১
অন্তরের আমল ইখলাস
লেখকঃ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জেদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩
ইখলাসের অর্থ
ইখলাসের আভিধানিক অর্থ:
ইখলাস শব্দটি আরবি أخلَص শব্দ হতে নির্গত। এ শব্দের مضارع [মুজারেয়] হল, يُخْلِص আর এর মাছদার, [ إخلاصاً ] অর্থাৎ, নিরেট বা খাটি বস্তু; কোনো বস্তু নির্ভেজাল ও খাটি হওয়া এবং তার সাথে কোন কিছুর সংমিশ্রণ না থাকাকে ইখলাস বলে। যেমন, বলা হয় وأخلص الرجل دينه لله অর্থাৎ, লোকটি তার দ্বীনকে কেবল আল্লাহর জন্যই খাস করল। লোকটি তার দ্বীনের বিষয়ে আল্লাহর সাথে কাউকে মিলায়-নি বা শরিক করে নি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِلَّاعِبَادَكَ مِنۡهُمُ ٱلۡمُخۡلَصِينَ ٤٠﴾ [ الحجر : ٤٠ ]
“তাদের মধ্য থেকে আপনার মুখলিস বা একান্ত বান্দাগণ ছাড়া”। এখানে مخلَصين শব্দটির লাম ‘যবর’ সহকারে রয়েছে। তবে কোনো কোনো কেরাআতে مخلِصين অর্থাৎ লামের নীচে ‘যের’ সহকারেও পড়া হয়েছে।
সা‘লাব রহ. বলেন, مخلِصِين (লাম এর নীচে ‘যের’ সহকারে) এর অর্থ যারা ইবাদতকে কেবল আল্লাহর জন্যই করে থাকেন। আর مُخۡلَصِينَ (লামের উপর ‘যবর’ সহকারে) এর অর্থ, যাদেরকে আল্লাহ একান্তভাবে নিজের করে নিয়েছেন।
যাজ্জাজ রহ. বলেন, আল্লাহর তা‘আলার বাণী-
﴿وَٱذۡكُرۡ فِي ٱلۡكِتَٰبِ مُوسَىٰٓۚ إِنَّهُۥ كَانَ مُخۡلَصٗا وَكَانَ رَسُولٗا نَّبِيّٗا ٥١﴾ [ مريم : ٥١ ]
“আর স্মরণ করুন কিতাবে মূসাকে। অবশ্যই তিনি ছিলেন ‘মুখলাস’ (একান্ত করে নেওয়া) এবং তিনি ছিলেন রাসূল নবী”। [সূরা মারয়াম, আয়াত: ৫১] এখানে مخلَصاً শব্দটির লাম ‘যবর’ সহকারে রয়েছে। তবে কোনো কোনো কেরাআতে مخلِصاً অর্থাৎ লামের নীচে ‘যের’ সহকারেও পড়া হয়েছে। আর مخلَص শব্দের অর্থ: আল্লাহ যাকে খাটি করেছেন এবং ময়লা-আবর্জনা হতে মুক্ত করে, যাকে নির্বাচন করেছেন। আর মুখলিস مخلِص শব্দের অর্থ: যে একান্তভাবে আল্লাহর এককত্ব বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কারণেই قل هو الله أحد [তুমি বল, আল্লাহ এক]। এ সূরাটিকে সূরা ইখলাস নামকরণ করা হয়েছে। [কারণ, এ সূরাটিতে আল্লাহকে এককত্বের ঘোষণা রয়েছে]
আল্লামা ইবনুল আসীর রহ. বলেন, এ সূরাটিকে সূরা ইখলাস বলে নাম রাখার কারণ হল, এ সূরাটি আল্লাহ তা‘আলার সীফাত বা গুণাগুণসমূহ বর্ণনার জন্য নির্দিষ্ট। অথবা এ জন্যে যে, এ সূরার তিলাওয়াতকারী আল্লাহর জন্য খালেসভাবে তাওহীদ বা তাঁর এককত্ব সাব্যস্ত করে।
আর ‘কালিমাতুল ইখলাস’ বলতে ‘কালেমাতুত তাওহীদকেই’ বুঝানো হয়ে থাকে।
খালেস বস্তু বলতে বুঝায়, সে পরিষ্কার বস্তুকে, যা থেকে যাবতীয় মিশ্রণ দূরীভূত করা হয়েছে। [লিসানুল আরব ২৬/৭; তাজুল আরূস, পৃ. ৪৪৩৭।]
ফিরোযাবাদী রহ. বলেন, أخلص لله এ কথার অর্থ হল, “সে রিয়া তথা প্রদর্শনেচ্ছা বা লৌকিকতা ছাড়ল।” [আল-কামুসুল মুহীত, ৭৯৮।]
আল্লামা জুরজানী রহ. বলেন, ইখলাসের আভিধানিক অর্থ: “ইবাদত-আনুগত্যে রিয়া তথা প্রদর্শনেচ্ছা পরিহার করা।” [তা‘রীফাত: ২৮।]
ইখলাসের পারিভাষিক অর্থ:
