hadith book logo

সঠিক ইসলামী মতবাদ [আর-রিসালাতুশ শামিয়্যাহ]

লেখকঃ আব্দুল আযীয ইবন মারযূক আত-ত্বারীফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

ষষ্ঠ অধ্যায়: আল্লাহর রয়েছে সুউচ্চ গুণাবলী এবং সুন্দর নামসমূহ…

আল্লাহর রয়েছে সুউচ্চ গুণাবলী এবং সুন্দর নামসমূহ, আর আল্লাহ সম্পর্কে মহান সত্ত্বা নিজের চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তাই তিনি নিজে, তাঁর কিতাবে ও তাঁর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে, যা তাঁর নিজ থেকে সাব্যস্ত করতে অস্বীকার করেছেন: আমরাও তা অস্বীকার করব। আর যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন: আমরাও তা সাব্যস্ত করব। তাছাড়া আমরা তার থেকে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি অস্বীকার করব, তবে এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্তভাবে বলব, আর তার জন্য যাবতীয় পূর্ণগুণগুলো সাব্যস্ত করব, তবে সেটাকে বিস্তারিতভাবে বলব। আর আমরা সেগুলোর ধরণ নির্ধারণ করব না, সেগুলোর উপমা পেশ করব না এবং সেগুলোর সাদৃশ্য তুলে ধরবো না।

আর যে কেউ তাঁর বিস্তারিত দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করবে, আমরাও তখন সে দোষ-ত্রুটি বিস্তারিতভাবে খণ্ডন করব। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের পক্ষ থেকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে অস্বীকার করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿أَنَّىٰ يَكُونُ لَهُۥ وَلَدٞ وَلَمۡ تَكُن لَّهُۥ صَٰحِبَةٞۖ ﴾ [ الانعام : ١٠١ ]

“তাঁর সন্তান হবে কীভাবে? তাঁর তো কোনো সঙ্গিনী নেই।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০১]

তিনি আরও বলেন,

﴿لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ ٣ ﴾ [ الاخلاص : ٣ ]

“তিনি কাউকেও জন্ম দেন নি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয় নি।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ৩] অনুরূপভাবে ইয়াহূদীদের দ্বারা তাঁকে কৃপণ হওয়ার দোষ দেওয়াতে তিনি বিস্তারিতভাবেই সেটাকে অস্বীকার করেছেন:

﴿وَقَالَتِ ٱلۡيَهُودُ يَدُ ٱللَّهِ مَغۡلُولَةٌۚ غُلَّتۡ أَيۡدِيهِمۡ وَلُعِنُواْ بِمَا قَالُواْۘ بَلۡ يَدَاهُ مَبۡسُوطَتَانِ﴾ [ المائ‍دة : ٦٤ ]

“আর ইয়াহূদীরা বলে, আল্লাহর হাত রুদ্ধ। তাদের হাতই রুদ্ধ করা হয়েছে এবং তারা যা বলে সে জন্য তারা অভিশপ্ত, বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৬৪]

আর আমরা অহী যেভাবে এসেছে সেভাবেই সেটাকে রেখে দেব। যেমন, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কিত আগত বিষয়গুলো: আমরা সেগুলোর বাস্তবতা সাব্যস্ত করি, সেগুলোর কিছু প্রভাব প্রত্যক্ষ করি, তার চেয়ে বাড়িয়ে কিছু বলি না। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর মতো কোনো কিছু নেই। তিনি বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ﴾ [ الشورا : ١١ ]

“কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

আল্লাহর গুণগুলোকে কোনো কিছুর ওপর কিয়াস বা অনুমান করা যাবে না। কারণ কিয়াস হতে হলে মূল ও শাখার প্রয়োজন পড়ে। আর আল্লাহ হচ্ছেন এমন এক সত্ত্বা যার কোনো সদৃশ নেই। সুতরাং কোনো শাখা তাঁর নিকটেও পৌঁছুতে পারে না, আর কোনো মূল তাঁর উপরে থাকতে পারে না। তিনি একক, অমুখাপেক্ষী, জন্ম দেন নি, জন্ম নেন নি, আর কেউ তার সমকক্ষ নেই।

আর মানুষের বুদ্ধি-বিবেক যন্ত্রসদৃশ, যেগুলোকে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন এমনভাবে যে, সে যা শোনে, বা যা দেখে তার ওপর কিয়াস করে। ফলে সে আল্লাহ কর্তৃক তার নিজ সম্পর্কে দেওয়া খবর বা সংবাদ শুনে, অথচ সে তাঁকে এর আগে দেখে নি, তখন সে তার দেখা সবচেয়ে নিকটতম উদাহরণটির ওপর সেটাকে কিয়াস করে এবং যা সে দেখেছে সেটা অনুসারে তার ধরণ বর্ণনা করে, কিন্তু আল্লাহ, বিবেকসমূহে তো তাঁর সদৃশ কোনো কিছু নেই। সুতরাং কোনো খারাপ উদাহরণ মনে উদিত হওয়ার কারণে সেটাকে অস্বীকার করতে গিয়ে, সে গুণ বা নামকে তাঁর থেকে অস্বীকার করে তাঁর কোনো নাম বা গুণকে আমরা অর্থহীন করব না। কারণ, এতে করে আমরা বাতিল কিয়াসও অস্বীকার করব, আবার সহীহ কোনো খবরে মিথ্যারোপ করার মত গুনাহে পতিত হবো। কিন্তু তা না করে আমরা, মনে যে খারাপ অর্থ উদিত হবে তা অবশ্যই অস্বীকার করব, আর সাথে সাথে আল্লাহ নিজে তাঁর নিজের জন্য যে গুণ ও নাম সাব্যস্ত করেছেন তা সাব্যস্ত করব, তারপর সেখানেই অবস্থান করব (অর্থাৎ বাড়িয়ে বা কমিয়ে কিছু বলব না)। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا ١١٠﴾ [ طه : ١١٠ ]

“তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে, তা তিনি অবগত, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১০]

তিনি আরও বলেন,

﴿لَّا تُدۡرِكُهُ ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَهُوَ يُدۡرِكُ ٱلۡأَبۡصَٰرَۖ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ ١٠٣﴾ [ الانعام : ١٠٣ ]

“দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ব করেন এবং তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০৩]

আর আল্লাহ তা‘আলা উর্ধ্বাকাশে তাঁর ‘আরশের উপর রয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هُوَ ٱلۡأَوَّلُ وَٱلۡأٓخِرُ وَٱلظَّٰهِرُ وَٱلۡبَاطِنُۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٌ ٣ هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يَعۡلَمُ مَا يَلِجُ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا يَخۡرُجُ مِنۡهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ وَمَا يَعۡرُجُ فِيهَاۖ وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٤﴾ [ الحديد : ٣، ٤ ]

“তিনিই প্রথম ও শেষ, প্রকাশ্য (উপরে) ও গোপন (নিকটে); আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৩-৪]

এখানে তিনি সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি স্বয়ং উপরে উঠেছেন, তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। আরও জানিয়েছেন যে, তিনি তার বান্দাদের সাথেই রয়েছেন। সুতরাং তিনি তাঁর জ্ঞানে, শ্রবণে ও চোখের সামনে থাকার মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের সাথে রয়েছেন। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ ﴾ [ الحديد : ٤ ]

“আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৪] আর তিনি তাঁর বন্ধুদের সাথেও থাকেন- এগুলোর মাধ্যমে এবং তাদের সাহায্য-সহযোগিতা ও হিফাযতের দ্বারাও। যেমন, আল্লাহ মূসা ও হারূনকে বলেছিলেন,

﴿لَا تَخَافَآۖ إِنَّنِي مَعَكُمَآ أَسۡمَعُ وَأَرَىٰ ٤٦ ﴾ [ طه : ٤٦ ]

“আপনারা ভয় করবেন না, আমি তো আপনাদের সঙ্গে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬]

আর আল্লাহর রয়েছে ব্যাপক সর্বব্যাপী পূর্ণাঙ্গ ইচ্ছা। সুতরাং তিনি যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। তিনি যেভাবে তা তাঁর নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন আমরাও তা তাঁর জন্য সাব্যস্ত করব। এর চেয়ে এগিয়ে কোনো কিছুর আলাপ-আলোচনায় প্রবৃত্ত হব না, যেমনটি কোনো কোনো আকলানী তথা বুদ্ধিজীবি বলে পরিচিত লোকেরা করে থাকে। তারা অসম্ভব কর্মকাণ্ডের আলাপচারিতা এবং পরস্পর বিরোধী মতামত একত্র করা ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قَالَ كَذَٰلِكَ ٱللَّهُ يَفۡعَلُ مَا يَشَآءُ ٤٠ ﴾ [ ال عمران : ٤٠ ]

“তিনি বললেন, এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৪০]

মহান সত্ত্বা আরও বলেন,

﴿وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَفۡعَلُ مَا يُرِيدُ ٢٥٣ ﴾ [ البقرة : ٢٥٣ ]

“কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছে তা করেন।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩]

মহান সত্ত্বা আরও বলেন,

﴿ذُو ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡمَجِيدُ ١٥ فَعَّالٞ لِّمَا يُرِيدُ ١٦ ﴾ [ البروج : ١٥، ١٦ ]

“আরশের অধিকারী ও সম্মানিত। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই করেন।” [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১৫-১৬]

আর আমরা আল্লাহর জন্য এমন সবকিছুই সাব্যস্ত করব, যা অহী দ্বারা আগত ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, আর যা সাব্যস্ত হয় নি সে ব্যাপারে চুপ থাকব। আর বিবেক-বুদ্ধি যে সকল দোষ-ত্রুটি সাব্যস্ত করতে অস্বীকৃতি জানায় আমরা সেগুলোকে অস্বীকার করব, যদিও সেগুলোর অস্বীকৃতি অহীর ভাষ্যে উল্লেখিত হয় নি। যেমন, চিন্তা-পেরেশানি, কান্না-কাটি, ক্ষুধা ইত্যাদি।