১
কুরআন ও হাদীসের আলোকে মহাসাফল্য ও বড় ব্যর্থতা
লেখকঃ ড. সাঈদ ইবন আলী ইবন ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৩
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ: জান্নাতীদের পানীয় ও এর নহরসমূহ এবং জাহান্নামীদের পানীয় প্রথমত: জান্নাতীদের পানীয় ও এর নহরসমূহ
১- জান্নাতীদের পানীয়:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ إِنَّ ٱلۡأَبۡرَارَ يَشۡرَبُونَ مِن كَأۡسٖ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا ٥ عَيۡنٗا يَشۡرَبُ بِهَا عِبَادُ ٱللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفۡجِيرٗا ٦ ﴾ [ الانسان : ٥، ٦ ]
নিশ্চয় সৎকর্মশীলরা পান করবে এমন পানপাত্র থেকে যার মিশ্রণ হবে কাফূর। এমন এক ঝর্ণা যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এটিকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করবে। [সূরা আল্-ইনসান: ৫-৬]
আল্লাহর বাণীঃ
﴿ يَشۡرَبُونَ مِن كَأۡسٖ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا ٥ ﴾ [ الانسان : ٥ ]
“তারা পান করবে এমন পানপাত্র থেকে যার মিশ্রণ হবে কাফূর।” অর্থাৎ জান্নাতীরা এমন পাত্র থেকে পান করবে যাতে শরাব থাকবে আর এর মিশ্রণ হবে কাফুর। কাফুরের সুগন্ধি ও শীতলতা সবারই জানা আছে। এ ছাড়াও এতে জান্নাতের স্বাদ মিশে এক আলাদা মজাদার পানীয় হবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৫৫।]
কারো মতে, কাফুর দ্বারা মিশ্রণ হবে আর মিসকের দ্বারা পরিবেশন করা হবে। [তাফসীরে বাগভী: ৪/৪২৭।]
আল্লাহর বাণী:
﴿ يُفَجِّرُونَهَا تَفۡجِيرٗا ٦ ﴾ [ الانسان : ٦ ]
“তারা এটিকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করাবে।” চাই তারা তাদের ভবন বা আসনের পাশ দিয়ে হোক বা অন্য যে কোন জায়গা দিয়ে হোক, তাদের ইচ্ছা মতই প্রবাহিত হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ وَيُطَافُ عَلَيۡهِم بَِٔانِيَةٖ مِّن فِضَّةٖ وَأَكۡوَابٖ كَانَتۡ قَوَارِيرَا۠ ١٥ قَوَارِيرَاْ مِن فِضَّةٖ قَدَّرُوهَا تَقۡدِيرٗا ١٦ وَيُسۡقَوۡنَ فِيهَا كَأۡسٗا كَانَ مِزَاجُهَا زَنجَبِيلًا ١٧ عَيۡنٗا فِيهَا تُسَمَّىٰ سَلۡسَبِيلٗا ١٨ ﴾ [ الانسان : ١٥، ١٨ ]
“তাদের চারপাশে আবর্তিত হবে রৌপ্যপাত্র ও স্ফটিক স্বচ্ছ পানপাত্র- রূপার ন্যায় শুভ্র স্ফটিক পাত্র; যার পরিমাপ তারা নির্ধারণ করবে। সেখানে তাদেরকে পান করানো হবে পাত্রভরা আদা-মিশ্রিত সুরা, সেখানকার এক ঝর্ণা যার নাম হবে সালসাবীল।” [সূরা : আল্-ইনসান: ১৫-১৮]
وَيُسۡقَوۡنَ فِيهَا كَأۡسٗا
তারা এ সব পান পাত্র থেকে আদা মিশ্রিত সূরা পান করবে। কখনও তাদের পানীয়তে কাফুর মিশ্রিত থাকবে যা শীতল, আবার কখনও আদা মিশ্রিত থাকবে যা উষ্ণ হবে।
عَيۡنٗا فِيهَا تُسَمَّىٰ سَلۡسَبِيلٗا
সালসাবীল হলো জান্নাতের একটি ঝর্ণা। জান্নাতীরা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে তা প্রবাহিত করতে পারবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৫৭, তাফসীরে বাগভী: ৪/৪৩৬।]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,
﴿ يُسۡقَوۡنَ مِن رَّحِيقٖ مَّخۡتُومٍ ٢٥ خِتَٰمُهُۥ مِسۡكٞۚ وَفِي ذَٰلِكَ فَلۡيَتَنَافَسِ ٱلۡمُتَنَٰفِسُونَ ٢٦ وَمِزَاجُهُۥ مِن تَسۡنِيمٍ ٢٧ عَيۡنٗا يَشۡرَبُ بِهَا ٱلۡمُقَرَّبُونَ ٢٨ ﴾ [ المطففين : ٢٥، ٢٨ ]
“তাদেরকে সীলমোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় থেকে পান করানো হবে। তার মোহর হবে মিসক। আর প্রতিযোগিতাকারীদের উচিৎ এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা। আর তার মিশ্রণ হবে তাসনীম থেকে। তা এক প্রস্রবণ, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে।” [সূরা আল্-মুতাফফিফীন: ২৫-২৮]
الرحيق তারা জান্নাতে সুপেয় সূরা পান করবে, আর রহীক হলো এক ধরণের মদ। আর তাদের সর্বশেষ পানীয় হবে মিসকের দ্বারা।
কারো মতে, রূপার ন্যায় সাদা পানীয় যা সীল মোহর করা থাকবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৮৭, তাফসীরে বাগভী: ৪/৪৬১।]
