hadith book logo

কুরআন ও হাদীসের আলোকে মহাসাফল্য ও বড় ব্যর্থতা

লেখকঃ ড. সাঈদ ইবন আলী ইবন ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৯

বিংশ পরিচ্ছেদ: জান্নাতের বৃক্ষ ও এর ছায়া এবং জাহান্নামের বৃক্ষ ও এর ছায়া প্রথমত: জান্নাতের বৃক্ষ ও এর ছায়া

عن أبي سعيد الخدري عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ شَجَرَةً يَسِيرُ الرَّاكِبُ الْجَوَادَ الْمُضَمَّرَ السَّرِيعَ، مِائَةَ عَامٍ مَا يَقْطَعُهَا»

আবু সাঈদ খূদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “জান্নাতের মাঝে এমন একটি বৃক্ষ আছে, যা স্ফুর্তিবাজ দ্রুতগামী অশ্বের আরোহী একশ বছর পর্যন্ত সফর করেও অতিক্রম করতে পারবে না।” [বুখারী, হাদীস নং ৬৫৫২, মুসলিম, হাদীস নং ২৮২৮।]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ وَأَصۡحَٰبُ ٱلۡيَمِينِ مَآ أَصۡحَٰبُ ٱلۡيَمِينِ ٢٧ فِي سِدۡرٖ مَّخۡضُودٖ ٢٨ وَطَلۡحٖ مَّنضُودٖ ٢٩ وَظِلّٖ مَّمۡدُودٖ ٣٠ وَمَآءٖ مَّسۡكُوبٖ ٣١ وَفَٰكِهَةٖ كَثِيرَةٖ ٣٢ لَّا مَقۡطُوعَةٖ وَلَا مَمۡنُوعَةٖ ٣٣ ﴾ [ الواقعة : ٢٧، ٣٣ ]

“আর ডান দিকের দল; কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! তারা থাকবে কাঁটাবিহীন কুলগাছের নিচে, আর কাঁদিপূর্ণ কলাগাছের নিচে, আর বিস্তৃত ছায়ায়, আর সদা প্রবাহিত পানির পাশে, আর প্রচুর ফলমূলে, যা শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধও হবে না”। [সূরা : আল্-ওয়াকিয়া: ২৭-৩৩]

আলেমগণ বলেছেন, এখানে ছায়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বৃক্ষের ডাল পালা ও শাখা প্রশাখার বিস্তৃত ছায়া। [শরহে ইমাম নাওয়াওয়ী: ১৭/১৬৭।]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿ إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي ظِلَٰلٖ وَعُيُونٖ ٤١ وَفَوَٰكِهَ مِمَّا يَشۡتَهُونَ ٤٢ ﴾ [ المرسلات : ٤١، ٤٢ ]

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া ও ঝর্ণা-বহুল স্থানে, আর ফলমূল-এর মধ্যে, যা তারা চাইবে। [সূরা আল-মুরসালাত: ৪১-৪২]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿ وَلِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِۦ جَنَّتَانِ ٤٦ فَبِأَيِّ ءَالَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ٤٧ ذَوَاتَآ أَفۡنَانٖ ٤٨ فَبِأَيِّ ءَالَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ٤٩ فِيهِمَا عَيۡنَانِ تَجۡرِيَانِ ٥٠ فَبِأَيِّ ءَالَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ٥١ فِيهِمَا مِن كُلِّ فَٰكِهَةٖ زَوۡجَانِ ٥٢ ﴾ [ الرحمن : ٤٦، ٥٢ ]

“আর যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে, তার জন্য থাকবে দু’টি জান্নাত। সুতরাং তোমাদের রবের কোন্ নিআমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? উভয়ই বহু ফলদার শাখাবিশিষ্ট। সুতরাং তোমাদের রবের কোন্ নি‘আমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? উভয়ের মধ্যে থাকবে দু’টি ঝর্ণাধারা যা প্রবাহিত হবে। সুতরাং তোমাদের রবের কোন্ নি‘আমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? উভয়ের মধ্যে প্রত্যেক ফল থেকে থাকবে দু’ প্রকারের।” [সূরা : আর্-রাহমান: ৪৬-৫২]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿ فِيهِمَا فَٰكِهَةٞ وَنَخۡلٞ وَرُمَّانٞ ٦٨ ﴾ [ الرحمن : ٦٨ ]

“এ দু’টিতে থাকবে ফলমূল, খেজুর ও আনার।” [সূরা : আর্-রাহমান: ৬৮]

আল্লাহর বাণী:

﴿ وَدَانِيَةً عَلَيۡهِمۡ ظِلَٰلُهَا وَذُلِّلَتۡ قُطُوفُهَا تَذۡلِيلٗا ١٤ ﴾ [ الانسان : ١٤ ]

“তাদের উপর সন্নিহিত থাকবে উদ্যানের ছায়া এবং তার ফলমূলের থোকাসমূহ তাদের সম্পূর্ণ আয়ত্তাধীন করা হবে।” [সূরা : আল্-ইনসান: ১৪]

আল্লাহর বাণী:

﴿ فَهُوَ فِي عِيشَةٖ رَّاضِيَةٖ ٢١ فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٖ ٢٢ قُطُوفُهَا دَانِيَةٞ ٢٣ كُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ هَنِيٓ‍َٔۢا بِمَآ أَسۡلَفۡتُمۡ فِي ٱلۡأَيَّامِ ٱلۡخَالِيَةِ ٢٤ ﴾ [ الحاقة : ٢١، ٢٤ ]

“সুতরাং সে সন্তোষজনক জীবনে থাকবে। সুউচ্চ জান্নাতে, তার ফলসমূহ নিকটবর্তী থাকবে।(বলা হবে,) বিগত দিনসমূহে তোমরা যা অগ্রে প্রেরণ করেছ তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তি সহকারে খাও ও পান কর।” [সূরা : আল্-হাক্কাহ: ২১-২৪]

