১
ইলমে গায়েব
লেখকঃ অধ্যাপক আবদুন নূর সালাফী (রহ.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
ইলমে গায়েব বলতে অদৃশ্য ও অবিদিত জ্ঞানকেবুঝায়
ইলমে গায়েবকে কেন্দ্র করে নানা প্রকার শির্কের এবং নানা প্রকার ভ্রান্ত ধারণার বুৎপত্তি হয়েছে। সমস্ত প্রাণী ও বস্তুর অবস্থা সম্যকভাবে জানেন যে সত্তা, তার নাম আল্লাহ। বস্তুত আল্লাহ ব্যতীত গায়েব জানার কেউই নেই৷ ‘ইলমে গায়েব তওহীদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর প্রতি ঈমান নিয়ে আসা ও বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেকটি মানুষের প্রতি অপরিহার্য।
এজন্যেই নির্ভেজাল ও খাঁটি তাওহীদবাদী মুসলমানদের বিশ্বাস যে, নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে আল্লাহ ছাড়া কেউই অদৃশ্য জানার নেই। আমি, আপনি ও পৃথিবীর সমুদয় প্রাণী ও বস্তুর অবস্থা তিনি সম্যকভাবে অবগত। তিনি অধঃলোক ও উর্ধ্বলোকে অবস্থিত সকল প্রাণী, জীব ও বস্তুর বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতকে একই সাথে জানেন। তিনি আকাশে, বাতাসে, খেচরে, ভুচরে, জলে ও স্থলে অবস্থিত প্রাণীকূলের মনের ভেদ ও অন্তরের পরিকল্পনা সদা জ্ঞাত। মোট কথা, ‘ইলমে গায়েব বলতে যা বুঝায় তাতে আল্লাহর কোনই শরীক নেই। আল্লাহ বলেনঃ
(আরবী)
“হে মুহাম্মাদ বল, আল্লাহ ব্যতীত নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের কেউই গায়েবের সম্পর্কে অবগত হতে পারে না।” (সূরা আন-নামল ৬৫) এ আয়াতের আলোকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহই গায়েব জানেন। তিনি ব্যতীত কোন নবী, অলী, পীর, বুযুর্গ, জীন-পরী ও ফেরেশতা গায়েবের তত্ত্বজ্ঞান রাখেন না এবং সৃষ্টজীবের কেউই গায়েব সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নন। মূলতঃ একমাত্র আল্লাহই গায়েব সম্পর্কে অবগত।
আল্লাহ বলেনঃ
“উপস্থিত অনুপস্থিত সকলের জান্তা তিনি।”
অর্থাৎ দ্যুলোকে, ভূলোকে যা কিছু প্রকাশ্যে বিরাজ করছে এবং যেসব বস্তু ও প্রাণী গোপনে বিরাজ করছে তাদের সকলের অবস্থা একই সাথে জানেন যে সত্ত্বা, সে সত্ত্বার নামই হচ্ছে আল্লাহ।
কুরআন মাজীদের অসংখ্য আয়াতে গায়েব সম্বন্ধে বলা হয়েছে। সে আয়াতগুলোর কিছু উদ্ধৃত করে পাঠকবৃন্দকে উপহার দেব যাতে করে এ বিষয়ে সৃষ্ট ভ্রান্তি দূর হয় ও সত্য উদঘাটিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
(আরবী)
“অদৃশ্য জগতের কুঞ্জিগুলো (ভাণ্ডারগুলো) তাঁরই অবগত। তিনি ব্যতীত আর কেউই সে সম্বন্ধে অবগত নয়; (তার জ্ঞান এত প্রশস্ত যে,) স্থল ও জলের সব কিছুই তিনি অবগত আছেন তার অগোচরে গাছের একটি পাতাও খসে পড়ে না। ভূগর্ভস্থ অন্ধকার পুঞ্জের প্রত্যেকটি শস্যবীজ এবং প্রত্যেকটি সরল ও নীরস সমস্তই তাঁর জ্ঞানের পরিধির মধ্যে সুস্পষ্ট কিতাবে (লৌহে মাহফুজে) সন্নিবেশিত।” সূরা আল-আনআম ৫৯ )
অদৃশ্য জগতের যত ভাণ্ডার আছে, বিশাল পৃথিবী ও জলরাশির মধ্যে লুক্কায়িত যা কিছু আছে তার তত্ত্বজ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে আছে। লক্ষ কোটি তরুলতার একটি পাতাও তার অগোচরে ঝরে পড়ে না এবং ভূগর্ভস্থ অন্ধকার পুঞ্জের নিভত কোণে অবস্থিত কোন একটি শস্য কণাও তার অগোচরে বিরাজ করে না। এমনকি লক্ষ কোটি তরুলতার মধ্যে কোনটির কত সরস ও কোটির কত নীরস পাতা আছে, তার সঠিক জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহরই আছে।
