্রদান করেছেন। এরশাদ হচ্ছেঃ

(আরবী)

তোমরা যা জানতে না, আল্লাহ তা তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন- (সূরা আল-বাকারা ২৩৯)। আমাদের মধ্যে কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ অর্থনীতিবিদ, কেউ সমাজনীতিবিদ, কেউ আইন শাস্ত্রবিদ, কেউ ফিকাহ শাস্ত্রবিদ, কেউ কুরআন ও সুন্নাহর পারদর্শী পণ্ডিত, কেউ বিজ্ঞানী কারিগর। সকলের জ্ঞান ‘ইল্লা বিমা-শা-য়া’ এর অন্তর্ভুক্ত এবং তা অতি সামান্য ও নগণ্য। আল্লাহ বলেন :

(আরবী)

“তোমাদেরকে জ্ঞানের অতি সামান্য অংশ প্রদান করা হয়েছে”- (সূরা বানী ইসরাঈল ৮৫)। নবী, অলী, জীন, ফেরেশতা এবং আদম সন্তানাদিগকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, তোমরা সামান্য জ্ঞানের অধিকারী। সামান্য জ্ঞানের অধিকারী হয়ে জলে, স্থলে, খেচরে, ভূচরে, ভূমণ্ডলে, নভোমণ্ডলে এবং বিভিন্ন মণ্ডলে যা কিছু আছে, সেগুলোকে সমষ্টিগতভাবে একই সাথে কোন সৃষ্টজীব জানে না, জানতে পারে না, জানার দাবীও করতে পারে না। সুতরাং কোন সৃষ্টজীব গায়েবও জানে না।

মুহাম্মাদ (সাঃ) ও এ সৃষ্টজীবের অন্তর্ভুক্ত। সেজন্যে তিনিও গায়েব জানেন না। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা নবীগণকে যে বিশেষ ‘গায়েব’ সম্পর্কে অবহিত করার কথা বলেছেন, তা ছিল ধর্ম সংক্রান্ত। রসূলগণ প্রত্যাদেশ আকারে যে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেছিলেন, তার সবগুলোকে তারা আপনার উম্মতবর্গের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছেন। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, কোন তত্ত্ব ফাঁস হবার পর তা আর গায়েব থাকে না।

এ দীর্ঘ আলোচনার ফল এ দাঁড়াল যে, কোন রসূল, অলী, জীন ও ফেরেশতা কেউই গায়েব জানে না। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ উল্লিখিত মহাজনদের মধ্যে কাউকে। গায়েব জান্তা বলে মনে করে তাহলে সে হানাফী বিদ্বানগণের সম্মিলিত ফতওয়া অনুযায়ী কাফের হয়ে যাবে। পূর্বে আমরা সে মতগুলো উল্লেখ করেছি। এক্ষণে দ্বিরুক্তি করব না।