وَمِزَاجُهُۥ مِن تَسۡنِيمٍ
রাহীকের মিশ্রণ হবে তাসনীম নামে পানীয় দ্বারা। এটা জান্নাতের সর্বোত্তম শরাব। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন,
عَيۡنٗا يَشۡرَبُ بِهَا ٱلۡمُقَرَّبُونَ
তা এক প্রস্রবণ, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৮৮, তাফসীরে বাগভী: ৪/৪৬২।]
২- জান্নাতের নহরসমূহ:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ مَّثَلُ ٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي وُعِدَ ٱلۡمُتَّقُونَۖ فِيهَآ أَنۡهَٰرٞ مِّن مَّآءٍ غَيۡرِ ءَاسِنٖ وَأَنۡهَٰرٞ مِّن لَّبَنٖ لَّمۡ يَتَغَيَّرۡ طَعۡمُهُۥ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ خَمۡرٖ لَّذَّةٖ لِّلشَّٰرِبِينَ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ عَسَلٖ مُّصَفّٗىۖ وَلَهُمۡ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَمَغۡفِرَةٞ مِّن رَّبِّهِمۡۖ كَمَنۡ هُوَ خَٰلِدٞ فِي ٱلنَّارِ وَسُقُواْ مَآءً حَمِيمٗا فَقَطَّعَ أَمۡعَآءَهُمۡ ١٥ ﴾ [ محمد : ١٥ ]
“মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্নাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্নাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?” [সূরা মুহাম্মদ: ১৫]
مَّآءٍ غَيۡرِ ءَاسِن
অপরিবর্তনশীল নির্মল পানি। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/১৭৭, তাফসীরে বাগভী: ৪/১৮১।]
আল-কাওসার ঝর্ণা: এটা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেয়া হয়েছে।
عَنِ عَبْد اللَّهِ بْن عَمْرٍو : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ، مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ، وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ المِسْكِ، وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ، مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلاَ يَظْمَأُ أَبَدًا»
আবদুল্লাহ্ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার হাউয (হাউযে কাউসার) এক মাসের দূরত্ব সমান (বড়) হবে। তার পানি দুধের চেয়ে শুভ্র, তার ঘ্রাণ মিসকের চেয়ে সুগন্ধযুক্ত এবং তার পানপাত্রগুলি হবে আকাশের তারকার মত অধিক। যে ব্যক্তি তা থেকে পান করবে সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না।” [বুখারী, হাদীস নং ৬৫৭৯, মুসলিম, ২২৯২।]
এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত একই হবে, দৈর্ঘ্য হবে এক মাসের দূরত্বের সমান আর প্রস্তও হবে এক মাসের দূরত্ব।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ : لَمَّا عُرِجَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى السَّمَاءِ، قَالَ : " أَتَيْتُ عَلَى نَهَرٍ، حَافَتَاهُ قِبَابُ اللُّؤْلُؤِ مُجَوَّفًا، فَقُلْتُ : مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ : هَذَا الكَوْثَرُ "
আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আকাশের দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মি’রাজ হলে তিনি বলেন, আমি একটি জলাধারের (নদী) ধারে পৌঁছলাম, যার উভয় তীরে ফাঁপা মুক্তার তৈরি গম্বুজ রয়েছে। আমি বললাম, হে জিবরীল! এটি কি? তিনি বললেন, এটিই (হাউযে) কাউসার।” [বুখারী, হাদীস নং ৪৯৬৪।]
وفي رواية : " بَيْنَمَا أَنَا أَسِيرُ فِي الجَنَّةِ، إِذَا أَنَا بِنَهَرٍ، حَافَتَاهُ قِبَابُ الدُّرِّ المُجَوَّفِ، قُلْتُ : مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ : هَذَا الكَوْثَرُ، الَّذِي أَعْطَاكَ رَبُّكَ، فَإِذَا طِينُهُ - أَوْ طِيبُهُ - مِسْكٌ أَذْفَرُ "
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, তিনি বলেছেন, “আমি জান্নাতে ভ্রমণ করছিলাম, এমন সময় এক ঝর্ণার কাছে এলে দেখি যে তার দু’টি ধারে ফাপা মুক্তার গম্বুজ রয়েছে । আমি বললাম, হে জিব্রাঈল! এটা কি? তিনি বললেন। এটা ঐ কাউসার যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তার মাটিতে অথবা ঘ্রাণে ছিল উৎকৃষ্ট মানের মিসকের সুগন্ধি।” [বুখারী, হাদীস নং ৬৫৮১।]
