hadith book logo

সঠিক ইসলামী মতবাদ [আর-রিসালাতুশ শামিয়্যাহ]

লেখকঃ আব্দুল আযীয ইবন মারযূক আত-ত্বারীফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

ভূমিকা

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি যাবতীয় প্রশংসার যোগ্য, তাঁর প্রশংসা করে শেষ করা যাবে না, আর তাঁর প্রশংসারও কোনো কূল-কিনারা নেই। সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ব তাঁরই জন্য।

আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কোনো হক্ব ইলাহ নেই, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, নেই কোনো উপমা, তাঁর কোনো শরীক নেই, নেই কোনো সাদৃশ্য।

আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁর ওপর, তার পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের ওপর দুরূদ পেশ করুন ও সালাম প্রদান করুন।

অতঃপর.........

এটি একটি “সংক্ষিপ্ত আকীদা” যা আমি শামবাসীদের জন্য লিপিবদ্ধ করেছি। তারা তাদের যমীন ও দেশের বৈধ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হতে যাচ্ছে, যা শত বছর ব্যাপী নাসারাদের আগ্রাসন, তারপর বিভিন্ন বাতেনী ফির্কার অবৈধ হস্তক্ষেপে জর্জরিত হয়েছিল। আর যার অনিবার্য ফলাফলস্বরূপ সেখানে অনেক ফিতনা-ফাসাদ ও ইসলামের মৌলিক-নীতিমালা ও শাখাসমূহে ব্যাপক পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটেছিল।

আমার কাছে সেখানকার অধিবাসী ও অধিবাসী নন এমন অনেকেই অনুরোধ করেছেন, যাতে আমি তাদের জন্য সে প্রশ্নের জওয়াব লিখি, যা রোজ-কিয়ামতে হিসাবের দিনে জিজ্ঞাসিত হবে অর্থাৎ বান্দার ওপর আল্লাহর হক্ব বা অধিকার সম্পর্কে, যার নির্দেশ তিনি নূহ ও তার পরবর্তী প্রত্যেক নাবীকে দিয়েছেন এবং যা দ্বারা পরিসমাপ্ত হয়েছে উম্মী নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ ইসলামের রিসালাত:

﴿شَرَعَ لَكُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِۦ نُوحٗا وَٱلَّذِيٓ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ وَمَا وَصَّيۡنَا بِهِۦٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰٓۖ أَنۡ أَقِيمُواْ ٱلدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُواْ فِيهِۚ ﴾ [ الشورى : ١٣ ]

“তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা আমরা অহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই বলে যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি কর না।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১৩]

খারাপ কামনা-বাসনা ও লালসার ব্যাপকতা লাভের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে কু-প্রবৃত্তিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, কু-প্রবৃত্তির ব্যাপকতার সাথে সাথে মতপার্থক্যও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আর মতপার্থক্য ব্যাপক হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন দল-উপদলেরও ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। যখনই আরবী ভাষা-ভাষী ও অন্যান্যদের মাঝে আরবী ভাষা জ্ঞান দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখনই সহজ হয়ে পড়েছে অপব্যাখ্যা ও সন্দেহ-শংসয় দ্বারা পরিতুষ্ট করা, হাদীস ও আয়াতসূহের ভিন্ন অর্থ করার অপচেষ্টা করা। ইসলামের প্রথম যুগে উত্থিত ফির্কাসমূহের মধ্যে যখন এ কাজসমূহ সহজভাবে হয়েছিল, তখন তাদের পরবর্তী লোকদের মধ্যে সেটা আরও বেশি সহজ ও অনায়াসেই হতে পারে, বিশেষ করে সেখানে যখন কু-প্রবৃত্তি ও সন্দেহ-সংশয়ের বীজ আছে! কারণ, সন্দেহ-সংশয় তো মূলতঃ প্রবৃত্তি থেকে উত্থিত হয়, তারপর তা সন্দেহে রূপান্তরিত হয়, তারপর তা অনুসৃত মাযহাবে পরিণত হয়। এরপর কিছু মানুষ একে সর্বশেষ অবস্থা দেখে গ্রহণ করে নেয়, আর তার প্রথম অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞই থাকে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿أَفَكُلَّمَا جَآءَكُمۡ رَسُولُۢ بِمَا لَا تَهۡوَىٰٓ أَنفُسُكُمُ ٱسۡتَكۡبَرۡتُمۡ فَفَرِيقٗا كَذَّبۡتُمۡ وَفَرِيقٗا تَقۡتُلُونَ﴾ [ البقرة : ٨٧ ]

