hadith book logo

সঠিক ইসলামী মতবাদ [আর-রিসালাতুশ শামিয়্যাহ]

লেখকঃ আব্দুল আযীয ইবন মারযূক আত-ত্বারীফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

অষ্টম অধ্যায়: কুরআন সুন্নাহর ভাষ্য ও বিবেকের সম্মিলনে আমরা শরী‘আতের বাস্তবতা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারি

কুরআন সুন্নাহর ভাষ্য ও বিবেকের সম্মিলনে আমরা শরী‘আতের বাস্তবতা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারি। যার বিবেক নেই সে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য দ্বারা উপকৃত হতে পারে না, আর যার কাছে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য নেই সেও বিবেক দ্বারা উপকৃত হতে পারে না। এ দু’টির কোনো একটি কমতি থাকলে হক চেনাতেও কমতি হয়ে থাকে। আর প্রকাশ্যভাবে এ দু’টি যদি পরস্পর বিরোধী হয়, তখন সেখানে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকে বিবেকের ওপর স্থান দিতে হবে। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য হচ্ছে পূর্ণস্রষ্টার জ্ঞান, আর বিবেক হচ্ছে, অপূর্ণাঙ্গ সৃষ্টির জ্ঞান।

আর বিবেক হচ্ছে চোখের ন্যায়, পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য হচ্ছে আলোর ন্যায়। ঘোর অন্ধকারে দ্রষ্টা তার চোখ দ্বারা উপকৃত হতে পারে না। অনুরূপভাবে অহী ব্যতীত বিবেকবান ব্যক্তি তার বিবেক দ্বারা উপকৃত হতে পারে না। যতটুকু আলো থাকবে চোখ ততটুকু পথ দেখতে পাবে, যতটুকু অহী থাকবে বিবেক ততটুকু সঠিক পথের দিশা পাবে। আর বিবেক ও অহীর পূর্ণতা দ্বারাই হিদায়াত ও দিব্যদৃষ্টি পূর্ণতা লাভ করে, যেমনিভাবে দ্বিপ্রহরের আলোতে দেখা পূর্ণতা পায়।

﴿أَوَ مَن كَانَ مَيۡتٗا فَأَحۡيَيۡنَٰهُ وَجَعَلۡنَا لَهُۥ نُورٗا يَمۡشِي بِهِۦ فِي ٱلنَّاسِ كَمَن مَّثَلُهُۥ فِي ٱلظُّلُمَٰتِ﴾ [ الانعام : ١٢٢ ]

“যে ব্যক্তি মৃত ছিল, যাকে আমরা পরে জীবিত করেছি এবং যাকে মানুষের মধ্যে চলার জন্য আলোক দিয়েছি, সে ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে অন্ধকারে রয়েছে।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২২]

বিবেকবান তার বিবেক দ্বারা দুনিয়াতে উপকৃত হয়, যেমনিভাবে স্বভাব-জ্ঞানের মাধ্যমে যাবতীয় উড়ন্ত ও চলন্ত প্রাণীকুল উপকৃত হয়ে থাকে। সেগুলো সুর্নির্দিষ্ট সময়ে বিচরণ করে, আবার অবতরণও করে, পরস্পরকে চিনতে পারে, নিজেদের ভূমির দিশা পায়, আপন নীড় রচনা করে, তাদের শত্রুদের চিনতে পারে।

কিন্তু মানুষ তার বিবেকের দ্বারা তার রবের কাছে যাওয়ার পথের দিশা পায় না বিস্তারিতভাবে, যতক্ষণ না এর সাথে রবের নাবীর কাছে নাযিলকৃত অহীর অনুসরণ করা না হয়। তাঁর কাছে সে এ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই পৌঁছুতে পারবে না। বরং সে তা ব্যতীত সে অন্ধকারেই থেকে যায়:

﴿ٱللَّهُ وَلِيُّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ يُخۡرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِۖ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ أَوۡلِيَآؤُهُمُ ٱلطَّٰغُوتُ يُخۡرِجُونَهُم مِّنَ ٱلنُّورِ إِلَى ٱلظُّلُمَٰتِۗ﴾ [ البقرة : ٢٥٧ ]