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ إِنَّآ أَعۡطَيۡنَٰكَ ٱلۡكَوۡثَرَ ١ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢ إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلۡأَبۡتَرُ ٣ ﴾ [ الكوثر : ١، ٣ ]
“নিশ্চয় আমি তোমাকে আল-কাউসার দান করেছি। অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণকারীই নির্বংশ।” [সূরা আল্-কাউসার: ১-৩]
«إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الحَوْضِ، مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ، وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا، لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونِي، ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ»
" فَأَقُولُ إِنَّهُمْ مِنِّي، فَيُقَالُ : إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ : سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي " وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : سُحْقًا : بُعْدًا
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের আগে হাউযের ধারে পৌঁছব । যে আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে, সে হাউযের পানি পান করবে । আর যে পান করবে সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না। নিঃসন্দেহে কিছু সম্প্রদায় আমার সামনে (হাউযে) উপস্থিত হবে । আমি তাদেরকে চিনতে পারব আর তারাও আমাকে চিনতে পারবে । এরপর আমার এবং তাদের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেওয়া হবে
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তখন বলব যে তারা তো আমারই উম্মত । তখন বলা হবে, তুমি তো জান না তোমার পরে এরা কি সব নতুন নতুন কীর্তি করেছে । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন তখন আমি বলব, আমার পরে যারা দীনের মাঝে পরিবর্তন এনেছে তারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকুক । ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এর অর্থ - তাকে দূর করে দিয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ إِنَّ ٱلۡأَبۡرَارَ يَشۡرَبُونَ مِن كَأۡسٖ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا ٥ عَيۡنٗا يَشۡرَبُ بِهَا عِبَادُ ٱللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفۡجِيرٗا ٦ ﴾ [ الانسان : ٥، ٦ ]
নিশ্চয় সৎকর্মশীলরা পান করবে এমন পানপাত্র থেকে যার মিশ্রণ হবে কাফূর। এমন এক ঝর্ণা যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এটিকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করবে। [সূরা আল্-ইনসান: ৫-৬]
আল্লাহর বাণীঃ
﴿ يَشۡرَبُونَ مِن كَأۡسٖ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا ٥ ﴾ [ الانسان : ٥ ]
“তারা পান করবে এমন পানপাত্র থেকে যার মিশ্রণ হবে কাফূর।” অর্থাৎ জান্নাতীরা এমন পাত্র থেকে পান করবে যাতে শরাব থাকবে আর এর মিশ্রণ হবে কাফুর। কাফুরের সুগন্ধি ও শীতলতা সবারই জানা আছে। এ ছাড়াও এতে জান্নাতের স্বাদ মিশে এক আলাদা মজাদার পানীয় হবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৫৫।]
কারো মতে, কাফুর দ্বারা মিশ্রণ হবে আর মিসকের দ্বারা পরিবেশন করা হবে। [তাফসীরে বাগভী: ৪/৪২৭।]
আল্লাহর বাণী:
﴿ يُفَجِّرُونَهَا تَفۡجِيرٗا ٦ ﴾ [ الانسان : ٦ ]
“তারা এটিকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করাবে।” চাই তারা তাদের ভবন বা আসনের পাশ দিয়ে হোক বা অন্য যে কোন জায়গা দিয়ে হোক, তাদের ইচ্ছা মতই প্রবাহিত হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ وَيُطَافُ عَلَيۡهِم بَِٔانِيَةٖ مِّن فِضَّةٖ وَأَكۡوَابٖ كَانَتۡ قَوَارِيرَا۠ ١٥ قَوَارِيرَاْ مِن فِضَّةٖ قَدَّرُوهَا تَقۡدِيرٗا ١٦ وَيُسۡقَوۡنَ فِيهَا كَأۡسٗا كَانَ مِزَاجُهَا زَنجَبِيلًا ١٧ عَيۡنٗا فِيهَا تُسَمَّىٰ سَلۡسَبِيلٗا ١٨ ﴾ [ الانسان : ١٥، ١٨ ]