সরস ও নীরস বলতে সমস্ত প্রকারের পদার্থকে বুঝাচ্ছে। এটা আরবীর বাগধারা বিশেষ। এর দ্বারা সাকুল্য প্রতিপন্ন করাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা ইলমে গায়েবের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন কতকগুলো তত্ত্বজ্ঞানের সন্ধান দিয়েছেন যেখানে কোন মানব, দানব ও ফেরেশতার নাক গলে না; সে অদৃশ্য ও গোপন ভাণ্ডারের সঠিক জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহই রাখেন। উল্লিখিত বিষয় ও বস্তুসমূহের সম্বন্ধে নবী, অলী ও ফেরেশতাদের কোন জ্ঞানই নেই। আর থাকতেও পারে না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন যতটুকু শিক্ষা দিয়েছেন ততটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করা সম্ভব৷ স্মরণ রাখবেন!
আল্লাহ কোন বিষয়ের সঠিক জ্ঞানের সন্ধান দান করার পরে তা আর গায়েব (অজানা) থাকে না। সূরা আল-বাকারাতে সংক্ষিপ্ত কথায় অথচ ব্যাপকভাবে আল্লাহর গায়েব জানার কথা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন :
(আরবী)
“তাঁদের (সৃষ্টজীব ও বস্তুর) অগ্র ও পশ্চাৎ সমস্তই তিনি বিদিত থাকেন; বস্তুত তাঁর জ্ঞানের অতি সামান্য অংশও মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টজীব আয়ত্ব করতে পারে -তবে যেটুকু তিনি ইচ্ছে করেন।” (সূরা আল-বাকারা ২৫৫)
আল্লাহ এমন মহান সত্তা যিনি সমূদয় প্রাণী, জীব ও বস্তুর আগের ও পিছনের সমস্ত অবস্থা সম্যকভাবে বিদিত আছেন এবং আল্লাহ এ ভাব পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তোলার জন্য দু'একটা উদাহরণ দিয়ে প্রাণী জীব ও বস্তুর অগ্র-পশ্চাৎ এর অর্থ বুঝানোর প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। একটা মৌমাছিকে সামনে রেখে মনোনিবেশ সহকারে দেখুনঃ ওর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কতগুলো? ওর পা কতগুলো? চক্ষু কতগুলো? ওর আত্মা ও হৃৎপিণ্ড কতটুকু? ওর সন্তান জন্মাবার প্রণালীটি কি?
এক্ষণে মা বাইনা আইদীহিম' অর্থাৎ ওর ভাবী বংশের সম্বন্ধে গবেষণা করুন ও ঐ মৌমাছিটার সন্তানাদি কতগুলো হবে এবং ওদের নাতী পৌত্র কতগুলো হবে এবং কারা হবে? অতঃপর পৃথিবী লয় পর্যন্ত ওদের সন্তানাদি কতগুলো হবে এবং কারা কারা হবে?
এবারে ‘মা খালফাহুম’ অর্থাৎ ওর অতীত নিয়ে গবেষণা করুন। ঐ মৌমাছিটার নানী ও দাদী কে ছিল? এভাবে ওদের বংশ তালিকা গিয়ে সর্বপ্রথম সৃষ্ট মৌমাছির নামে কুষ্ঠিনামা মিলে গেল? অনুরূপভাবে প্রত্যেকটি প্রাণীজীবকে সামনে রেখে গবেষণা ও চিন্তা ভাবনা করুন।
দ্বিতীয় উদাহরণঃ প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আপনাদের সামনের এক শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা করে দেখুন ও বর্তমানে সেখানে কি ফসল আছে? তাতে কতটুকু ফসল উৎপাদন হতে পারে? আগামী বছরে তাতে কি কি ফসল উৎপাদন হবে? এর পরের বছর ও তার পরের বছর তাতে কি কি ফসল জন্মিবে? এভাবে ঐ ভূখণ্ডে প্রলয় দিবস পর্যন্ত কি কি শস্য উৎপাদন হবে?