“আল্লাহ তাদের অভিভাবক, যারা ঈমান আনে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে যান। আর যারা কুফুরী করে, তাগূত তাদের অভিভাবক। এরা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৭]

এখানে আল্লাহ বলেন, “তিনি তাদেরকে বের করে আলোতে নিয়ে যান”। কারণ, তা ব্যতীত তারা অন্ধকারে প্রবেশকারী। আর যেমনিভাবে দীপ্তিময়তা একই, যদিও এর প্রকার ভিন্ন ভিন্ন হয়- আলো বা আগুন; তেমনিভাবে অহী একই, যদিও এর প্রকার ভিন্ন ভিন্ন হয়- কুরআন বা সুন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ ﴾ [ النساء : ٥٩ ]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯]

আর যে ব্যক্তি বলে যে, সে অহী ব্যতীত শুধু তার বিবেক দ্বারা আল্লাহর কাছে পৌঁছার দিশা পাবে, সে যেন বলল, সে আলো ব্যতীত শুধু চক্ষু দ্বারা পথের দিশা লাভ করবে। বস্তুতঃ তারা প্রত্যেকেই অকাট্য অত্যাবশ্যক বিষয়কে অস্বীকারকারী। প্রথমজন দীনদ্রোহী, আর দ্বিতীয় জন দুনিয়াদ্রোহী!

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অহীকে নূর বা আলো নামে অভিহিত করেছেন, যার দ্বারা প্রত্যেক সৃষ্টি হেদায়াত প্রাপ্ত হয়:

﴿فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُواْ ٱلنُّورَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ﴾ [ الاعراف : ١٥٧ ]

“কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭] এটাই তো নাবীদের পথ দেখায়, আর তাদের অনুসারীদের দিশা দেয়।

আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন, আর যেগুলো থেকে নিষেধ করেছেন, আমরা সেগুলো মেনে নিই, আর যা কিছুর সংবাদ দিয়েছেন, আমরা সেগুলো বিশ্বাস করি। যদি তার কারণ জানা যায় তো তাতে ঈমান আনব, আর যদি জানা নাও যায় তবুও আমরা ঈমান আনব ও কায়মনোবাক্যে মেনে নেব। কারণ, সব বিবেকগ্রাহ্য বস্তুই সকল বিবেকের ধরাছোঁয়ার মধ্যে থাকে না। আর তাহলে যা বিবেক আয়ত্ব করতে পারে না, আর তাতে সকল বিবেক একমত হতে বলা হয়, সেটা কীভাবে হতে পারে?!

আর যে ব্যক্তি বলে, “আল্লাহর হুকুম বা বিধানের শুধু ততটুকুতেই ঈমান আনব যতটুকু বিবেকগ্রাহ্য, আর যা বিবেকগ্রাহ্য নয় অথবা আয়ত্ব করতে পারে না, তাতে ঈমান আনব না”, বস্তুত সে এর মাধ্যমে বিবেককে অহীর ওপর স্থান দিয়েছে। কারণ, যা বিবেক আয়ত্ব করতে পারে না তার অর্থ এ নয় যে সেটার অস্তিত্ব নেই; বরং এটা বলা যাবে যে, বিবেক সেটাকে আয়ত্ব করতে পারে নি। কেননা বিবেকের বিশেষ সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেখানে গিয়ে সে শেষ হয়। যেমন চোখের রয়েছে সীমা, যেখানে গিয়ে তার দৃষ্টিশক্তি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; কিন্তু সৃষ্টি ও অস্তিত্বজগত সে সীমাবদ্ধতার কারণে নিঃশেষ হয়ে যায় না। দেখুন না, পিপড়ার রয়েছে আওয়াজ বা স্বর, কিন্তু সেটা শোনা যায় না; আর জগতে রয়েছে এমন মহাশূন্য, তারকা ও নক্ষত্ররাজি- যেগুলো দৃশ্যমান নয়।