আল্লাহর বাণী:

﴿ إِنَّ لِلۡمُتَّقِينَ مَفَازًا ٣١ حَدَآئِقَ وَأَعۡنَٰبٗا ٣٢ وَكَوَاعِبَ أَتۡرَابٗا ٣٣ وَكَأۡسٗا دِهَاقٗا ٣٤ لَّا يَسۡمَعُونَ فِيهَا لَغۡوٗا وَلَا كِذَّٰبٗا ٣٥ جَزَآءٗ مِّن رَّبِّكَ عَطَآءً حِسَابٗا ٣٦ ﴾ [ النبا : ٣١، ٣٦ ]

“নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে সফলতা। উদ্যানসমূহ ও আঙ্গুরসমূহ। আর সমবয়স্কা উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী। আর পরিপূর্ণ পানপাত্র। তারা সেখানে কোন অসার ও মিথ্যা কথা শুনবে না। তোমার রবের পক্ষ থেকে প্রতিফল, যথোচিত দানস্বরূপ।” [সূরা আন্-নাবা: ৩১-৩৬]

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতুল কুসুফ তথা সূর্যগ্রহণের সালাতে আঙ্গুরের কাঁদি দেখছিল। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস,

قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ، رَأَيْنَاكَ تَنَاوَلْتَ شَيْئًا فِي مَقَامِكَ ثُمَّ رَأَيْنَاكَ كَعْكَعْتَ؟ قَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «إِنِّي رَأَيْتُ الجَنَّةَ، فَتَنَاوَلْتُ عُنْقُودًا، وَلَوْ أَصَبْتُهُ لَأَكَلْتُمْ مِنْهُ مَا بَقِيَتِ الدُّنْيَا، وَأُرِيتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ مَنْظَرًا كَاليَوْمِ قَطُّ أَفْظَعَ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ»

“লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা দেখলাম, আপনি নিজের জায়গা থেকে কি যেন ধরেছেন, আবার দেখলাম, আপনি যেন পেছনে সরে এলেন। তিনি বললেন, আমি তো জান্নাত দেখছিলাম এবং একগুচ্ছ আঙ্গুরের প্রতি হাত বাড়িয়ে ছিলাম। আমি তা পেয়ে গেলে, দুনিয়া কায়িম থাকা পর্যন্ত অবশ্য তোমরা তা খেতে পারতে। এরপর আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়, আমি আজকের মত ভয়াবহ দৃশ্য কখনো দেখিনি। আর আমি দেখলাম, জাহান্নামের অধিকাংশ বাসিন্দা স্ত্রী লোক।” [বুখারী, হাদীস নং ১০৫২, মুসলিম, হাদীস নং ৯০৭।]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَوْمًا يُحَدِّثُ وَعِنْدَهُ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ البَادِيَةِ : " أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ اسْتَأْذَنَ رَبَّهُ فِي الزَّرْعِ، فَقَالَ لَهُ : أَوَلَسْتَ فِيمَا شِئْتَ؟ قَالَ : بَلَى، وَلَكِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَزْرَعَ، فَأَسْرَعَ وَبَذَرَ، فَتَبَادَرَ الطَّرْفَ نَبَاتُهُ وَاسْتِوَاؤُهُ وَاسْتِحْصَادُهُ وَتَكْوِيرُهُ أَمْثَالَ الجِبَالِ، فَيَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى : دُونَكَ يَا ابْنَ آدَمَ، فَإِنَّهُ لاَ يُشْبِعُكَ شَيْءٌ " ، فَقَالَ الأَعْرَابِيُّ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، لاَ تَجِدُ هَذَا إِلَّا قُرَشِيًّا أَوْ أَنْصَارِيًّا، فَإِنَّهُمْ أَصْحَابُ زَرْعٍ، فَأَمَّا نَحْنُ فَلَسْنَا بِأَصْحَابِ زَرْعٍ، فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আলোচনারত ছিলেন। তখন সেখানে একজন গ্রাম্য লোকও উপস্থিত ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন, একজন জান্নাতবাসী অনুমতি প্রার্থনা করবে কৃষিকার্য করার জন্য। আল্লাহ্ তাকে বলবেন, তুমি যা চাও তা কি পাওনি? সে বলবে, হ্যাঁ, পেয়েছি। তবে আমি কৃষিকাজ করতে পছন্দ করছি। অতি সত্বর ব্যবস্থা করা হবে এবং বীজ বোনা হবে। তখনই নিমিষে চারা গজাবে সোজা হয়ে দাঁড়াবে এবং তা কাটা হবে আর তা পর্বত পরিমাণ স্তূপীকৃত করা হবে। আল্লাহ্ তখন বলবেন, হে আদম সন্তান! লও। কারণ, তোমাকে কোন কিছুই তৃপ্তি দেবে না। এমন সময় জনৈক বেদুঈন বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ঐ লোকটিকে আপনি কুরাইশী কিংবা আনসারী পাবেন। কেননা, তাঁরা হলেন কৃষিজীবী। আর আমরা কৃষিজীবী নই! এতে রাসূলুল্লাহ্ হেসে দিলেন। [বুখারী, হাদীস নং ৭৫১৯।]

এ হাদীস প্রমাণ করে যে, জান্নাতে যা কিছু ইচ্ছা পোষণ করা হবে তাই পাবে। কেননা জান্নাত হলো মনে যা চাবে তাই পাবে। চোখে যা ভাল লাগবে তাই পূরণ হবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ আমাদেরকে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন। [ফাতহুল বারী: ৫/২৭।]