এবারে ‘মা খালফাহুম' অর্থাৎ ঐ ভূখণ্ডে বিগত বছরগুলোতে কি কি এবং কতটুকু ফসল জন্মেছিল? ভূমি সৃষ্টির পর থেকে ঐ ভূখণ্ডে কি কি এবং কি পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হয়েছিল?
তৃতীয় উদাহরণঃ একটি জলাশয়ের কথা চিন্তা করুনঃবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, ওতে কোটি কোটি কীট বিচরণ করছে। ঐ পানিতে বর্তমানে কি আছে? ভবিষ্যতে কি কি জিনিস বাস করবে? আবার ঐ পানিতে সৃষ্টির পর থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত কি কি প্রাণী বাস করেছিল? এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই আছে। আসলে সৃষ্টজীবের বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতের জ্ঞান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত (এগুলো আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না)। জানতে পারে না। আমরা উদাহরণ দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের সঠিক জ্ঞানের কথা বলছি মাত্র।
তাছাড়া এর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করতে অক্ষম। আলোচ্য আয়াতের “ওয়ালা ইউহীতুনা বিশাইয়্যিম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা-শাআ” এর ব্যাখ্যায় মাওলানা আকরাম খাঁ বলেছেনঃ “তাহার জ্ঞানের সামান্য অংশও মানুষের আয়ত্তে আসিতে পারে না। যেটুকু তাহারা পায়, তাহাও আল্লাহরই দান। ফানুস উড়ানোর খেয়াল মানুষের চিরদিন ছিল, এখনও আছে। কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টি রাজ্যের অনন্ত রহস্যের এক কণা মাত্র তাহারা আজও আয়ত্ত করিতে পারে নাই, কখনও পারিবে না। সুতরাং বিশ্ব বৃহস্য চিরকালই মানুষের অজ্ঞাত থাকিয়া যাইবে।” তফসিরুল কুরআন ১ম খণ্ড ৩৪৩ পৃঃ) বিশ্ব রহস্য কেন আমাদের কাছে অনুদঘাটিত থাকবে না? এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
(আরবী)
“আর প্রকৃত অবস্থা এই যে, তোমার পরওয়ারদেগারের ফৌজগুলোর বৃত্তান্ত তিনি ব্যতীত আর কেউই অবগত নয়”- (সূরা মুদ্দাসসির ৩১ আয়াতের শেষাংশ)। অর্থাৎ সৃষ্টজীব ও বস্তুকে একমাত্র আল্লাহই জানেন।
স্মরণ রাখবেন! সমুদয় বিশ্বের যাবতীয় প্রাণী জীব ও বস্তুর বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতের সর্বদা সঠিক জ্ঞানকে ‘ইলমে গায়েব এবং যে সত্তা এত অসীম জ্ঞান রাখেন, তাঁকে ‘গায়েব দা বা অদৃশ্য জান্তা বলে। এরূপ জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই অবধারিত ও নির্দিষ্ট। কুরআন সুন্নহর নির্দেশ মতো কোন নবী, অলী,
ফেরেশতা, জীন ও পরী গায়েব জানে না। এক্ষণে যদি কোন ব্যক্তি, কোন নবী, অলী ও অন্য কাউকে গায়েব দা ও অদৃশ্য জান্তা বলে মনে করে, তাহলে সে ব্যক্তি মূলত অন্যকে আল্লাহর সমতুল্য বলে মনে করল এবং কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী আকীদা পোষণ করার জন্যে তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা হবে। হানাফী ফিকাহ শাস্ত্রবিদ পণ্ডিতগণের ফাতাওয়া অনুযায়ী অনুরূপ মত পোষণকারীকে কাফের বলা যাবে। একথা অন্যত্র উদ্ধৃতিসহ উল্লেখ করেছি। দ্বিরুক্তির ভয়ে শুধু সংক্ষেপে তাদের বক্তব্য পেশ করলাম। আপনারা বরযখ সাধন ও তাসাউওরে শায়েখ অধ্যায়ে পাঠ করেছেন যে, তাসাওফপন্থী বিদআতীগণ বরযখ সাধনের মাধ্যমে এবং গুরুধ্যানকারীরা গুরুধ্যানের মাধ্যমে পীর বাবাকে অধিগম্য হিসাবে গায়েব দা বা অদৃশ্য জ্ঞান বা অদৃশ্য জান্তা বলে মনে করে থাকে।
