hadith book logo

সঠিক ইসলামী মতবাদ [আর-রিসালাতুশ শামিয়্যাহ]

লেখকঃ আব্দুল আযীয ইবন মারযূক আত-ত্বারীফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

দশম অধ্যায়: আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টির আগেই সকল সৃষ্টির তাকদীর নির্ধারণ করেছেন

আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টির আগেই সকল সৃষ্টির তাকদীর নির্ধারণ করেছেন, প্রতিটি সৃষ্টিই তার অস্তিত্বের পূর্বেকার নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَخَلَقَ كُلَّ شَيۡءٖ فَقَدَّرَهُۥ تَقۡدِيرٗا ﴾ [ الفرقان : ٢ ]

“তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২]

তিনি আরও বলেন,

﴿إِنَّا كُلَّ شَيۡءٍ خَلَقۡنَٰهُ بِقَدَرٖ ٤٩ ﴾ [ القمر : ٤٩ ]

“নিশ্চয় আমরা প্রত্যেক কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [সূরা আল-কামার, আয়াত: ৪৯]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَكَانَ أَمۡرُ ٱللَّهِ قَدَرٗا مَّقۡدُورًا ﴾ [ الاحزاب : ٣٨ ]

“আর আল্লাহর ফয়সালা সুনির্ধারিত, অবশ্যম্ভাবী।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৮]

আল্লাহ তা‘আলা তাকদীর নির্ধারণ করেছেন, ভালো ও মন্দ সবই। সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»

“আর যেন তুমি ঈমান আন তাকদীরের ওপ- এর ভালো ও মন্দের ওপর।” [মুসলিম, হাদীস নং ৮, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত]

আর আল্লাহর জ্ঞান তাঁর তাকদীরকে আবশ্যক করে। কেননা যিনি তাকদীর জানেন তিনি ব্যতীত আর কেউ তাকদীর নির্ধারণ করতে পারেন না। তাকদীরের বিস্তারিত রূপ, সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অবস্থা, স্থান, উলট-পালট, শুরু কিংবা শেষ যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لِتَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ وَأَنَّ ٱللَّهَ قَدۡ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عِلۡمَۢا﴾ [ الطلاق : ١٢ ]

“যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” [সূরা আত-তালাক, আয়াত: ১২]

তিনি আরও বলেন,

﴿أَلَا يَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ ١٤ ﴾ [ الملك : ١٤ ]

“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৪]

আর যে তাঁর তাকদীর অস্বীকার করবে, সে তাঁর ইলম বা জ্ঞানকেই অস্বীকার করল। আর যে তাঁর ইলম বা জ্ঞানকে অস্বীকার করবে, সে তাঁর তাকদীরকে অস্বীকার করল।

আর সৃষ্টিকুলের তাকদীর আল্লাহর কাছে একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আল্লাহ বলেন,

﴿مَّا فَرَّطۡنَا فِي ٱلۡكِتَٰبِ مِن شَيۡءٖۚ ﴾ [ الانعام : ٣٨ ]

“এ কিতাবে আমরা কোনো কিছুই বাদ দেই নি।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৩৮]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَكُلَّ شَيۡءٍ أَحۡصَيۡنَٰهُ فِيٓ إِمَامٖ مُّبِينٖ ﴾ [ يس : ١٢ ]

“আর আমরা প্রত্যেক জিনিস স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২]

আর আল্লাহর সৃষ্টি দু’ ধরণের:

নিয়োজিত, যাদের কোনো ইচ্ছাশক্তি নেই। যেমন, গ্রহ-নক্ষত্র, জ্যোতিষ্ক।

যাদের রয়েছে ইচ্ছাশক্তি ও ইখতিয়ার বা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা। যেমন, মানব, জিন্ন ও ফিরিশতা। তিনি তাদেরকে ইখতিয়ার না দিয়ে পরিচালিত করেন নি যে, তাদেরকে গুনাহ করতে বাধ্য করবেন, এরপরও তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন। আবার তিনি তাদেরকে পরিচালনা না করে যা খুশি করার ইখতিয়ার দেন নি যে, তারা তাঁর কর্ম ও ইচ্ছার অংশীদার হয়ে যাবে। বরং তিনি তাদের জন্য ইচ্ছা সাব্যস্ত করেছেন, তবে সেটা তাঁর ইচ্ছার অধীন:

﴿إِنۡ هُوَ إِلَّا ذِكۡرٞ لِّلۡعَٰلَمِينَ ٢٧ لِمَن شَآءَ مِنكُمۡ أَن يَسۡتَقِيمَ ٢٨ وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٩﴾ [ التكوير : ٢٧، ٢٩ ]

“এ তো শুধু সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশ, তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায়, তার জন্য। আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছে করেন।” [সূরা আত-তাকওয়ীর, আয়াত: ২৭-২৯]

আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনিভাবে যা তারা করে তাও সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন,

﴿قَالَ أَتَعۡبُدُونَ مَا تَنۡحِتُونَ ٩٥ وَٱللَّهُ خَلَقَكُمۡ وَمَا تَعۡمَلُونَ ٩٦﴾ [ الصافات : ٩٥، ٩٦ ]

“তিনি বললেন, তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তোমরা কি তাদেরই ইবাদাত কর? অথচ আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরি কর তা-ও।”[সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ৯৫-৯৬]

আর আল্লাহ তা‘আলা কোনো কিছুর কারণ অস্তিত্বে এনেছেন এবং সেটাকে কারণ হিসেবে অনুমোদন করেছেন, যেমনিভাবে কারণের ফলাফলেরও অস্তিত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রশস্ত জ্ঞান ও মহাপ্রজ্ঞার চাহিদা এটিই যে, এ জগতকে একটি নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে পরিচালনা করেন তিনি।

আর আল্লাহর তাকদীরের হাকীকত বা গূঢ় রহস্য ও হিকমত তথা অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য না বুঝার কারণে কোনো বিবেক যেন ঈমান আনতে দ্বিধা না করে। কারণ, কোনো কোনো হিকমত এমন রয়েছে যা বিবেক যথাযথভাবে আয়ত্ব করতে পারে না। কারণ, বিবেক হচ্ছে পাত্রের ন্যায়। আর কোনো কোনো হিকমত হচ্ছে সমূদ্রের পানির মত, সে পাত্র যা ধারণ করতে পারে না। যদি সেগুলোকে তার ওপর ঢালা হয়, তবে সেটাকে ডুবিয়ে ফেলবে এবং হয়রান করে ছাড়বে।

আবার কিছু কিছু হিকমত আছে যাতে দীর্ঘ চিন্তা শুধু বিস্ময়ই বাড়িয়ে দেয়। যেমন, চোখ যদি দ্বিপ্রহরের সূর্যের দিকে দীর্ঘসময় তাক করে রাখা হয়, তবে তা কষ্ট ও বিস্ময়ই বাড়িয়ে দেয়।