আলেমগণ ইখলাসের একাধিক সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিম্নে আলোচনা করা হল:-
- ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, “ইবাদতের দ্বারা একমাত্র এক আল্লাহর উদ্দেশ্য নেওয়া।” [মাদারেজুস সালেকীন ২/৯১।]
- আল্লামা জুরজানী রহ. বলেন, “মানবাত্মার পরিচ্ছন্নতায় বিঘ্ন ঘটায় এ ধরনের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা থেকে অন্তর খালি করাকেই ইখলাস বলে। আর সেটার মূলকথা হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রে এ কথা চিন্তা করা যায় যে, তার সাথে কোনো না কোনো বস্তুর সংমিশ্রণ থাকতে পারে, তবে যখন কোনো বস্তু অন্য কিছুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত হয়, তখন তাকে খালেস বা খাটি বস্তু বলা হয়। আর এ খাটি করার কাজটি সম্পাদন করার নাম হচ্ছে ইখলাস।” আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِنَّ لَكُمۡ فِي ٱلۡأَنۡعَٰمِ لَعِبۡرَةٗۖ نُّسۡقِيكُم مِّمَّا فِي بُطُونِهِۦ مِنۢ بَيۡنِ فَرۡثٖ وَدَمٖ لَّبَنًا خَالِصٗا سَآئِغٗا لِّلشَّٰرِبِينَ ٦٦﴾ [ النحل : ٦٦ ]
“আর নিশ্চয় চতুষ্পদ জন্তুতে রয়েছে, তোমাদের জন্য শিক্ষা। তার পেটের ভেতরের গোবর ও রক্তের মধ্যখান থেকে তোমারকে আমি দুধ পান করাই, যা খাটি এবং পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যকর”। [সূরা নাহাল, আয়াত: ৬৬]
এখানে দুধ খাটি হওয়ার অর্থ তার মধ্যে রক্ত ও গোবর ইত্যাদির কোনো প্রকার সংমিশ্রণ থাকার অবকাশ না থাকা। [তা‘রীফাত:২৮।]
- আবার কেউ কেউ বলেন, ইখলাস হল, “আমলগুলো যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা মুক্ত ও নির্ভেজাল করা।” [তা‘রীফাত:২৮।]
- হুযাইফা আল মুরআশী রহ. বলেন, “বান্দার ইবাদত প্রকাশ্য ও গোপনে উভয় অবস্থাতে একই পর্যায়ের হওয়ার নাম ইখলাস”। [আত-তীবইয়ান ফী আ-দাবে হামালাতিল কুরআন: ১৩।]
- আবার কেউ কেউ বলেন, ইখলাস হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে স্বীয় আমলের উপর সাক্ষ্য হিসেবে তালাশ না করা, আর বিনিময়দাতা হিসেবেও কেবল তাঁকেই গ্রহণ করা।” [মাদারেজিস সালেকীন, ২/৯২।]
ইখলাসের অর্থে সালাফে সালেহীনদের থেকে বহু উক্তি বর্ণিত হয়েছে, যেমন-
- যাবতীয় আমল একমাত্র আল্লাহর জন্য করা; যাতে গাইরুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য সেখানে কোনো অংশ না থাকে।
- আমলকে সৃষ্টিকুলের সবার পর্যবেক্ষণ মুক্ত করে স্বচ্ছ করা (কেবল আল্লাহর পর্যবেক্ষণে রাখা)
- আমলকে যাবতীয় (শির্ক, রিয়া ইত্যাদির) মিশ্রণ থেকে স্বচ্ছ রাখা।” [মাদারেজুস সালেকীন, ২/৯১-৯২।]
মুখলিসের সংজ্ঞা: মুখলিস সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর সাথে তার আত্মা খাটি ও সংশোধিত হওয়ায়, মানুষের অন্তর থেকে তার মান-মর্যাদা পুরোপুরি বের হওয়াতে কোনো প্রকার পরওয়া করে না। তার আমলের একটি কণা বা বিন্দু পরিমাণ বিষয়েও মানুষ অবগত হোক, তা সে পছন্দ করে না।
