hadith book logo

সঠিক ইসলামী মতবাদ [আর-রিসালাতুশ শামিয়্যাহ]

লেখকঃ আব্দুল আযীয ইবন মারযূক আত-ত্বারীফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

সপ্তম অধ্যায়: কুরআন আল্লাহর বাণী বা কথা, কুরআনের শব্দ, আয়াত ও সূরাসহ তিনি বাস্তবেই কথাগুলো বলেছেন

কুরআন আল্লাহর বাণী বা কথা, কুরআনের শব্দ, আয়াত ও সূরাসহ তিনি বাস্তবেই কথাগুলো বলেছেন। আমরা বলব না যে, কুরআন দ্বারা শুধু অর্থই উদ্দেশ্য, কিংবা এ শব্দগুলো দ্বারা প্রকৃত কুরআনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আর আমরা বলব, তিনি সবসময়, যখন ইচ্ছা তখনই কথা-বার্তা বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَكَلَّمَ ٱللَّهُ مُوسَىٰ تَكۡلِيمٗا﴾ [ النساء : ١٦٤ ]

“আর অবশ্যই আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৪]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَٰتِنَا وَكَلَّمَهُۥ رَبُّهُ﴾ [ الاعراف : ١٤٣ ]

“আর মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৪৩]

আর তাঁর কালাম বা বাক্যই হচ্ছে তাঁর কথা:

﴿وَٱللَّهُ يَقُولُ ٱلۡحَقَّ﴾ [ الاحزاب : ٤ ]

“আর আল্লাহ সত্য কথাই বলেন।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪]

আর আল্লাহর বাণী ও কথা অন্তরসমূহ সংরক্ষণ করে রাখে:

﴿بَلۡ هُوَ ءَايَٰتُۢ بَيِّنَٰتٞ فِي صُدُورِ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَۚ ﴾ [ العنكبوت : ٤٩ ]

“বরং যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, বস্তুত তাদের অন্তরে এটা স্পষ্ট নিদর্শন।” [সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৪৯]

আর আল্লাহর কথা কানে শ্রুত হয়:

﴿وَإِنۡ أَحَدٞ مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٱسۡتَجَارَكَ فَأَجِرۡهُ حَتَّىٰ يَسۡمَعَ كَلَٰمَ ٱللَّهِ﴾ [ التوبة : ٦ ]

“আর মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬] আর যদিও আল্লাহর বাণী কুরআনের প্রচারক ছিলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কিন্তু এই কারণে তা আল্লাহর কথা থেকে বের হয়ে যায় নি।

আর আল্লাহর বাণী কাগজের ছত্রে লিপিবদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَكِتَٰبٖ مَّسۡطُورٖ ٢ فِي رَقّٖ مَّنشُورٖ ٣ ﴾ [ الطور : ٢، ٣ ]

“শপথ কিতাবের, যা লিখিত আছে; উন্মুক্ত পাতায়।” [সূরা আত-তূর: ২-৩] কুরআনকে আল্লাহ লাওহে মাহফূযে তাঁর কাছে সংরক্ষণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [ البروج : ٢١، ٢٢ ]

“বস্তুত এটা সম্মানিত কুরআন, সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ।” [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ২১, ২২]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَإِنَّهُۥ فِيٓ أُمِّ ٱلۡكِتَٰبِ لَدَيۡنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ ٤ ﴾ [ الزخرف : ٤ ]

“আর নিশ্চয় তা আমাদের কাছে উম্মুল কিতাবে; উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, হিকমতপূর্ণ।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৪]

আর কাগজের ছত্রে লেখার কারণে সেটা আল্লাহর কথা থেকে বের হয়ে যায় না। কারণ, কাগজ সৃষ্ট বস্তু, অনুরূপভাবে কালিও (কিন্তু যাতে যা লিখা হয়েছে তা আল্লাহর কথা।) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ نَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ كِتَٰبٗا فِي قِرۡطَاسٖ ﴾ [ الانعام : ٧ ]

“আমরা যদি আপনার প্রতি কাগজে লিখিত কিতাবও নাযিল করতাম।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৭] এখানে কিতাবকে এক বস্তু আর কাগজকে আরেক বস্তু সাব্যস্ত করা হয়েছে।

আর এ কুরআন যদিও সৃষ্ট কলম দিয়ে ও সৃষ্ট কালি দিয়ে লেখা হয় তবুও যে তা আল্লাহর-ই কথা, সেটা সাব্যস্ত করতে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ أَنَّمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ مِن شَجَرَةٍ أَقۡلَٰمٞ وَٱلۡبَحۡرُ يَمُدُّهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦ سَبۡعَةُ أَبۡحُرٖ مَّا نَفِدَتۡ كَلِمَٰتُ ٱللَّهِۚ ﴾ [ لقمان : ٢٧ ]

“আর যমীনের সব গাছ যদি কলম হয় এবং সাগর, তার পরে আরও সাত সাগর কালি হিসেবে যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবে না।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿قُل لَّوۡ كَانَ ٱلۡبَحۡرُ مِدَادٗا لِّكَلِمَٰتِ رَبِّي لَنَفِدَ ٱلۡبَحۡرُ قَبۡلَ أَن تَنفَدَ كَلِمَٰتُ رَبِّي وَلَوۡ جِئۡنَا بِمِثۡلِهِۦ مَدَدٗا ١٠٩﴾ [ الكهف : ١٠٩ ]

“বলুন, ‘আমার রব-এর কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য সাগর যদি কালি হয়, তবে আমার রব-এর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাগর নিঃশেষ হয়ে যাবে, আমরা এর সাহায্যের জন্য এর মত আরো সাগর আনলেও।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১০৯]

সুতরাং যা কলম লিখেছে আর যা কলম দিয়ে লিখা হয় নি সবই সমভাবে আল্লাহর কথা বা বাণী।

আর যে ব্যক্তি বলে, আল্লাহর বাণী সৃষ্ট, সে কাফির হয়ে যাবে। কেননা তাঁর কথা তাঁর গুণাবলীর মধ্য থেকে একটি গুণ। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কথা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি বলেন,

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤ ﴾ [ الاعراف : ٥٤ ]

“নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ কত বরকতময়!” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, এখানে তিনি তাঁর সৃষ্টি, অর্থাৎ আসমান ও যমীন, সূর্য, চন্দ্র ও তারকা এবং তার নির্দেশ, অর্থাৎ মহান আল্লাহ সুবহানাহু এর কথা, যার দ্বারা তিনি সৃষ্টিজগতকে অস্তিত্বে এনেছেন, এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি বলেছেন, “এ সবই তাঁর নির্দেশের অনুগত”।

আর আল্লাহ তা‘আলা পাঠকদের স্বর সৃষ্টি করেছেন, আর এটা করেছেন দু’ ঠোট, জিহ্বা, গলা, বাতাস, লালা ও তার নড়াচড়া সৃষ্টি করার মাধ্যমে। কিন্তু তা এটা বোঝায় না যে, শ্রুত বস্তুটি আল্লাহর কথা নয়। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ۡ وَقَدۡ كَانَ فَرِيقٞ مِّنۡهُمۡ يَسۡمَعُونَ كَلَٰمَ ٱللَّهِ ﴾ [ البقرة : ٧٥ ]

“অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ৭৫] সুতরাং যা শ্রুত হয়, তা অবশ্যই আল্লাহর কালাম বা বাক্য, যদিও কোনো পাঠক সেটা উচ্চারণ করে থাকে। যেমন, কোনো কোনো আলিম বলেছেন, আওয়াজ বা স্বর হচ্ছে পাঠকের স্বর, আর কথা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার কথা”।