hadith book logo

সঠিক ইসলামী মতবাদ [আর-রিসালাতুশ শামিয়্যাহ]

লেখকঃ আব্দুল আযীয ইবন মারযূক আত-ত্বারীফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

পঞ্চম অধ্যায়: আল-ঈমান

আল-ঈমান: কথা, কাজ ও বিশ্বাস। এ তিনটির সবগুলো মিলেই ঈমান। যেমনিভাবে মাগরিব তিন রাকাত। তা থেকে যদি এক রাকাত কমানো হয়, তবে সেটাকে মাগরিব বলা যাবে না; তেমনিভাবে ঈমান থেকে কথা, কাজ বা বিশ্বাস- এ তিনটির কোনো একটি কমানো হলে সেটাকে ঈমান নাম দেওয়া যাবে না।

আর আমরা এ তিনটিকে ঈমানের শর্ত কিংবা ওয়াজিব অথবা রুকন বলব না, যদিও এ সব পরিভাষার কোনো কোনোটি বিশুদ্ধ অর্থ প্রদান করে থাকে। কারণ, এর কোনো কোনোটি ভুল অর্থ আবশ্যক করে নিতে পারে।

আর এ তিনটি (যার একটি না হলে ঈমানও নাই হয়ে যায়) এর হাকীকত বা বাস্তবতা তা-ই, যা মুহাম্মাদী শরী‘আতের সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং বিশ্বাসের অর্থ ‘মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা’ এবং ‘হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা’ হবে না। কেননা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস না থাকলেও অধিকাংশ অন্তরেই এরূপ অহিংসা ও কল্যাণকামিতার প্রতি টান থাকে। বরং বিশ্বাস দ্বারা উদ্দেশ্য: অন্তরের বিশেষ কথা ও কাজ।

অন্তরের কথা হচ্ছে: এ কথার সত্যায়ন করা যে, আল্লাহ ব্যতীত হক্ব কোনো ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রব থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তা হক্ব ও বাস্তব।

আর অন্তরের আমল বা কাজ হচ্ছে: আল্লাহকে, তাঁর নাবীকে ও দীন-ইসলামকে ভালোবাসা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা পছন্দ করেন তা পছন্দ করা, আর আল্লাহর ইবাদতে তাঁর প্রতি নিষ্ঠা অবলম্বন।

কথা-বার্তায় সত্য বলা, পিতা-মাতার প্রতি নম্র সম্ভাষণ করা, সালাম বিনিময় করা, পথহারা পথের দিশা প্রদান ইত্যাদি সাধারণ কল্যাণমূলক শব্দেই ঈমানের অংশ ‘কথার’ উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধ নয়। কেননা এ কাজগুলো সকল আত্মাই ভালোবাসে, যদিও সে আল্লাহর সাথে কুফরকারী, তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকারকারী হয়। বরং এই কথা দ্বারা উদ্দেশ্য তা-ই, যা মুহাম্মাদী রিসালাতের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর তার সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে, কালেমাদ্বয়ের সাক্ষ্য প্রদান, তাসবীহ ও তাকবীর।

অনুরূপভাবে সাধারণভাবে যে সৎকাজ বুঝায় ‘আমল বা কাজ’ সেটায় সীমাবদ্ধ নয়, যেমন, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ, ফকীরদের খাবার খাওয়ানো, অত্যাচারিতদের সাহায্য করা, মেহমানদের সম্মান করা। কেননা এগুলোর প্রতি সব আত্মারই ঝোঁক রয়েছে, যদিও তাতে ঈমান না থাকে। বরং ঈমানের অংশ আমল দ্বারা উদ্দেশ্য: সে আমল বা কাজ, যা প্রচারের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে নির্দেশিত ছিলেন। যেমন সালাত, যাকাত, সাওম, হজ ইত্যাদি।

আর যেসব সৎকাজের ব্যাপারে সকল আসমানী রিসালাত ও মানুষের স্বভাব প্রমাণবহ, এমন সব কাজ একান্তভাবে ইখলাস বা নিষ্ঠাসহকারে আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হলে তাতে ঈমান বর্ধিত হয়। যেমন, মানুষের জন্য কল্যাণ পছন্দ করা, কথা-বার্তায় সত্যবাদী হওয়া, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, ফকীর-মিসকীনদেরকে খাবার খাওয়ানো, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা ইত্যাদি। কিন্তু সেগুলো না হলে ঈমান বিলুপ্ত হয়ে যায় না, যেমনিভাবে সেগুলো পাওয়া গেলেই ঈমান পাওয়া যায় না। বরং এগুলো প্রমাণ করে যে, সে-ব্যক্তির মাঝে ফিতরাত তথা স্বাভাবিক বিশুদ্ধতা বিদ্যমান এবং মানুষের সৃষ্টিগত মানবিকতা তার মাঝে পরিবর্তিত হয় নি, আর সে হক্ব গ্রহণের বেশি নিকটবর্তী:

﴿فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ ﴾ [ الروم : ٣٠ ]

“আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি), যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

আর ঈমান: বাড়ে ও কমে, আবার একেবারে চলেও যায়। আনুগত্যের কারণে বৃদ্ধি পায়, গুনাহের কারণে কমে যায়, তবে কুফুর বা শির্ক না-হলে একেবারে চলে যায় না। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُهُۥ زَادَتۡهُمۡ إِيمَٰنٗا ﴾ [ الانفال : ٢ ]

“মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَيَزۡدَادَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِيمَٰنٗا ﴾ [ المدثر : ٣١ ]

“আর যারা ঈমান এনেছে তাদের ঈমান বেড়ে যায়।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩১]

তিনি আরও বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ ٱلسَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ لِيَزۡدَادُوٓاْ إِيمَٰنٗا مَّعَ إِيمَٰنِهِمۡ﴾ [ الفتح : ٤ ]

“তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেছেন যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে ঈমান বৃদ্ধি করে নেয়।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ৪]

কুফুরীর পরে ঈমান কেবল তখনই সাব্যস্ত হবে যখন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থাকবে:

বিশ্বাস: অন্তরের কথা দ্বারা। আর সেটা হচ্ছে, রিসালাতে বিশ্বাস। আর অন্তরের আমল দ্বারা। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা ভালোবাসেন তা পছন্দ করা।

অতঃপর মুখের কথা।

তারপর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল।

আর যে ব্যক্তি অন্তর দ্বারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং জিহ্বা দ্বারা উচ্চারণ করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও উচ্চারণ করে নি, সে মুমিন নয়।

আর যে ব্যক্তি অন্তর দ্বারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আর তার জিহ্বা দ্বারা উচ্চারণও করেছে, কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী‘আতের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত যে আমল রয়েছে সেগুলোর ওপর আমল করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোর ওপর আমল করে নি, সে মুমিন নয়।

আর যে ব্যক্তি উচ্চারণ করতে অথবা আমল করতে সচেষ্ট ছিল, কিন্তু করতে সক্ষম হয় নি: তাহলে তার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ ﴾ [ البقرة : ٢٨٦ ]

“আল্লাহ্ কারো ওপর এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যাতীত।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬]

তিনি আরও বলেন,

﴿لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا مَآ ءَاتَىٰهَاۚ ﴾ [ الطلاق : ٧ ]

“আল্লাহ্ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার ওপর চাপান না।” [সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৭]