আল্লাহ বলেন : তিনি ব্যতীত কেউই গায়েব জানে না কিন্তু তথাকথিত জাহেল পীরের ততোধিক জাহেল মুরীদ নিজেদের গুরুকে অধিগম্য হিসাবে গায়েব জান্তা বলে বিশ্বাস করে। এবারে বলুন? আল্লাহ সত্যবাদী? না অজ্ঞ মুরীদ সত্যবাদী? আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন, আল্লাহ সত্যবাদী। তাহলে যারা পীর বাবাকে গায়েব জান্তা বলে মনে করল, তারা পীর বাবাকে আল্লাহর সমতুল্য জ্ঞান করল। এদিক দিয়ে অনুরূপ আকীদা পোষণকারীর দল পৌত্তলিক। যারা আল্লাহর সত্তাকে অবিশ্বাস করে, তারা কাফের।
কিন্তু যারা তাসাউওরে শায়েখ বা পীরের মূর্তি আপনাদের হৃদয়পটে অঙ্কন করে তারা কাফের ও পৌত্তলিক উভয়ই। অনুরূপভাবে, অদ্বৈতবাদীরা স্রষ্টা ও সৃষ্ট জীবের মধ্যে পার্থক্য অস্বীকার করে এবং কার্য ও কারণকে এক বলে বিশ্বাস করে। এদের বিশ্বাস মতে সমস্ত সৃষ্ট জীবের মধ্যে আল্লাহ বিরাজ করছে। একটু তপ-জপ করলে প্রকাশ্য ব্যবধান দূর হয়ে যায়। তাদের মতে মূলত সকলেই আল্লাহর অবতার। এ দলের অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন মনছুর হাল্লাজ। অদ্বৈতবাদীরা কাফের ও পৌত্তলিক উভয়ই।
এজন্যেই নির্ভেজাল ও খাঁটি তাওহীদবাদী মুসলমানদের বিশ্বাস যে, নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে আল্লাহ ছাড়া কেউই অদৃশ্য জানার নেই। আমি, আপনি ও পৃথিবীর সমুদয় প্রাণী ও বস্তুর অবস্থা তিনি সম্যকভাবে অবগত। তিনি অধঃলোক ও উর্ধ্বলোকে অবস্থিত সকল প্রাণী, জীব ও বস্তুর বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতকে একই সাথে জানেন। তিনি আকাশে, বাতাসে, খেচরে, ভুচরে, জলে ও স্থলে অবস্থিত প্রাণীকূলের মনের ভেদ ও অন্তরের পরিকল্পনা সদা জ্ঞাত। মোট কথা, ‘ইলমে গায়েব বলতে যা বুঝায় তাতে আল্লাহর কোনই শরীক নেই। আল্লাহ বলেনঃ
(আরবী)
“হে মুহাম্মাদ বল, আল্লাহ ব্যতীত নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের কেউই গায়েবের সম্পর্কে অবগত হতে পারে না।” (সূরা আন-নামল ৬৫) এ আয়াতের আলোকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহই গায়েব জানেন। তিনি ব্যতীত কোন নবী, অলী, পীর, বুযুর্গ, জীন-পরী ও ফেরেশতা গায়েবের তত্ত্বজ্ঞান রাখেন না এবং সৃষ্টজীবের কেউই গায়েব সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নন। মূলতঃ একমাত্র আল্লাহই গায়েব সম্পর্কে অবগত।
আল্লাহ বলেনঃ
“উপস্থিত অনুপস্থিত সকলের জান্তা তিনি।”
অর্থাৎ দ্যুলোকে, ভূলোকে যা কিছু প্রকাশ্যে বিরাজ করছে এবং যেসব বস্তু ও প্রাণী গোপনে বিরাজ করছে তাদের সকলের অবস্থা একই সাথে জানেন যে সত্ত্বা, সে সত্ত্বার নামই হচ্ছে আল্লাহ।
কুরআন মাজীদের অসংখ্য আয়াতে গায়েব সম্বন্ধে বলা হয়েছে। সে আয়াতগুলোর কিছু উদ্ধৃত করে পাঠকবৃন্দকে উপহার দেব যাতে করে এ বিষয়ে সৃষ্ট ভ্রান্তি দূর হয় ও সত্য উদঘাটিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
(আরবী)
“অদৃশ্য জগতের কুঞ্জিগুলো (ভাণ্ডারগুলো) তাঁরই অবগত। তিনি ব্যতীত আর কেউই সে সম্বন্ধে অবগত নয়; (তার জ্ঞান এত প্রশস্ত যে,) স্থল ও জলের সব কিছুই তিনি অবগত আছেন তার অগোচরে গাছের একটি পাতাও খসে পড়ে না। ভূগর্ভস্থ অন্ধকার পুঞ্জের প্রত্যেকটি শস্যবীজ এবং প্রত্যেকটি সরল ও নীরস সমস্তই তাঁর জ্ঞানের পরিধির মধ্যে সুস্পষ্ট কিতাবে (লৌহে মাহফুজে) সন্নিবেশিত।” সূরা আল-আনআম ৫৯ )
অদৃশ্য জগতের যত ভাণ্ডার আছে, বিশাল পৃথিবী ও জলরাশির মধ্যে লুক্কায়িত যা কিছু আছে তার তত্ত্বজ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে আছে। লক্ষ কোটি তরুলতার একটি পাতাও তার অগোচরে ঝরে পড়ে না এবং ভূগর্ভস্থ অন্ধকার পুঞ্জের নিভত কোণে অবস্থিত কোন একটি শস্য কণাও তার অগোচরে বিরাজ করে না। এমনকি লক্ষ কোটি তরুলতার মধ্যে কোনটির কত সরস ও কোটির কত নীরস পাতা আছে, তার সঠিক জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহরই আছে।
সরস ও নীরস বলতে সমস্ত প্রকারের পদার্থকে বুঝাচ্ছে। এটা আরবীর বাগধারা বিশেষ। এর দ্বারা সাকুল্য প্রতিপন্ন করাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা ইলমে গায়েবের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন কতকগুলো তত্ত্বজ্ঞানের সন্ধান দিয়েছেন যেখানে কোন মানব, দানব ও ফেরেশতার নাক গলে না; সে অদৃশ্য ও গোপন ভাণ্ডারের সঠিক জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহই রাখেন। উল্লিখিত বিষয় ও বস্তুসমূহের সম্বন্ধে নবী, অলী ও ফেরেশতাদের কোন জ্ঞানই নেই। আর থাকতেও পারে না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন যতটুকু শিক্ষা দিয়েছেন ততটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করা সম্ভব৷ স্মরণ রাখবেন!
আল্লাহ কোন বিষয়ের সঠিক জ্ঞানের সন্ধান দান করার পরে তা আর গায়েব (অজানা) থাকে না। সূরা আল-বাকারাতে সংক্ষিপ্ত কথায় অথচ ব্যাপকভাবে আল্লাহর গায়েব জানার কথা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন :
(আরবী)
“তাঁদের (সৃষ্টজীব ও বস্তুর) অগ্র ও পশ্চাৎ সমস্তই তিনি বিদিত থাকেন; বস্তুত তাঁর জ্ঞানের অতি সামান্য অংশও মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টজীব আয়ত্ব করতে পারে -তবে যেটুকু তিনি ইচ্ছে করেন।” (সূরা আল-বাকারা ২৫৫)
আল্লাহ এমন মহান সত্তা যিনি সমূদয় প্রাণী, জীব ও বস্তুর আগের ও পিছনের সমস্ত অবস্থা সম্যকভাবে বিদিত আছেন এবং আল্লাহ এ ভাব পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তোলার জন্য দু'একটা উদাহরণ দিয়ে প্রাণী জীব ও বস্তুর অগ্র-পশ্চাৎ এর অর্থ বুঝানোর প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। একটা মৌমাছিকে সামনে রেখে মনোনিবেশ সহকারে দেখুনঃ ওর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কতগুলো? ওর পা কতগুলো? চক্ষু কতগুলো? ওর আত্মা ও হৃৎপিণ্ড কতটুকু? ওর সন্তান জন্মাবার প্রণালীটি কি?
এক্ষণে মা বাইনা আইদীহিম' অর্থাৎ ওর ভাবী বংশের সম্বন্ধে গবেষণা করুন ও ঐ মৌমাছিটার সন্তানাদি কতগুলো হবে এবং ওদের নাতী পৌত্র কতগুলো হবে এবং কারা হবে? অতঃপর পৃথিবী লয় পর্যন্ত ওদের সন্তানাদি কতগুলো হবে এবং কারা কারা হবে?
এবারে ‘মা খালফাহুম’ অর্থাৎ ওর অতীত নিয়ে গবেষণা করুন। ঐ মৌমাছিটার নানী ও দাদী কে ছিল? এভাবে ওদের বংশ তালিকা গিয়ে সর্বপ্রথম সৃষ্ট মৌমাছির নামে কুষ্ঠিনামা মিলে গেল? অনুরূপভাবে প্রত্যেকটি প্রাণীজীবকে সামনে রেখে গবেষণা ও চিন্তা ভাবনা করুন।
দ্বিতীয় উদাহরণঃ প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আপনাদের সামনের এক শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা করে দেখুন ও বর্তমানে সেখানে কি ফসল আছে? তাতে কতটুকু ফসল উৎপাদন হতে পারে? আগামী বছরে তাতে কি কি ফসল উৎপাদন হবে? এর পরের বছর ও তার পরের বছর তাতে কি কি ফসল জন্মিবে? এভাবে ঐ ভূখণ্ডে প্রলয় দিবস পর্যন্ত কি কি শস্য উৎপাদন হবে?
এবারে ‘মা খালফাহুম' অর্থাৎ ঐ ভূখণ্ডে বিগত বছরগুলোতে কি কি এবং কতটুকু ফসল জন্মেছিল? ভূমি সৃষ্টির পর থেকে ঐ ভূখণ্ডে কি কি এবং কি পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হয়েছিল?
তৃতীয় উদাহরণঃ একটি জলাশয়ের কথা চিন্তা করুনঃবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, ওতে কোটি কোটি কীট বিচরণ করছে। ঐ পানিতে বর্তমানে কি আছে? ভবিষ্যতে কি কি জিনিস বাস করবে? আবার ঐ পানিতে সৃষ্টির পর থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত কি কি প্রাণী বাস করেছিল? এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই আছে। আসলে সৃষ্টজীবের বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতের জ্ঞান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত (এগুলো আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না)। জানতে পারে না। আমরা উদাহরণ দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের সঠিক জ্ঞানের কথা বলছি মাত্র।
তাছাড়া এর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করতে অক্ষম। আলোচ্য আয়াতের “ওয়ালা ইউহীতুনা বিশাইয়্যিম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা-শাআ” এর ব্যাখ্যায় মাওলানা আকরাম খাঁ বলেছেনঃ “তাহার জ্ঞানের সামান্য অংশও মানুষের আয়ত্তে আসিতে পারে না। যেটুকু তাহারা পায়, তাহাও আল্লাহরই দান। ফানুস উড়ানোর খেয়াল মানুষের চিরদিন ছিল, এখনও আছে। কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টি রাজ্যের অনন্ত রহস্যের এক কণা মাত্র তাহারা আজও আয়ত্ত করিতে পারে নাই, কখনও পারিবে না। সুতরাং বিশ্ব বৃহস্য চিরকালই মানুষের অজ্ঞাত থাকিয়া যাইবে।” তফসিরুল কুরআন ১ম খণ্ড ৩৪৩ পৃঃ) বিশ্ব রহস্য কেন আমাদের কাছে অনুদঘাটিত থাকবে না? এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