“তাদের চারপাশে আবর্তিত হবে রৌপ্যপাত্র ও স্ফটিক স্বচ্ছ পানপাত্র- রূপার ন্যায় শুভ্র স্ফটিক পাত্র; যার পরিমাপ তারা নির্ধারণ করবে। সেখানে তাদেরকে পান করানো হবে পাত্রভরা আদা-মিশ্রিত সুরা, সেখানকার এক ঝর্ণা যার নাম হবে সালসাবীল।” [সূরা : আল্-ইনসান: ১৫-১৮]
وَيُسۡقَوۡنَ فِيهَا كَأۡسٗا
তারা এ সব পান পাত্র থেকে আদা মিশ্রিত সূরা পান করবে। কখনও তাদের পানীয়তে কাফুর মিশ্রিত থাকবে যা শীতল, আবার কখনও আদা মিশ্রিত থাকবে যা উষ্ণ হবে।
عَيۡنٗا فِيهَا تُسَمَّىٰ سَلۡسَبِيلٗا
সালসাবীল হলো জান্নাতের একটি ঝর্ণা। জান্নাতীরা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে তা প্রবাহিত করতে পারবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৫৭, তাফসীরে বাগভী: ৪/৪৩৬।]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,
﴿ يُسۡقَوۡنَ مِن رَّحِيقٖ مَّخۡتُومٍ ٢٥ خِتَٰمُهُۥ مِسۡكٞۚ وَفِي ذَٰلِكَ فَلۡيَتَنَافَسِ ٱلۡمُتَنَٰفِسُونَ ٢٦ وَمِزَاجُهُۥ مِن تَسۡنِيمٍ ٢٧ عَيۡنٗا يَشۡرَبُ بِهَا ٱلۡمُقَرَّبُونَ ٢٨ ﴾ [ المطففين : ٢٥، ٢٨ ]
“তাদেরকে সীলমোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় থেকে পান করানো হবে। তার মোহর হবে মিসক। আর প্রতিযোগিতাকারীদের উচিৎ এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা। আর তার মিশ্রণ হবে তাসনীম থেকে। তা এক প্রস্রবণ, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে।” [সূরা আল্-মুতাফফিফীন: ২৫-২৮]
الرحيق তারা জান্নাতে সুপেয় সূরা পান করবে, আর রহীক হলো এক ধরণের মদ। আর তাদের সর্বশেষ পানীয় হবে মিসকের দ্বারা।
কারো মতে, রূপার ন্যায় সাদা পানীয় যা সীল মোহর করা থাকবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৮৭, তাফসীরে বাগভী: ৪/৪৬১।]
وَمِزَاجُهُۥ مِن تَسۡنِيمٍ
রাহীকের মিশ্রণ হবে তাসনীম নামে পানীয় দ্বারা। এটা জান্নাতের সর্বোত্তম শরাব। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন,
عَيۡنٗا يَشۡرَبُ بِهَا ٱلۡمُقَرَّبُونَ
তা এক প্রস্রবণ, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/৪৮৮, তাফসীরে বাগভী: ৪/৪৬২।]
২- জান্নাতের নহরসমূহ:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ مَّثَلُ ٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي وُعِدَ ٱلۡمُتَّقُونَۖ فِيهَآ أَنۡهَٰرٞ مِّن مَّآءٍ غَيۡرِ ءَاسِنٖ وَأَنۡهَٰرٞ مِّن لَّبَنٖ لَّمۡ يَتَغَيَّرۡ طَعۡمُهُۥ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ خَمۡرٖ لَّذَّةٖ لِّلشَّٰرِبِينَ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ عَسَلٖ مُّصَفّٗىۖ وَلَهُمۡ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَمَغۡفِرَةٞ مِّن رَّبِّهِمۡۖ كَمَنۡ هُوَ خَٰلِدٞ فِي ٱلنَّارِ وَسُقُواْ مَآءً حَمِيمٗا فَقَطَّعَ أَمۡعَآءَهُمۡ ١٥ ﴾ [ محمد : ١٥ ]
“মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্নাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্নাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?” [সূরা মুহাম্মদ: ১৫]
مَّآءٍ غَيۡرِ ءَاسِن
অপরিবর্তনশীল নির্মল পানি। [তাফসীরে ইবন কাসীর: ৪/১৭৭, তাফসীরে বাগভী: ৪/১৮১।]
আল-কাওসার ঝর্ণা: এটা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেয়া হয়েছে।
عَنِ عَبْد اللَّهِ بْن عَمْرٍو : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ، مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ، وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ المِسْكِ، وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ، مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلاَ يَظْمَأُ أَبَدًا»