“তবে কি যখনি কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু এনেছে যা তোমাদের প্রবৃত্তি মানে না, তখনি তোমরা অহংকার করেছ? অতঃপর (নাবীদের) একদলের ওপর মিথ্যারোপ করেছ এবং একদলকে করেছ হত্যা?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৮৭] এখানে কু-প্রবৃত্তিকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা অহংকারে পরিণত হয়েছে, তারপর তা মিথ্যারোপের রূপ গ্রহণ করেছে; আর শেষে তা শত্রুতায় রূপান্তরিত হয়েছে। প্রত্যেক উম্মতে দল-উপদল ও ভ্রষ্ট চিন্তাধারার উন্মেষ এভাবেই ঘটে থাকে।

আর আল্লাহ তাঁর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর হক্ব ও হেদায়াত নাযিল করেছেন। সুতরাং যে এটি স্বচ্ছভাবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক সে যেন বিভিন্ন বিবেকের দ্বারা কলুষিত হওয়ার পূর্বেকার প্রথম মূলনীতি থেকে একে গ্রহণ করে। কারণ, অহী হচ্ছে পানির মতো, আর বিবেকগুলো পাত্রের ন্যায়। আল্লাহ তা‘আলা অহী নাযিল করেছেন এবং সেটাকে তাঁর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে স্থাপন করেছেন। তারপর নাবী একে সাহাবীগণের কাছে রেখে যান, এরপর সাহাবীগণ একে তাবে‘ঈদের কাছে রেখে যান। যতই নতুন নতুন পাত্রে ঢালা হচ্ছে ততই তাতে ময়লা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুতরাং সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ পাত্র হচ্ছে প্রথম পাত্র; আর তা হচ্ছে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তারপর সাহাবীগণ। ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«َأَنَا أَمَنَةٌ لِأَصْحَابِي، فَإِذَا ذَهَبْتُ أَتَى أَصْحَابِي مَا يُوعَدُونَ، وَأَصْحَابِي أَمَنَةٌ لِأُمَّتِي، فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِي أَتَى أُمَّتِي مَا يُوعَدُونَ»

“আমি আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। যখন আমি চলে যাব তখন আমার উম্মতের ওপর যা ওয়াদা করা হচ্ছে, তা আপতিত হবে। আর আমার সাহাবীগণ আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। অতঃপর যখন আমার সাহাবীগণ চলে যাবেন, তখন আমার উম্মতের ওপর যা আসার কথা বলা হচ্ছে তা এসে যাবে।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৩১।]

সুতরাং দীনকে অহী তথা কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত আর কোনো কিছু থেকে গ্রহণ করা যাবে না:

﴿هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلۡأُمِّيِّ‍ۧنَ رَسُولٗا مِّنۡهُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ ﴾ [ الجمعة : ٢ ]

“তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যিনি তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত।” [সূরা আল-জুমু‘আ, আয়াত: ২] আর তাই এ দু’টি উৎস ব্যতীত অন্য যেখান থেকেই দীন জানা যাবে, তা হবে বস্তুত মূর্খতা ও অজ্ঞতারই অপর নাম।

আর অহীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ বুঝ হচ্ছে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের বুঝ। আর তাই আমরা অহী যেটার ওপর প্রমাণবহ, যার ওপর সাহাবায়ে কেরামের বুঝ ঐকমত্য পোষণ করেছে এবং যার ওপর উত্তম প্রজন্মের লোকদের ইজমা‘ অনুষ্ঠিত হয়েছে সেটাই উল্লেখ করব। সুতরাং আমরা বলছি: