hadith book logo

কুরআন ও হাদীসের আলোকে মহাসাফল্য ও বড় ব্যর্থতা

লেখকঃ ড. সাঈদ ইবন আলী ইবন ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

প্রথম পরিচ্ছেদ: মহাসফল্য ও বড় ব্যর্থতার মর্মার্থ প্রথমত: মহাসাফল্যের মর্মার্থ:

( الفوز ) আল ফাওয শব্দটি আরবী, এর অর্থ হলো, নিরাপত্তার সাথে কল্যাণ অর্জন ও সব ধরণের অপছন্দনীয় ও ক্ষতিকর জিনিস থেকে নাজাত লাভ। [আল-ক্বামূস আল-মুহীত, পৃষ্ঠা: ৬৬৯, মুখতাসারুস সিহাহ, পৃষ্ঠা: ২১৫, মুফরাদাত গরীবিল কুরআন, লেখক আল-আসফিহানী, পৃষ্ঠা: ৬৪৭।]

( العظيم ) আর আযীম শব্দটিও আরবী, যেমন বলা হয়: عَظُمَ الشيءُ : أصله كَبُرَ عظْمُهُ অর্থাৎ মহান হওয়া, বড় হওয়া। অতঃপর রূপক অর্থে সব বড় জিনিসকে আযীম বলা হয়। চাই তা স্পর্শকর জিনিস হোক বা বিবেকের জিনিস, বস্তুগত হোক বা অর্থগত। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ قُلۡ هُوَ نَبَؤٌاْ عَظِيمٌ ٦٧ أَنتُمۡ عَنۡهُ مُعۡرِضُونَ ٦٨ ﴾ [ص: ٦٧، ٦٨ ]

“বল, এটি এক মহাসংবাদ। তোমরা তা থেকে বিমুখ হয়ে আছ।” [সূরা : সোয়াদ: ৬৭-৬৮]

আল্লাহ তা‘আলা মহাসাফল্য সম্পর্কে বলেছেন,

﴿ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَا وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةٗ فِي جَنَّٰتِ عَدۡنٖۚ وَرِضۡوَٰنٞ مِّنَ ٱللَّهِ أَكۡبَرُۚ ذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ٧٢ ﴾ [ التوبة : ٧٢ ]

“আল্লাহ মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং (ওয়াদা দিচ্ছেন) স্থায়ী জান্নাতসমূহে পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহাসাফল্য।” [সূরা আত্-তাওবা: ৭২]

আল্লাহ সুবহানাহু ওতা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿ وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٠٠ ﴾ [ التوبة : ١٠٠ ]

“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।” [সূরা আত্-তাওবা: ১০০]

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি জান্নাত লাভ করল সে মহাসাফল্য অর্জন করল। আল্লাহ কুরআনে ১৬ জায়গায় এ কথা উল্লেখ করেছেন। [আল-‘মুজামুল মুফাহরিস লি আল-ফাযিল কুরআনিল কারীম: পৃষ্ঠা ৫২৭।] আল্লাহ এ সাফল্যের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَهُمۡ جَنَّٰتٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡكَبِيرُ ١١ ﴾ [ البروج : ١١ ]

“নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ। এটাই বিরাট সফলতা।” [সূরা : আল্-বুরূজ: ১১]

আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট সফলতার কথা অন্যত্র বর্ণনা করেছেন,

﴿ قُلۡ إِنِّيٓ أَخَافُ إِنۡ عَصَيۡتُ رَبِّي عَذَابَ يَوۡمٍ عَظِيمٖ ١٥ مَّن يُصۡرَفۡ عَنۡهُ يَوۡمَئِذٖ فَقَدۡ رَحِمَهُۥۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡمُبِينُ ١٦ ﴾ [ الانعام : ١٥، ١٦ ]

“বল, যদি আমি আমার রবের অবাধ্য হই তবে নিশ্চয় আমি ভয় করি মহা দিবসের আযাবকে। সেদিন যার থেকে আযাব সরিয়ে নেয়া হবে তাকেই তিনি অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই প্রকাশ্য সফলতা।” [আল-আন‘আম: ১৫-১৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿ فَأَمَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ فَيُدۡخِلُهُمۡ رَبُّهُمۡ فِي رَحۡمَتِهِۦۚ ذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡمُبِينُ ٣٠ ﴾ [ الجاثية : ٣٠ ]

“অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের রব পরিণামে তাদেরকে স্বীয় রহমতে প্রবেশ করাবেন। এটিই সুস্পষ্ট সাফল্য।” [সূরা : আল-জাসিয়া: ৩০]

স্পষ্ট, বিরাট ও মহাসাফল্য হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ ও জান্নাতে প্রবেশ। যেমন আল্লাহ বলেছেন,

﴿ كُلُّ نَفۡسٖ ذَآئِقَةُ ٱلۡمَوۡتِۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوۡنَ أُجُورَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۖ فَمَن زُحۡزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدۡخِلَ ٱلۡجَنَّةَ فَقَدۡ فَازَۗ وَمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَآ إِلَّا مَتَٰعُ ٱلۡغُرُورِ ١٨٥ ﴾ [ ال عمران : ١٨٥ ]

“প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ‘অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী।” [আলে ইমরান: ১৮৫]

আল্লাহ তা ‘আলা কতিপয় জান্নাতীদের কথা বর্ণনা করে বলেন,

﴿ أَفَمَا نَحۡنُ بِمَيِّتِينَ ٥٨ إِلَّا مَوۡتَتَنَا ٱلۡأُولَىٰ وَمَا نَحۡنُ بِمُعَذَّبِينَ ٥٩ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ٦٠ لِمِثۡلِ هَٰذَا فَلۡيَعۡمَلِ ٱلۡعَٰمِلُونَ ٦١ ﴾ [ الصافات : ٥٨، ٦١ ]

“(জান্নাতবাসী ব্যক্তি বলবে) ‘তাহলে আমরা কি আর মরব না? আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া, আর আমরা কি আযাবপ্রাপ্ত হব না? নিশ্চয় এটি মহাসাফল্য! এরূপ সাফল্যের জন্যই ‘আমলকারীদের আমল করা উচিত।” [সূরা : আস্-সাফ্ফাত: ৫৮-৬১]

﴿ إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٖ ٥١ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٖ ٥٢ يَلۡبَسُونَ مِن سُندُسٖ وَإِسۡتَبۡرَقٖ مُّتَقَٰبِلِينَ ٥٣ كَذَٰلِكَ وَزَوَّجۡنَٰهُم بِحُورٍ عِينٖ ٥٤ يَدۡعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَٰكِهَةٍ ءَامِنِينَ ٥٥ لَا يَذُوقُونَ فِيهَا ٱلۡمَوۡتَ إِلَّا ٱلۡمَوۡتَةَ ٱلۡأُولَىٰۖ وَوَقَىٰهُمۡ عَذَابَ ٱلۡجَحِيمِ ٥٦ فَضۡلٗا مِّن رَّبِّكَۚ ذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ٥٧ ﴾ [ الدخان : ٥١، ٥٧ ]

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, বাগ-বাগিচা ও ঝর্নাধারার মধ্যে, তারা পরিধান করবে পাতলা ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং বসবে মুখোমুখী হয়ে। এরূপই ঘটবে, আর আমি তাদেরকে বিয়ে দেব ডাগর নয়না হূরদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্তচিত্তে সকল প্রকারের ফলমূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর সেখানে তারা আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন। তোমার রবের অনুগ্রহস্বরূপ, এটাই তো মহাসাফল্য।” [সূরা : আদ্-দুখান: ৫১-৫৭]

আল্লাহ তা‘আলা সাদিকীনদের সম্পর্কে বিশেষ করে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছেন,

﴿ قَالَ ٱللَّهُ هَٰذَا يَوۡمُ يَنفَعُ ٱلصَّٰدِقِينَ صِدۡقُهُمۡۚ لَهُمۡ جَنَّٰتٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١١٩ ﴾ [ المائ‍دة : ١١٩ ]

“আল্লাহ বলবেন, ‘এটা হল সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে। তাদের জন্য আছে জান্নাতসমূহ যার নীচে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য।” [আল-মায়েদা: ১১৯]

এ ছাড়াও অনেক আয়াতে এ মহা সফলতা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা এ মহা সফলতার পথে চলার উপায়সমূহ ও যে সব কাজ করলে এ সফলতা অর্জন করা যায় তা আল কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَقُولُواْ قَوۡلٗا سَدِيدٗا ٧٠ يُصۡلِحۡ لَكُمۡ أَعۡمَٰلَكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۗ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيمًا ٧١ ﴾ [ الاحزاب : ٧٠، ٧١ ]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে শুদ্ধ করে দেবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই এক মহাসাফল্য অর্জন করল।” [সূরা : আল্-আহযাব: ৭০-৭১]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿ تِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِۚ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٣ ﴾ [ النساء : ١٣ ]

“এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা।” [আন্-নিসা: ১৩]

﴿ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَخۡشَ ٱللَّهَ وَيَتَّقۡهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَآئِزُونَ ٥٢ ﴾ [ النور : ٥٢ ]

“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই কৃতকার্য।” [সূরা : আন্-নূর: ৫২]