আবদুল্লাহ্ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার হাউয (হাউযে কাউসার) এক মাসের দূরত্ব সমান (বড়) হবে। তার পানি দুধের চেয়ে শুভ্র, তার ঘ্রাণ মিসকের চেয়ে সুগন্ধযুক্ত এবং তার পানপাত্রগুলি হবে আকাশের তারকার মত অধিক। যে ব্যক্তি তা থেকে পান করবে সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না।” [বুখারী, হাদীস নং ৬৫৭৯, মুসলিম, ২২৯২।]
এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত একই হবে, দৈর্ঘ্য হবে এক মাসের দূরত্বের সমান আর প্রস্তও হবে এক মাসের দূরত্ব।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ : لَمَّا عُرِجَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى السَّمَاءِ، قَالَ : " أَتَيْتُ عَلَى نَهَرٍ، حَافَتَاهُ قِبَابُ اللُّؤْلُؤِ مُجَوَّفًا، فَقُلْتُ : مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ : هَذَا الكَوْثَرُ "
আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আকাশের দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মি’রাজ হলে তিনি বলেন, আমি একটি জলাধারের (নদী) ধারে পৌঁছলাম, যার উভয় তীরে ফাঁপা মুক্তার তৈরি গম্বুজ রয়েছে। আমি বললাম, হে জিবরীল! এটি কি? তিনি বললেন, এটিই (হাউযে) কাউসার।” [বুখারী, হাদীস নং ৪৯৬৪।]
وفي رواية : " بَيْنَمَا أَنَا أَسِيرُ فِي الجَنَّةِ، إِذَا أَنَا بِنَهَرٍ، حَافَتَاهُ قِبَابُ الدُّرِّ المُجَوَّفِ، قُلْتُ : مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ : هَذَا الكَوْثَرُ، الَّذِي أَعْطَاكَ رَبُّكَ، فَإِذَا طِينُهُ - أَوْ طِيبُهُ - مِسْكٌ أَذْفَرُ "
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, তিনি বলেছেন, “আমি জান্নাতে ভ্রমণ করছিলাম, এমন সময় এক ঝর্ণার কাছে এলে দেখি যে তার দু’টি ধারে ফাপা মুক্তার গম্বুজ রয়েছে । আমি বললাম, হে জিব্রাঈল! এটা কি? তিনি বললেন। এটা ঐ কাউসার যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তার মাটিতে অথবা ঘ্রাণে ছিল উৎকৃষ্ট মানের মিসকের সুগন্ধি।” [বুখারী, হাদীস নং ৬৫৮১।]
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ إِنَّآ أَعۡطَيۡنَٰكَ ٱلۡكَوۡثَرَ ١ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢ إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلۡأَبۡتَرُ ٣ ﴾ [ الكوثر : ١، ٣ ]
“নিশ্চয় আমি তোমাকে আল-কাউসার দান করেছি। অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণকারীই নির্বংশ।” [সূরা আল্-কাউসার: ১-৩]
«إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الحَوْضِ، مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ، وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا، لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونِي، ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ»
" فَأَقُولُ إِنَّهُمْ مِنِّي، فَيُقَالُ : إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ : سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي " وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : سُحْقًا : بُعْدًا
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের আগে হাউযের ধারে পৌঁছব । যে আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে, সে হাউযের পানি পান করবে । আর যে পান করবে সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না। নিঃসন্দেহে কিছু সম্প্রদায় আমার সামনে (হাউযে) উপস্থিত হবে । আমি তাদেরকে চিনতে পারব আর তারাও আমাকে চিনতে পারবে । এরপর আমার এবং তাদের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেওয়া হবে
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তখন বলব যে তারা তো আমারই উম্মত । তখন বলা হবে, তুমি তো জান না তোমার পরে এরা কি সব নতুন নতুন কীর্তি করেছে । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন তখন আমি বলব, আমার পরে যারা দীনের মাঝে পরিবর্তন এনেছে তারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকুক । ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এর অর্থ - তাকে দূর করে দিয়েছে।