(আরবী)
“আর প্রকৃত অবস্থা এই যে, তোমার পরওয়ারদেগারের ফৌজগুলোর বৃত্তান্ত তিনি ব্যতীত আর কেউই অবগত নয়”- (সূরা মুদ্দাসসির ৩১ আয়াতের শেষাংশ)। অর্থাৎ সৃষ্টজীব ও বস্তুকে একমাত্র আল্লাহই জানেন।
স্মরণ রাখবেন! সমুদয় বিশ্বের যাবতীয় প্রাণী জীব ও বস্তুর বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও অতীতের সর্বদা সঠিক জ্ঞানকে ‘ইলমে গায়েব এবং যে সত্তা এত অসীম জ্ঞান রাখেন, তাঁকে ‘গায়েব দা বা অদৃশ্য জান্তা বলে। এরূপ জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই অবধারিত ও নির্দিষ্ট। কুরআন সুন্নহর নির্দেশ মতো কোন নবী, অলী,
ফেরেশতা, জীন ও পরী গায়েব জানে না। এক্ষণে যদি কোন ব্যক্তি, কোন নবী, অলী ও অন্য কাউকে গায়েব দা ও অদৃশ্য জান্তা বলে মনে করে, তাহলে সে ব্যক্তি মূলত অন্যকে আল্লাহর সমতুল্য বলে মনে করল এবং কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী আকীদা পোষণ করার জন্যে তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা হবে। হানাফী ফিকাহ শাস্ত্রবিদ পণ্ডিতগণের ফাতাওয়া অনুযায়ী অনুরূপ মত পোষণকারীকে কাফের বলা যাবে। একথা অন্যত্র উদ্ধৃতিসহ উল্লেখ করেছি। দ্বিরুক্তির ভয়ে শুধু সংক্ষেপে তাদের বক্তব্য পেশ করলাম। আপনারা বরযখ সাধন ও তাসাউওরে শায়েখ অধ্যায়ে পাঠ করেছেন যে, তাসাওফপন্থী বিদআতীগণ বরযখ সাধনের মাধ্যমে এবং গুরুধ্যানকারীরা গুরুধ্যানের মাধ্যমে পীর বাবাকে অধিগম্য হিসাবে গায়েব দা বা অদৃশ্য জ্ঞান বা অদৃশ্য জান্তা বলে মনে করে থাকে।
আল্লাহ বলেন : তিনি ব্যতীত কেউই গায়েব জানে না কিন্তু তথাকথিত জাহেল পীরের ততোধিক জাহেল মুরীদ নিজেদের গুরুকে অধিগম্য হিসাবে গায়েব জান্তা বলে বিশ্বাস করে। এবারে বলুন? আল্লাহ সত্যবাদী? না অজ্ঞ মুরীদ সত্যবাদী? আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন, আল্লাহ সত্যবাদী। তাহলে যারা পীর বাবাকে গায়েব জান্তা বলে মনে করল, তারা পীর বাবাকে আল্লাহর সমতুল্য জ্ঞান করল। এদিক দিয়ে অনুরূপ আকীদা পোষণকারীর দল পৌত্তলিক। যারা আল্লাহর সত্তাকে অবিশ্বাস করে, তারা কাফের।
কিন্তু যারা তাসাউওরে শায়েখ বা পীরের মূর্তি আপনাদের হৃদয়পটে অঙ্কন করে তারা কাফের ও পৌত্তলিক উভয়ই। অনুরূপভাবে, অদ্বৈতবাদীরা স্রষ্টা ও সৃষ্ট জীবের মধ্যে পার্থক্য অস্বীকার করে এবং কার্য ও কারণকে এক বলে বিশ্বাস করে। এদের বিশ্বাস মতে সমস্ত সৃষ্ট জীবের মধ্যে আল্লাহ বিরাজ করছে। একটু তপ-জপ করলে প্রকাশ্য ব্যবধান দূর হয়ে যায়। তাদের মতে মূলত সকলেই আল্লাহর অবতার। এ দলের অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন মনছুর হাল্লাজ। অদ্বৈতবাদীরা কাফের ও পৌত্তলিক উভয়ই।