অনেক সময় দেখা যায়, মানুষের কথায় ও শরীয়তের ভাষায়, ‘নিয়্যত’ শব্দটি ‘ইখলাস’ এর স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে ফিকহবিদদের মতে নিয়্যতের মূল হচ্ছে, স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেকে ইবাদতকে পৃথক করা এবং এক ইবাদতকে অপর ইবাদত থেকে আলাদা করা। [জামে‘উল উলূম ওয়াল হিকাম: ১/১১।]
স্বাভাবিক কর্ম থেকে ইবাদতকে পৃথক করা, যেমন- পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসল করা থেকে নাপাক হওয়ার কারণে গোসল করাকে আলাদা করা।
এক ইবাদত থেকে অপর ইবাদতকে পৃথক করা। যেমন- যোহরের সালাতকে আছরের সালাত থেকে পৃথক করা।
উল্লেখিত সংজ্ঞার আলোকে বলা যায় যে, নিয়্যতের বিষয়টি আমাদের আলোচনার আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু যদি কেউ নিয়ত শব্দ বলে, আমল দ্বারা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা বুঝায় এবং আমলটি মহান আল্লাহ- যার কোনো শরিক নাই- তার জন্য, নাকি আল্লাহ ও গাইরুল্লাহ উভয়ের জন্য? (তা নির্ধারণ করা বুঝায়) তাহলে এ ধরনের ‘নিয়ত’ ‘ইখলাস’ এর অর্থের অন্তর্ভুক্ত (আর তখন তা আমাদের আলোচ্য বিষয় হিসেবে গণ্য হবে)।
ইবাদতে ‘ইখলাস’ ও ‘সত্যবাদিতা’ উভয় শব্দ অর্থের দিক বিবেচনায় প্রায় কাছাকাছি। তবে উভয়ের মাঝে সামান্য পার্থক্য আছে।
প্রথম পার্থক্য: সত্যবাদিতা হল মূল এবং তা সর্বাগ্রে। আর ইখলাস হল, তার শাখা ও অনুগামী।
দ্বিতীয় পার্থক্য: যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা তার আমলে প্রবেশ করে না ইখলাস ততক্ষণ পর্যন্ত অস্তিত্বে আসে না। আমলে প্রবেশ করার পরই ইখলাসের প্রশ্ন আসে। পক্ষান্তরে ‘সত্যবাদিতা’ তা আমলে প্রবেশ করার পূর্বেও হতে পারে। [তা‘রীফাত ২৮।]
ইখলাস শব্দটি আরবি أخلَص শব্দ হতে নির্গত। এ শব্দের مضارع [মুজারেয়] হল, يُخْلِص আর এর মাছদার, [ إخلاصاً ] অর্থাৎ, নিরেট বা খাটি বস্তু; কোনো বস্তু নির্ভেজাল ও খাটি হওয়া এবং তার সাথে কোন কিছুর সংমিশ্রণ না থাকাকে ইখলাস বলে। যেমন, বলা হয় وأخلص الرجل دينه لله অর্থাৎ, লোকটি তার দ্বীনকে কেবল আল্লাহর জন্যই খাস করল। লোকটি তার দ্বীনের বিষয়ে আল্লাহর সাথে কাউকে মিলায়-নি বা শরিক করে নি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِلَّاعِبَادَكَ مِنۡهُمُ ٱلۡمُخۡلَصِينَ ٤٠﴾ [ الحجر : ٤٠ ]
“তাদের মধ্য থেকে আপনার মুখলিস বা একান্ত বান্দাগণ ছাড়া”। এখানে مخلَصين শব্দটির লাম ‘যবর’ সহকারে রয়েছে। তবে কোনো কোনো কেরাআতে مخلِصين অর্থাৎ লামের নীচে ‘যের’ সহকারেও পড়া হয়েছে।
সা‘লাব রহ. বলেন, مخلِصِين (লাম এর নীচে ‘যের’ সহকারে) এর অর্থ যারা ইবাদতকে কেবল আল্লাহর জন্যই করে থাকেন। আর مُخۡلَصِينَ (লামের উপর ‘যবর’ সহকারে) এর অর্থ, যাদেরকে আল্লাহ একান্তভাবে নিজের করে নিয়েছেন।
যাজ্জাজ রহ. বলেন, আল্লাহর তা‘আলার বাণী-
﴿وَٱذۡكُرۡ فِي ٱلۡكِتَٰبِ مُوسَىٰٓۚ إِنَّهُۥ كَانَ مُخۡلَصٗا وَكَانَ رَسُولٗا نَّبِيّٗا ٥١﴾ [ مريم : ٥١ ]
“আর স্মরণ করুন কিতাবে মূসাকে। অবশ্যই তিনি ছিলেন ‘মুখলাস’ (একান্ত করে নেওয়া) এবং তিনি ছিলেন রাসূল নবী”। [সূরা মারয়াম, আয়াত: ৫১] এখানে مخلَصاً শব্দটির লাম ‘যবর’ সহকারে রয়েছে। তবে কোনো কোনো কেরাআতে مخلِصاً অর্থাৎ লামের নীচে ‘যের’ সহকারেও পড়া হয়েছে। আর مخلَص শব্দের অর্থ: আল্লাহ যাকে খাটি করেছেন এবং ময়লা-আবর্জনা হতে মুক্ত করে, যাকে নির্বাচন করেছেন। আর মুখলিস مخلِص শব্দের অর্থ: যে একান্তভাবে আল্লাহর এককত্ব বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কারণেই قل هو الله أحد [তুমি বল, আল্লাহ এক]। এ সূরাটিকে সূরা ইখলাস নামকরণ করা হয়েছে। [কারণ, এ সূরাটিতে আল্লাহকে এককত্বের ঘোষণা রয়েছে]
আল্লামা ইবনুল আসীর রহ. বলেন, এ সূরাটিকে সূরা ইখলাস বলে নাম রাখার কারণ হল, এ সূরাটি আল্লাহ তা‘আলার সীফাত বা গুণাগুণসমূহ বর্ণনার জন্য নির্দিষ্ট। অথবা এ জন্যে যে, এ সূরার তিলাওয়াতকারী আল্লাহর জন্য খালেসভাবে তাওহীদ বা তাঁর এককত্ব সাব্যস্ত করে।
আর ‘কালিমাতুল ইখলাস’ বলতে ‘কালেমাতুত তাওহীদকেই’ বুঝানো হয়ে থাকে।
খালেস বস্তু বলতে বুঝায়, সে পরিষ্কার বস্তুকে, যা থেকে যাবতীয় মিশ্রণ দূরীভূত করা হয়েছে। [লিসানুল আরব ২৬/৭; তাজুল আরূস, পৃ. ৪৪৩৭।]
ফিরোযাবাদী রহ. বলেন, أخلص لله এ কথার অর্থ হল, “সে রিয়া তথা প্রদর্শনেচ্ছা বা লৌকিকতা ছাড়ল।” [আল-কামুসুল মুহীত, ৭৯৮।]
আল্লামা জুরজানী রহ. বলেন, ইখলাসের আভিধানিক অর্থ: “ইবাদত-আনুগত্যে রিয়া তথা প্রদর্শনেচ্ছা পরিহার করা।” [তা‘রীফাত: ২৮।]
ইখলাসের পারিভাষিক অর্থ:
আলেমগণ ইখলাসের একাধিক সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিম্নে আলোচনা করা হল:-
- ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, “ইবাদতের দ্বারা একমাত্র এক আল্লাহর উদ্দেশ্য নেওয়া।” [মাদারেজুস সালেকীন ২/৯১।]
- আল্লামা জুরজানী রহ. বলেন, “মানবাত্মার পরিচ্ছন্নতায় বিঘ্ন ঘটায় এ ধরনের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা থেকে অন্তর খালি করাকেই ইখলাস বলে। আর সেটার মূলকথা হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রে এ কথা চিন্তা করা যায় যে, তার সাথে কোনো না কোনো বস্তুর সংমিশ্রণ থাকতে পারে, তবে যখন কোনো বস্তু অন্য কিছুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত হয়, তখন তাকে খালেস বা খাটি বস্তু বলা হয়। আর এ খাটি করার কাজটি সম্পাদন করার নাম হচ্ছে ইখলাস।” আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِنَّ لَكُمۡ فِي ٱلۡأَنۡعَٰمِ لَعِبۡرَةٗۖ نُّسۡقِيكُم مِّمَّا فِي بُطُونِهِۦ مِنۢ بَيۡنِ فَرۡثٖ وَدَمٖ لَّبَنًا خَالِصٗا سَآئِغٗا لِّلشَّٰرِبِينَ ٦٦﴾ [ النحل : ٦٦ ]
“আর নিশ্চয় চতুষ্পদ জন্তুতে রয়েছে, তোমাদের জন্য শিক্ষা। তার পেটের ভেতরের গোবর ও রক্তের মধ্যখান থেকে তোমারকে আমি দুধ পান করাই, যা খাটি এবং পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যকর”। [সূরা নাহাল, আয়াত: ৬৬]
এখানে দুধ খাটি হওয়ার অর্থ তার মধ্যে রক্ত ও গোবর ইত্যাদির কোনো প্রকার সংমিশ্রণ থাকার অবকাশ না থাকা। [তা‘রীফাত:২৮।]
- আবার কেউ কেউ বলেন, ইখলাস হল, “আমলগুলো যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা মুক্ত ও নির্ভেজাল করা।” [তা‘রীফাত:২৮।]
- হুযাইফা আল মুরআশী রহ. বলেন, “বান্দার ইবাদত প্রকাশ্য ও গোপনে উভয় অবস্থাতে একই পর্যায়ের হওয়ার নাম ইখলাস”। [আত-তীবইয়ান ফী আ-দাবে হামালাতিল কুরআন: ১৩।]
- আবার কেউ কেউ বলেন, ইখলাস হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে স্বীয় আমলের উপর সাক্ষ্য হিসেবে তালাশ না করা, আর বিনিময়দাতা হিসেবেও কেবল তাঁকেই গ্রহণ করা।” [মাদারেজিস সালেকীন, ২/৯২।]
ইখলাসের অর্থে সালাফে সালেহীনদের থেকে বহু উক্তি বর্ণিত হয়েছে, যেমন-
- যাবতীয় আমল একমাত্র আল্লাহর জন্য করা; যাতে গাইরুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য সেখানে কোনো অংশ না থাকে।
- আমলকে সৃষ্টিকুলের সবার পর্যবেক্ষণ মুক্ত করে স্বচ্ছ করা (কেবল আল্লাহর পর্যবেক্ষণে রাখা)
- আমলকে যাবতীয় (শির্ক, রিয়া ইত্যাদির) মিশ্রণ থেকে স্বচ্ছ রাখা।” [মাদারেজুস সালেকীন, ২/৯১-৯২।]
মুখলিসের সংজ্ঞা: মুখলিস সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর সাথে তার আত্মা খাটি ও সংশোধিত হওয়ায়, মানুষের অন্তর থেকে তার মান-মর্যাদা পুরোপুরি বের হওয়াতে কোনো প্রকার পরওয়া করে না। তার আমলের একটি কণা বা বিন্দু পরিমাণ বিষয়েও মানুষ অবগত হোক, তা সে পছন্দ করে না।
অনেক সময় দেখা যায়, মানুষের কথায় ও শরীয়তের ভাষায়, ‘নিয়্যত’ শব্দটি ‘ইখলাস’ এর স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে ফিকহবিদদের মতে নিয়্যতের মূল হচ্ছে, স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেকে ইবাদতকে পৃথক করা এবং এক ইবাদতকে অপর ইবাদত থেকে আলাদা করা। [জামে‘উল উলূম ওয়াল হিকাম: ১/১১।]
স্বাভাবিক কর্ম থেকে ইবাদতকে পৃথক করা, যেমন- পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসল করা থেকে নাপাক হওয়ার কারণে গোসল করাকে আলাদা করা।
এক ইবাদত থেকে অপর ইবাদতকে পৃথক করা। যেমন- যোহরের সালাতকে আছরের সালাত থেকে পৃথক করা।
উল্লেখিত সংজ্ঞার আলোকে বলা যায় যে, নিয়্যতের বিষয়টি আমাদের আলোচনার আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু যদি কেউ নিয়ত শব্দ বলে, আমল দ্বারা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা বুঝায় এবং আমলটি মহান আল্লাহ- যার কোনো শরিক নাই- তার জন্য, নাকি আল্লাহ ও গাইরুল্লাহ উভয়ের জন্য? (তা নির্ধারণ করা বুঝায়) তাহলে এ ধরনের ‘নিয়ত’ ‘ইখলাস’ এর অর্থের অন্তর্ভুক্ত (আর তখন তা আমাদের আলোচ্য বিষয় হিসেবে গণ্য হবে)।
ইবাদতে ‘ইখলাস’ ও ‘সত্যবাদিতা’ উভয় শব্দ অর্থের দিক বিবেচনায় প্রায় কাছাকাছি। তবে উভয়ের মাঝে সামান্য পার্থক্য আছে।
প্রথম পার্থক্য: সত্যবাদিতা হল মূল এবং তা সর্বাগ্রে। আর ইখলাস হল, তার শাখা ও অনুগামী।
দ্বিতীয় পার্থক্য: যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা তার আমলে প্রবেশ করে না ইখলাস ততক্ষণ পর্যন্ত অস্তিত্বে আসে না। আমলে প্রবেশ করার পরই ইখলাসের প্রশ্ন আসে। পক্ষান্তরে ‘সত্যবাদিতা’ তা আমলে প্রবেশ করার পূর্বেও হতে পারে। [তা‘রীফাত ২৮।]